মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের জটিলতায় বাংলাদেশে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসাব্যবস্থা এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীরা বড় ধরনের সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন। হোমিওপ্যাথিক ওষুধের মূল উপাদান বা বাহক হিসেবে ব্যবহৃত অ্যালকোহল ও স্পিরিটকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে এ আইনি জটিলতা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে প্রচলিত চিকিৎসাব্যবস্থার পাশাপাশি হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাপদ্ধতিও জনপ্রিয়। স্বল্প ব্যয় ও সহজলভ্যতার কারণে এ চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর বিপুল জনগোষ্ঠীর আস্থা রয়েছে। চিকিৎসাসেবা প্রদান থেকে শুরু করে আনুষঙ্গিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে অনেক মানুষ সম্পৃক্ত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এ চিকিৎসাসেবার ব্যয় বৃদ্ধি ও নানা জটিলতা তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিগত সরকারের আমলে প্রণীত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন এ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। ওই আইনের আওতায় বাংলাদেশে হোমিওপ্যাথিক ওষুধ সংরক্ষণ, ব্যবহার ও বিপণনে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এতে একদিকে ওষুধ আমদানি, উৎপাদন ও বিপণনের সঙ্গে জড়িতদের নতুন বিড়ম্বনায় পড়তে হবে, অন্যদিকে চিকিৎসকদেরও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হোমিওপ্যাথিক ওষুধ আমদানির ক্ষেত্রে মূলত ড্রাগ রুলস, ১৯৪৬, ঔষধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ, ১৯৮২ এবং পরবর্তীতে ওই অধ্যাদেশ রহিত করে প্রণীত ঔষধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩-এর ধারাসমূহ অনুসরণ করা হয়। আইনের বিধিবিধানের আলোকে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকরা ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের লাইসেন্স গ্রহণ করে নিবন্ধনের মাধ্যমে হোমিওপ্যাথিক ওষুধ আমদানি করে থাকেন।
প্রতিবার ওষুধ আমদানির আগে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অনুমোদিত ব্লক লিস্টে উল্লেখিত ওষুধ ও পরিমাণ অনুযায়ী আমদানি নীতিমালা অনুসরণ করে নির্ধারিত এইচএস কোডের মাধ্যমে তা আমদানি করা হয়। একই আইনের আওতায় নিবন্ধনের মাধ্যমে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকরা চিকিৎসাসেবাও দিয়ে আসছেন।
তবে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিগত সরকারের আমলে একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অজুহাত হিসেবে হোমিওপ্যাথিক ওষুধ ও মাদার টিংচার প্রস্তুত এবং সংরক্ষণের প্রধান বাহক বা ভেহিকেল হিসেবে রেকটিফায়েড স্পিরিট বা ইথাইল অ্যালকোহলের অপব্যবহারের বিষয়টি সামনে আনা হয়।
তাদের ভাষ্য, মাদক আইনের ধারা অনুযায়ী কোনো তরল বা দ্রব্যে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশের বেশি অ্যালকোহল থাকলে তা মাদকদ্রব্যের আওতায় পড়ে। অথচ আমেরিকার বোরিক অ্যান্ড টাফেল (বিটি) এবং জার্মানির উইলসার সোয়েবসহ শীর্ষস্থানীয় হোমিওপ্যাথিক ওষুধ কোম্পানিগুলো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ফার্মাকোপিয়া অনুসারে উৎপাদিত ওষুধে ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত অ্যালকোহল ব্যবহার করে।
ফলে মাদক আইনের আওতায় পড়লে এসব ওষুধের উৎপাদন, বিপণন বা ব্যবহারের সুযোগ থাকবে না বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা। অন্যদিকে ওষুধের আড়ালে উচ্চমাত্রার অ্যালকোহলযুক্ত স্পিরিট বেআইনিভাবে বিক্রি ও সেবনের অভিযোগকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সবকিছু মিলিয়ে সমস্যার সমাধান হিসেবে একতরফাভাবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০২২ করা হয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। এরপর থেকে তল্লাশি ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকরা। একই সঙ্গে কড়াকড়ি ও জটিল লাইসেন্স প্রক্রিয়ার কারণে মাদার টিংচার ও প্রয়োজনীয় তরল ওষুধ আমদানিতে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। এতে বাজারে প্রয়োজনীয় হোমিওপ্যাথিক ওষুধের সংকট দেখা দিচ্ছে। পাশাপাশি ওষুধের দাম বেড়ে যাওয়ায় এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ ও দরিদ্র রোগীদের ওপর।
তবে শুরু থেকেই হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার সঙ্গে সম্পৃক্তরা এ আইনের বিরোধিতা করে আসছেন। তাদের ভাষ্য, হোমিওপ্যাথিক ওষুধ অতি সূক্ষ্ম মাত্রায় ব্যবহার করা হয়।
এদিকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের শেষার্ধে আমদানি করা একটি ওষুধের চালানের বিষয়ে যশোর কাস্টমস কমিশনারের পাঠানো চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল কাজী মো. রশীদ উন-নবী এবং হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শিক্ষা কাউন্সিলের রেজিস্ট্রার ডা. মো. জাহাঙ্গীর আলমের দেওয়া মতামতসংক্রান্ত দুটি চিঠির বিষয়ও সামনে এসেছে।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালকের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বিভিন্ন স্বীকৃত হোমিওপ্যাথিক ফার্মাকোপিয়া অনুসারে ওষুধভেদে সাধারণত ৩০ শতাংশ থেকে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত অ্যালকোহল বিদ্যমান থাকে। পাঠানো হোমিওপ্যাথিক মাদার টিংচার ও পটেন্সি মেডিসিনের (ডাইলুশন) নমুনায় অ্যালকোহলের পরিমাণ ৪৯ শতাংশ ও ৯০ শতাংশ পাওয়া গেছে, যা ফার্মাকোপিয়া অনুসারে সঙ্গতিপূর্ণ।
অপরদিকে, হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শিক্ষা কাউন্সিলের রেজিস্ট্রারও একই বিষয় আরও বিশদভাবে উল্লেখ করেছেন।
ভুক্তভোগীরা বিষয়টি সমাধানে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পর্যায়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন। সুরাহার আশায় বিগত সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আবেদন করেও সাড়া পাননি বলে তাদের দাবি।
উপায়ান্তর না পেয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নিবন্ধনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট (নং-৩১৫২/২০২৬) দায়ের করেছেন তারা। ‘হোমিওপ্যাথিক মেডিসিন অ্যান্ড মেডিসিনাল প্ল্যান্ট ইমপোর্টার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’-এর দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত রুল জারি করেছেন। বিষয়টি এখনো বিচারাধীন।
এরপরও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে লাইসেন্স গ্রহণের জন্য সারা দেশের হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকদের চাপ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে অনেকেই চিকিৎসাসেবা বন্ধ করে নিজ ঘরে অবস্থান করছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে নতুন করে আশার আলো দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। আইনটি রহিত বা পরিবর্তনে নতুন সরকারের হস্তক্ষেপ চেয়ে আবেদনও করা হয়েছে।
তাদের ভাষ্য, দেশে বর্তমানে ৬৫টি হোমিওপ্যাথিক ডিপ্লোমা এবং দুটি ডিগ্রি কলেজ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী শিক্ষা জীবন সম্পন্ন করে চিকিৎসাসেবায় যুক্ত হচ্ছেন। এ কারণে তাদের কিছু সরকারি নিয়ম-কানুন মেনে চলার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
হয়রানির মাত্রা কমাতে এবং জাতীয় স্বাস্থ্যসেবায় হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাব্যবস্থাকে অন্তর্ভুক্ত করার সুবিধার্থে প্রচলিত আইনে উল্লেখিত মাদকের সংজ্ঞায় ‘হোমিওপ্যাথিক ওষুধ ব্যতীত’ শব্দগুলো সংযোজনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।