আন্তর্জাতিক পর্যটনের এক অপার সম্ভাবনাময় কেন্দ্র কুয়াকাটা। দেশি পর্যটকদের পাশাপাশি দিন দিন বাড়ছে বিদেশি পর্যটকদের আনাগোনা। সাগর, সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত, গঙ্গামতি, মিনি সুইজারল্যান্ড (কাউয়ারচর), লেম্বুর বন, ফাতরার বন, জেলেপল্লী, বৌদ্ধমন্দিরসহ বৈচিত্র্যময় আকর্ষণ বিদেশি পর্যটকদের টানছে কুয়াকাটায়।
স্থানীয় পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাশিয়া, সুইজারল্যান্ড, নাইজেরিয়া, ভারত, নেপাল, আর্জেন্টিনাসহ বিভিন্ন দেশের পর্যটক কুয়াকাটায় ঘুরতে আসছেন। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তারা শুধু সমুদ্রসৈকতেই সীমাবদ্ধ থাকছেন না; ছুটে যাচ্ছেন উপকূলের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে।
কেউ উপভোগ করছেন সাগরের নীল জলরাশি, কেউ ঘুরছেন নদীপথে; আবার কেউ মুগ্ধ হচ্ছেন ম্যানগ্রোভ বন, চরাঞ্চল ও স্থানীয় জনপদের জীবনযাত্রা দেখে। গত শনিবার সরেজমিন গিয়ে কুয়াকাটা সৈকত ও আশপাশের পর্যটন স্পটগুলোতে বিদেশি পর্যটকদের স্বাচ্ছন্দ্যে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। স্থানীয় মানুষের আতিথেয়তা ও বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণও তাদের ভ্রমণ অভিজ্ঞতাকে আরও আনন্দময় করে তুলছে।
কুয়াকাটা ট্যুর গাইড ও বাইক রাইডার আবু সালেহ বলেন, ‘আমি প্রায় পাঁচ বছর ধরে কুয়াকাটায় আসা বিদেশি পর্যটকদের বিভিন্ন পর্যটন স্পটে নিয়ে যাচ্ছি। তারা মিনি সুইজারল্যান্ড, লেম্বুর বনসহ বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে খুব আগ্রহী। কুয়াকাটার প্রাকৃতিক পরিবেশ তাদের এতটাই মুগ্ধ করে যে, অনেকেই কয়েক মাস পরপর আবারও এখানে আসেন।’
কুয়াকাটার মিনি সুইজারল্যান্ড এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘কুয়াকাটায় আসা বিদেশি পর্যটকরা মিনি সুইজারল্যান্ডের প্রাকৃতিক পরিবেশে বেশ মুগ্ধ হন। অনেকে এখানে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন এবং খাল ও আশপাশের সৌন্দর্য ঘুরে দেখেন। আমাদের কাছ থেকে ডাব, কলাসহ বিভিন্ন খাবার কিনে খান। তারা খুবই ভালো ব্যবহার করেন। আমরাও তাদের সুন্দরভাবে সেবা দেওয়ার চেষ্টা করি।’
হোটেল খান প্যালেসের অপারেশন ম্যানেজার মো. মনিরুজ্জামান সাকুর জানান, প্রায় নিয়মিতই দেশি অতিথিদের পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকরাও আসেন। বিশেষ করে পূজা, ঈদুল আজহা, ঈদুল ফিতর ও ইংরেজি নববর্ষের সময় বিদেশি অতিথিদের উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি থাকে। বিদেশিদের মধ্যে প্রায়ই রাশিয়ান অতিথিরা অবস্থান করেন। সর্বশেষ গত ১৮ ও ১৯ সেপ্টেম্বর বিপুলসংখ্যক রাশিয়ান অতিথি ছিলেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাশিয়া থেকে আসা এই পর্যটকরা পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কর্মরত। তারা প্রায় চার বছর ধরে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। কাজের পাশাপাশি বিভিন্ন সময় ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে প্যাকেজ নিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখেন। এবার সেই ধারাবাহিকতায় তারা কুয়াকাটায় এসেছেন।
ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব কুয়াকাটার (টোয়াক) সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান মিরাজ বলেন, ‘কুয়াকাটায় বিদেশি পর্যটকদের আগমন আমাদের পর্যটনশিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুয়াকাটার সমুদ্রসৈকতের পাশাপাশি বন, চর, নদী ও স্থানীয় জীবনযাত্রা বিদেশিদের আকৃষ্ট করছে। বিদেশি পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা আরও বাড়ানো গেলে এখানে আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা আরও বাড়বে।’
ট্যুরিস্ট পুলিশ কুয়াকাটা জোনের ইনচার্জ মো. নাজমুল হাসান বলেন, বিদেশি পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। তারা যে হোটেলে অবস্থান করেন, সেখান থেকে ই-মেইলের মাধ্যমে আমাদের জানানো হয়। এরপর আমাদের পুলিশ সদস্যরা তাদের নিরাপত্তার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও সেবা দিয়ে থাকেন। বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার ক্ষেত্রে আমরা তাদের প্রশিক্ষিত ও শিক্ষিত গাইডের সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দিই।
পর্যটনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কুয়াকাটার বিশেষত্ব শুধু সমুদ্রসৈকতে সীমাবদ্ধ নয়। সাগর, নদী, বন, চর, জেলেপল্লী, স্থানীয় সংস্কৃতি ও গ্রামীণ জীবনযাত্রার বৈচিত্র্য কুয়াকাটাকে অন্য অনেক পর্যটনকেন্দ্র থেকে আলাদা করেছে। পরিকল্পিতভাবে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন অবকাঠামো ও সংশ্লিষ্ট সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে পটুয়াখালীর উপকূল হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্য।