শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে গিয়ে মনে হলো, শরৎ আকাশের নীল রঙ থেকে কিছু রঙের ফোঁটা যেন সেখানে সবুজ ঘাসের ওপর ছিটকে পড়েছে। সেসব নীল রঙের কণা বাতাসের অক্সিজেনের সঙ্গে জারণের ফলে হয়ে গেছে বেগুনি-নীল বা গোলাপি-বেগুনি। বিস্তীর্ণ ঢালের মতো পাড় ধরে ফুটে আছে সাদা সাদা কাশফুল, আর সেসব গাছের গোড়ায় গালিচা বিছিয়ে দিয়েছে ঘাসফুলেরা। খুব কাছ থেকে লক্ষ না করলে ক্ষুদ ক্ষুদ্র সেসব সৌন্দর্যকে দেখা যায় না। জুতার তলায় চাপা পড়ে সেসব সুন্দরের সর্বনাশ ঘটে। এত ঘন সবুজ কাঁথার মতো প্রাকৃতিক ভূ-আচ্ছাদন আর তার মধ্যে ফুটে থাকা লাজনম্র মৃত্তিকামুখী ফুল কী নাম তার? খোঁজ করতেই তার নাম পেলাম লাজুক ঘাস ফুল, অন্য নাম পানিয়া ঘাস।
ঘাসের মধ্যে গাছগুলো জন্মে ও ফুল ফোটে বলেই কি এর নাম ঘাসফুল? কিন্তু এ উদ্ভিদটি মোটেই ঘাসের মতো না, ঘাস গোত্রেরও না। তবু বাংলায় বলা হয় লাজুক ঘাসফুল বা লাজবতী ঘাসফুল। ফুলের অবয়ব খানিকটা শঙ্খ-ঝিনুকের মতো, তাই কেউ কেউ একে ঝিনুক ফুল বলেছেন। তবে এ নামটি পরিহার করা ভালো। ঝিনুক ফুল নামে এ দেশে আর একটি বনফুল আছে। সাধারণভাবে স্থানীয়দের কাছে এটি পানিয়াঘাস বা পানিয়াগাছ নামে বেশি পরিচিত। এর ইংরাজি নাম Malaysian false pimpernel or brittle false pimpernel.
লিন্ডারনিয়েসি গোত্রের এ উদ্ভিদের পূর্ব প্রজাতিগত নাম ছিল লিন্ডারনিয়া ক্রাস্টাসিয়া (Lindernia crustacea), বর্তমানে তা বদলে রাখা হয়েছে টরেনিয়া ক্রাস্টাসিয়া (Torenia crustacea)। প্রজাতিগত নামের প্রথমাংশ ল্যাটিন শব্দ ‘টরেনিয়া’ রাখা হয়েছে অষ্টাদশ শতাব্দীর সুইডিশ ধর্মযাজক ও প্রকৃতিবিদ ওলফ টরেনের সম্মানে। শেষাংশ ‘ক্রাস্টাসিয়া’ অর্থ শক্ত খোলকধারী, যেমন কাঁকড়া, চিংড়ি। ধারণা করা যায়, এর কারণেই এর বাংলা নামকরণ করা হয়েছে ঝিনুক ফুল বা ঝিনাই ফুল। কিন্তু ঝিনুক শক্ত খোলকবিশিষ্ট হলেও সেগুলোকে বলা হয় মলাস্কা, ক্রাস্টাসিয়া না। কাজেই এ নামটি অসঙ্গতিপূর্ণ বলে মনে হয়।
এটি একটি ছোট আকারের নরম কান্ড-পাতাবিশিষ্ট বীরুৎ, প্রচুর শাখায়িত, ২০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। এর শাখা-প্রশাখা লতানো, মাটির ওপর গড়িয়ে চলে। কান্ড চতুষ্কোণাকার, খাঁজবিশিষ্ট, মসৃণ বা রোমহীন। সাধারণত সবুজ, তবে বেগুনি আভাযুক্ত কান্ডও দেখা যায়। শাখার গিঁট মাটি স্পর্শ করলে সেখান থেকে শিকড় গজায়। পাতা কান্ডে বিপরীতমুখীভাবে সজ্জিত থাকে, সরল, ডিম্বাকৃতি থেকে প্রশস্ত ত্রিকোণাকার, খুবই ছোট, মাত্র ১০ থেকে ২০ মিলিমিটার লম্বা ও ৫ থেকে ১১ মিলিমিটার চওড়া, কিনারা খাঁজকাটা। পাতা রোমহীন, তবে শিরার ওপরে স্বল্প কিছু সূক্ষ্ম রোম দেখা যায়।
ফুল খুব ছোট, আকার মাত্র ১ সেন্টিমিটার। পাতার কক্ষ বা কোল থেকে ছোট গুচ্ছে বা এককভাবে ফুল ফোটে। ফুল নলাকার, মুখের কাছে পাপড়ি পাঁচটি খন্ডে খন্ডিত, রঙ বেগুনি, গলার কাছে সাদা বা ফিকে হলদে। পাপড়িগুলোর মধ্যে নিচের ঠোঁটের মতো পাপড়িটি তিনটি খন্ডকবিশিষ্ট, ওপরের ঠোঁটটি ডিম্বাকার ও কখনো কখনো অগভীরভাবে দুটি খন্ডকে বিভক্ত থাকে। ফুলে পুরুষ কেশর থাকে চারটি। ফুল শেষে ফল হয়, ফল ক্ষুদ্র ও গ্লোবাকার ক্যাপসুল, মাত্র ৩-৫ মিলিমিটার লম্বা, ভেতরে অসংখ্য অতিক্ষুদ্র বীজ থাকে। বীজগুলো চোঙ্গাকৃতি।
সাধারণত স্যাঁতসেঁতে মাটিতে জন্মে। পতিত জমি, পাতাঝরা বন, তৃণভূমি, রেলপথের ধারে, ঝোপঝাড়পূর্ণ জঙ্গলে, নদীর চরে ও পাড়ে এদের বেশি দেখা যায়। এমনকি এরা ধানক্ষেতেও আগাছারূপে জন্মায়। জুলাই থেকে ফুল ফোটা শুরু হয় ও জানুয়ারিতে ফোটা শেষ হয়। এটি এশিয়ার নিজস্ব উদ্ভিদ। বাংলাদেশ, ভারত, চীন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশে এ উদ্ভিদ বেশ দেখা যায়। আফ্রিকা ও আমেরিকাতেও এখন এশিয়া থেকে এ উদ্ভিদ ছড়িয়ে পড়েছে। প্রায় ১০ হাজার ফুট উঁচু জায়গাতেও এরা জন্মাতে পারে। এদের বিরক্ত না করলে যেখানে জন্মে সেখানে মাটির ওপরে ঘন আস্তরণ তৈরি করে ঢেকে ফেলে, যা গালিচার মতো মনে হয়। বীজ ও অঙ্গজ উভয় উপায়েই এরা জন্মাতে পারে। এদের যে স্বভাব তাতে অনেক উদ্ভিদবিদ মনে করেন, অচিরেই হয়তো এরা এদেশে আগ্রাসী হয়ে উঠবে। তখন আর এটি গৌণ ক্ষতিকর আগাছা থাকবে না।
আগাছা হলেও এর কিছু ঔষধি গুণ আছে। জ¦র, আমাশয়, দাদ, চর্মরোগ, কানে ব্যাথা ইত্যাদি চিকিৎসায় এর লোকায়ত ব্যবহারের কথা জানা গেছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় অ্যাপস্টাইন-বার ভাইরাসের বিরুদ্ধে এর উল্লেখযোগ্য কার্যকারিতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তার মানে এর অ্যান্টিভাইরাল গুণ বা ক্ষমতা আছে। এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে গবেষণা করা গেলে এর এই গুণের কার্যকারিতা বুঝা যাবে।
লেখক : কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ