প্রকৃতি তার রঙতুলির আঁচড়ে পরম মমতায় এঁকে দিয়েছে জলের বুকে অজস্র রক্ত কমল। সবুজ পাতা আর কচুরিপানার মধ্যে এ যেন অপূর্ব আলপনা। যতদূর চোখ যায় শুধু দেখা মেলে জলের ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা শান্ত লাল শাপলা। বলছি ‘শাপলার রাজ্য’ হিসেবে পরিচিত ত্রিশালের চেচুয়া বিলের কথা। ময়মনসিংহ শহর থেকে ২৪ কিলোমিটার আর ত্রিশাল উপজেলা থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে রামপুর ইউনিয়নে অবস্থিত চেচুয়া বিল। সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর মাসে চেচুয়া বিলে প্রচুর শাপলা ফোটে। লাল, গোলাপি, বেগুনি, সাদা রঙের শাপলা দেখতে ঢল নামের মানুষের। সবুজের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা শাপলার পাশে সাদা কচুরিপানা যেন এর সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে দেয় বহুগুণে। মনে পড়ে যায় কবি জীবনানন্দ দাশের লেখা চরণ ‘যেখানে শাপলা ফোটে দিঘির জলেতে, ধান কাটে চাষি বসে সবুজ খেতে, সেই আমার দেশ, সেই আমার রূপসী বাংলা’।
শাপলা সাধারণত স্থির পানিতে জন্মায়। কিছু সৌন্দর্য নীরব হয়, কিন্তু গভীরভাবে মানুষের মনে দাগ কাটে। লাল শাপলা সেই নীরব সৌন্দর্যেরই উদাহরণ। রক্ত কমল তার নীরবতা দিয়েই কাছে টেনে আনে প্রকৃতিপ্রেমীদের। শাপলার আসল সৌন্দর্য ও সতেজতা উপভোগ করার মোক্ষম সময় হলো ভোরবেলা। ভোরের হালকা কুয়াশা আর শিশির ভেজা সকালে যখন সূর্যের নরম রোদ এসে পড়ে শাপলার ওপর, তখন শাপলার পুরো পাপড়ি মেলে জলাশয়কে উৎসবের রঙে রাঙিয়ে তোলে। তাইতো এই নৈসর্গিক সৌন্দর্যের সাক্ষী হতে পর্যটকদের আনাগোনা শুরু হয় ভোর থেকে। প্রকৃতিতে অপার সৌন্দর্য দেখতে প্রতি বছর শাপলার মৌসুমে চেচুয়া বিলে ভিড় করেন শহরের বিভিন্ন প্রান্তের পর্যটক, প্রকৃতিপ্রেমী ও আলোকচিত্রী। শুধু প্রকৃতিপ্রেমীরাই নয়; বরং সাধারণ মানুষও ছুটে আসে দূরদূরান্ত থেকে। ঘুরতে আসেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি আনন্দমোহন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বর্ষায় পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিলের শান্ত জলরাশি লাল শাপলার রক্তিম আভায় ঢেকে যায়। এই সৌন্দর্য আরও গভীরভাবে উপভোগ করতে দর্শনার্থীরা ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকা ভাড়া করে বিলের ভেতর প্রবেশ করেন। মূলত গ্রামবাসী এরূপ নৌকা বানিয়ে থাকেন, যা তাদের আয়ের অন্যতম উৎস। সাধারণত নৌকার ভাড়া হয় ঘণ্টা হিসেবে। সচরাচর ঘণ্টা প্রতি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা নিয়ে থাকেন মাঝিরা। নৌকার বৈঠার ছল ছল শব্দ, শান্ত জলের মৃদু ঢেউ আর চারপাশে ছড়িয়ে থাকা শাপলার মেলা সব মিলে সৃষ্টি করে এক ঐশ্বরিক সৌন্দর্যের। নৌকায় বসে এই সৌন্দর্য উপভোগ করার মধ্যে দর্শনার্থীরা অজস্র ছবি তুলেন, ভিডিও ধারণ করেন, কেউবা গান গায় আবার কেউবা কবিতা আবৃত্তি করেন। ইট-পাথরের শহরের কোলাহল ও ধুলাবালি থেকে বহু দূরে প্রকৃতির এমন স্নিগ্ধ ও সতেজ রূপ মনকে এক অচেনা প্রশান্তিতে ভরিয়ে দেয়। পাখির কলকলানি আর হাতে ফুল নিয়ে নৌকা ভ্রমণ চেচুয়া বিলকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। অযত্নে বেড়ে ওঠা শাপলাগুলোর সৌন্দর্যের নেই কোনো কমতি। ভালোবাসার উপহার এই শাপলা ফুলের সরলতায় মিশে থাকে এক টুকরো মায়া। একটি শাপলা ফুল ক্লান্ত মনে ফিরিয়ে দিতে পারে স্বস্তি ও প্রশান্তি। জলের বুকে ফুটে থাকা শাপলাগুলো শুধু ফুল নয়, তারা যেন প্রকৃতির লেখা নীরব কবিতা।