মিনি কোল্ড স্টোরেজ অকার্যকর

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:১৮ এএম

কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের দক্ষিণ বাগমারা গ্রামের উদ্যোক্তা কৃষক মো. আবুল কালাম আজাদ নিজের বাড়িতে একটি মিনি কোল্ড স্টোরেজ বা হিমাগার স্থাপন করেছেন। স্থানীয় বাজার থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে তিনিসহ ১০ জন কৃষকের একটি দল এতে সবজি রাখেন। আগে থেকে কোল্ড স্টোরেজটি পর্যাপ্ত শীতল করে সবজি রাখা হলেও দ্রুতই সেগুলোর রঙ পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে, কুঁচকে যাচ্ছে, আলু রাখলে দ্রুত তাতে অঙ্কুর গজাচ্ছে এবং মান হারাচ্ছে। সোলার প্যানেল না থাকায় কৃষকরা উচ্চ বিদ্যুৎ বিল দিয়ে এই সবজি সংরক্ষণ করলেও গুণমান ঠিক না থাকায় বাজারে ক্রেতা এসব পণ্য কিনতে চাচ্ছেন না। অর্থাৎ কোল্ড স্টোরেজটি কার্যকরী হয়ে উঠতে পারেনি।

মিনি কোল্ড স্টোরেজ নিয়ে  কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) পরিচালিত এক তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বিবরণ। প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, উদ্যোক্তারা অতিরিক্ত ফসল সংরক্ষণ করে পরে বাজারে ভালো দামে বিক্রি করবেন এই ধারনার ওপর তৈরি করা হয় এই কোল্ড স্টোরেজ। অথচ স্টোরেজগুলোর কোনটা বন্ধ, কোনটা ব্যবহার হলেও তা থেকে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে কৃষক, এগুলো হয়ে পড়ছে অকার্যকর।

তদন্ত দল সুপারিশ করেছে, স্থাপিত ফার্মারস মিনি কোল্ড স্টোরেজগুলো বর্তমান প্রেক্ষাপটে আর সম্প্রসারণ না করার। পরে অধিকতর গবেষণা করে তার ফলাফলের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া সমীচীন হবে। কারণ সংরক্ষিত কৃষিপণ্যের পরিমাণ, বাজারজাতকরণ সুবিধা এবং পরিচালন ব্যয় পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বর্তমান ব্যবহারের মাত্রায় কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক নয়। এতে করে দুটি প্রকল্পের মাধ্যমে যে ২৬ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে তা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। 

যদিও কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশিদ গত ১৫ জুন রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, সরকার আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে দেশে ২ হাজার ছোট হিমাগার তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছে। এগুলো চালানোর জন্য ২০ জন কৃষকের সমন্বয়ে একটি করে কমিটি গঠন করা হবে। এই হিমাগারগুলো সম্পূর্ণ সৌরবিদ্যুতে চলবে। সরকার মনে করে ২ হাজার ক্ষুদ্র হিমাগার তৈরি হলে দেশের প্রায় ৪০ হাজার কৃষক সরাসরি উপকৃত হবেন।

মন্ত্রীর এই বক্তব্যের প্রভাবে ইতিমধ্যেই ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ের একটি নতুন প্রকল্প তৈরির তোড়জোড় শুরু হয়েছে। এমন সময়ে তদন্ত প্রতিবেদনে প্রশ্ন উঠল এর বাস্তবমুখী কার্যকারিতা নিয়ে। ডিএইর তদন্ত দল সারা দেশে স্থাপিত ২৬টি কোল্ড স্টোরেজ পরিদর্শন করেছেন। এর অনেকগুলোই অকার্যকর হয়ে পড়ে আছে। যেগুলো চলছে সেগুলোও খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। সোলার প্যানেলনির্ভর এই স্টোরেজ হওয়ার কথা থাকলেও বেশিরভাগই চলছে বিদ্যুৎ সংযোগের মাধ্যমে, যাতে বাড়তি বিল গুনতে হচ্ছে কৃষকদের।

মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার উদ্যোক্তা আতিকুর রহমান তার বাড়ির কাছেই একটি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন করেছেন। কনটেইনার দিয়ে তৈরি এই স্টোরেজটি তিনি করেছেন প্রকল্পের খরচে। পরিদর্শনে দেখা গেছে, আলু, পেয়ারা, ড্রগন ফলসহ মাত্র ৫০ কেজি পণ্য রাখা। তবে উদ্যোক্তা জানিয়েছেন, আলুতে ১৫ দিনের মধ্যেই অংকুর গজাচ্ছে। পেঁয়ারা সাত দিনের বেশি রাখা যায় না। মান কমে যাওয়া এসব সবজি বেশি দাম দিয়ে ক্রেতা কিনতে চান না।

জানা গেছে, মিনি কোল্ড স্টোরেজগুলো কৃষকবান্ধব ও সাশ্রয়ী না হলেও ইতিমধ্যে দুটি প্রকল্পের মাধ্যমে সরকারের ২৬ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের অর্থায়নে প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত হয়েছে ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সাশ্রয়ী কোল্ড স্টোরেজ প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষকের আয় বৃদ্ধি প্রকল্প’। ২০২৫ সালের এপ্রিলে শুরু হওয়া প্রকল্পটি শেষ হয়েছে চলতি বছরের জুনে। এই প্রকল্পের আওতায় ১০০টি ছোট স্টোরেজ করা হলেও বিদ্যুৎ-সংযোগ না থাকায় ৫০টি এখনো সচল হয়নি।

প্রথম প্রকল্পের পর ‘জলবায়ু সহনশীল কৃষির জন্য ফার্মার্স মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন প্রকল্প’ নামে আরেকটি প্রকল্প নেয় সরকার। ২০২৫ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া প্রকল্পটি চলতি বছরের অক্টোবরে শেষ হবে। ১৪ কোটি টাকার এই প্রকল্পের অধীনে ৮০টি মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপনের কথা রয়েছে। এ পর্যন্ত ৫০টির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হিমাগারের স্থান নির্ধারণ এবং এর কার্যকারিতা নিয়ে  মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের মধ্যেই অসন্তোষ রয়েছে।

অর্থাৎ দুই প্রকল্পের মাধ্যমে ১৮০টি হিমাগার স্থাপন করার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত করা হয়েছে ১৫০টি। যার বেশির ভাগই এখনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকাই রাখতে পারছে না। 

ফার্মার্স মিনি কোল্ড স্টোরেজ কার্যক্রম সরেজমিন অনুসন্ধান ও প্রভাব মূল্যায়ন কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন ডিএইর অতিরিক্ত পরিচালক মো. রওশন আলম। অন্য সদস্যদের মধ্যে ছিলেন ডিএইর পরিকল্পনা, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও আইসিটি উইংয়ের উপপরিচালক (প্রকল্প বাস্তবায়ন) ড. মো. শাখাওয়াত হোসেন শরীফ, গাজীপুরের জয়দেবপুর ফল বিভাগের উদ্যানতত্ত্ব গবেষণাকেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. মসিউর রহমান, পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও আইসিটি উইংয়ের মনিটরিং ও মূল্যায়ন কর্মকর্তা (প্রকল্প বাস্তবায়ন) মো. জাহাঙ্গীর হোসেন এবং পরিকল্পনা, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও আইসিটি বিভাগের পরিসংখ্যান কর্মকর্তা মো. আবু সাইয়েম।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তদন্ত দলের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, ‘কৃষি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশেই প্রকল্পের বিষয়ে তদন্ত করে তার মূল্যায়ন প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। এটা সরকারকে পরবর্তী নীতি গ্রহণে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।’ 

জানা গেছে, সরকার ইতিমাধ্যেই ‘সৌরশক্তিনির্ভর মিনি হিমাগার ও ফসল সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা প্রকল্প’ নামে প্রস্তাবিত নতুন বড় প্রকল্পটির ডিপিপিতে (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। তবে ছোট দুটি হিমাগার প্রকল্পের নেতিবাচক খবরের প্রভাবে বড় প্রকল্প আদৌ নেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে কৃষি মন্ত্রণালয়।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত