হামে আক্রান্ত যমজ সন্তান চিকিৎসায় নিঃস্ব পরিবার

আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:২১ এএম

হামে আক্রান্ত যমজ দুই শিশুকে নিয়ে দেড় মাস ধরে ছুটছেন এই হাসপাতাল থেকে ওই হাসপাতালে। চিকিৎসার খরচ চালাতে গিয়ে শেষ হয়েছে জমানো পুঁজি, বিক্রি করতে হয়েছে গহনা, স্বজনদের কাছ থেকে ধার করা হয়েছে ৩ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে খরচ প্রায় ৭ লাখ টাকা। এখন পকেটে আর কোনো টাকা না থাকায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের দুই ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন দুই সন্তানকে নিয়ে দিশেহারা এক দম্পতি।

চট্টগ্রাম নগরীর কাপ্তাই রাস্তার মাথা এলাকার বাসিন্দা গার্মেন্টসকর্মী মিজানুর রহমান ও ইয়াসমিন বেগম দম্পতির বিয়ে হয় ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে। চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি তাদের কোলে আসে যমজ দুই ছেলে, ইয়াসিন ও ইয়ামিন। সাত মাস মোটামুটি হাসিখুশি কাটার পর আগস্টের প্রথম সপ্তাহে দুই শিশুর শরীরে জ¦র আসে।

স্বজনরা জানান, ৭ আগস্ট চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেলে জ¦র কমার ওষুধ ও নেবুলাইজ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরদিন ইয়াসিনের শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেলে তাকে চমেক হাসপাতালের ৯ নম্বর শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। পরদিন ভাই ইয়ামিনেরও শ্বাসকষ্ট শুরু হলে তাকে ওষুধ দিয়ে বাসায় পাঠানো হয়। হাসপাতালে ইয়াসিনের চিকিৎসা চলাকালে একটি ইনজেকশন দেওয়ার পর তার শরীর কালো হয়ে যায়।

অবস্থার অবনতি হলে স্বজনরা তাকে দ্রুত বেসরকারি শিশু হাসপাতালে নেন। কিন্তু সেখানে আইসিইউ ফাঁকা ছিল না; তখন প্রতি মিনিটে দেওয়া হচ্ছিল ৫ লিটার করে অক্সিজেন। বিভিন্ন হাসপাতালে যোগাযোগ করে পরদিন ১১ আগস্ট ভোর ৬টায় পেডিকেয়ার হাসপাতালের আইসিইউতে একটি শয্যার ব্যবস্থা হয়।

সেখানে ১৮ আগস্ট পর্যন্ত চিকিৎসা দেওয়ার পর সুস্থ হলে তাকে বাসায় নেওয়া হয়।

বাড়ি ফেরার তিন দিন পর আবার শুরু হয় বিপত্তি। ১০৪ ডিগ্রি জ¦রের সঙ্গে ইয়াসিনের মুখে ঘা ও চোখে সংক্রমণ দেখা দেয়। চিকিৎসক প্রাথমিক পরীক্ষা করে জানান, সে হামে আক্রান্ত। শ্বাসকষ্ট বাড়লে তাকে আবার পেডিকেয়ার হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। পরে পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয়। সেখানে ১১ দিন আইসিইউতে থাকার পর ছাড়া পাওয়ার আগেই বাসায় থাকা অপর ভাই ইয়ামিনও হামে আক্রান্ত হয়।

সম্প্রতি চমেক হাসপাতালের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, ২৭ নম্বর শয্যায় আরেক শিশুর সঙ্গে চিকিৎসা নিচ্ছে ইয়াসিন। স্বজনরা তাকে দেখভাল করছেন। নিচতলার হাম ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, ইয়ামিনকে কোলে নিয়ে বসে আছেন মা ইয়াসমিন বেগম। তার শয্যাতেও আরেকটি শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে।

ইয়াসমিন বেগম বলেন, ‘দেড় মাস ধরে আমি হাসপাতালেই আছি। মাঝখানে মাত্র এক রাত বাসায় ছিলাম। চলতি মাসের ৭ তারিখে ইয়ামিনের চোখে র‌্যাশ ও মুখে ঘা দেখা দিলে তাকে সাউদার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করাই। পরীক্ষার পর তারও হাম ধরা পড়ে। রাতে শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়, রক্তচাপ বেড়ে যায়, আর অক্সিজেনের স্যাচুরেশন নেমে যায়। রাত ১টার দিকে অ্যাম্বুলেন্সে তাকে চমেক হাসপাতালে আনা হয়। এর কিছুক্ষণ পর বাসায় থাকা ইয়াসিনেরও শ্বাসকষ্ট শুরু হলে তাকেও আনা হয়। পরে দুজনকে ৯ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করানো হয়। ইয়ামিনকে প্রথমে ৯ নম্বর ওয়ার্ডের হাম কর্নারে রাখা হলেও পরে নিচতলার হাম ওয়ার্ডে পাঠানো হয়।’

চট্টগ্রাম অঞ্চলের ১৯৬ জন হাম আক্রান্ত শিশুর ওপর সম্প্রতি করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, সংক্রমিত শিশুদের মধ্যে ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ শিশুই কোনো না কোনো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র বা হাসপাতাল থেকে আক্রান্ত হয়েছে। ইয়াসিন ও ইয়ামিন নামের এই যমজ দুই শিশুও একইভাবে হাসপাতাল থেকে হামে সংক্রমিত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইয়াসমিন বেগম বলেন, ‘দেড় মাসে আমাদের ৭ লাখ টাকার মতো শেষ। গায়ের অলংকার যা ছিল বিক্রি করেছি, বোন ও বোনের জামাইয়ের কাছ থেকে ৩ লাখ টাকা ধার করেছি। নিজেদের জমা যা ছিল তাও শেষ। দুই শিশুর হামে আমরা এখন নিঃস্ব। আর কোনো টাকা না থাকায় চমেক হাসপাতালে পড়ে আছি।’

তিনি আরও বলেন, আমার স্বামী একটি পোশাক কারখানায় মাত্র সাড়ে ১২ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করেন। দুই সন্তানের জীবন বাঁচাতে দেড় মাস ধরে হাসপাতালে কাটানোয় অফিসেও যেতে পারছেন না তিনি।

উদ্বেগজনক হামের সংক্রমণ : চট্টগ্রামে এখনো আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে হামের প্রকোপ। চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলা ও মহানগর মিলিয়ে সন্দেহজনক হাম আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ১২২ জনে। এর মধ্যে এককভাবে নগরীর বিভিন্ন এলাকাতেই আক্রান্ত হয়েছে ৭ হাজার ৭৫২ জন এবং জেলার ১৫টি উপজেলায় মোট ৩৭০ জন আক্রান্ত হয়েছেন।

বর্তমানে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়েছেন ২৭৬ জন। পরীক্ষায় এখন পর্যন্ত ৭৪৩ জনের দেহে হামের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে। নিশ্চিত হামে ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন আরও ১৮ জন।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও হাম গবেষক ডা. কামরুন নাহার বলেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ। একজন আক্রান্ত রোগী থেকে প্রায় ১২ থেকে ১৫ জনের মধ্যে এটি ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই রোগীকে আইসোলেশনে রাখা অত্যন্ত জরুরি। আক্রান্তকে আলাদা না রাখলে দ্রুত সংক্রমণ ছড়ায়। সংক্রমণ রোধে স্বাস্থ্য বিধি অবশ্যই মেনে চলতে হবে।

তিনি বলেন, হাসপাতালগুলোতে শয্যাস্বল্পতার কারণে একই শয্যায় একাধিক শিশু থাকায় হামের সংক্রমণ হচ্ছে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা মিয়া বলেন, হাম শনাক্ত হওয়ার আগেই নানা উপসর্গ নিয়ে হামের রোগীরা সাধারণ ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ফলে তাদের সংস্পর্শে এসে সাধারণ রোগীরাও আক্রান্ত হচ্ছেন এবং সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার পর আবার নতুন করে হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন।

তিনি আরও বলেন, হামের রোগীদের জন্য আলাদা হাসপাতালের ব্যবস্থা করা সম্ভব হলে এ সংক্রমণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসবে এবং চিকিৎসা সেবা দেওয়াও বেশ সহজ হবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত