দেশের পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোতে আমানত কমেছে। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন—দ্বিতীয় প্রান্তিকে এসব ব্যাংকের আমানত কমেছে ১৯ হাজার ৫৪৩ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন শেষে দেশের ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৭২৫ কোটি টাকা। মার্চ শেষে এ পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৯ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় প্রান্তিকে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর আমানত কমার পেছনে সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে। এ সময়ে ব্যাংকটিতে নতুন পর্ষদ গঠনকে কেন্দ্র করে অস্থিরতা তৈরি হলে গ্রাহকদের একটি অংশ আমানত তুলে নেয়। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, ওই সময়ে ব্যাংকটি থেকে প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকা আমানত উত্তোলন করা হয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে পুরো ইসলামী ব্যাংকিং খাতের আমানতে।
দেশে বর্তমানে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ধারার ব্যাংক রয়েছে ১০টি। এগুলো হলো ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ইসলামী ব্যাংক ও আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক।
এর মধ্যে সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী, ইউনিয়ন ও এক্সিম ব্যাংক একীভূত হয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
ব্যাংকারদের মতে, গত বছরের ৫ আগস্টের পর ইসলামী ধারার কয়েকটি ব্যাংকের অনিয়ম ও আর্থিক দুর্বলতা প্রকাশ্যে আসার পর এসব ব্যাংক থেকে আমানত উত্তোলনের প্রবণতা বেড়ে যায়। কয়েকটি ব্যাংক গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী অর্থ ফেরত দিতেও সমস্যায় পড়ে। পরে পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত আমানত উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া হলে এসব ব্যাংক থেকে অর্থ বেরিয়ে যেতে থাকে। তবে সেই তুলনায় নতুন আমানত বাড়েনি।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি আমানত
জুন শেষে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আমানত রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে। ব্যাংকটির আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬২ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা, যা পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর মোট আমানতের ৩৪ দশমিক ৭৯ শতাংশ।
এর পরের অবস্থানে রয়েছে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক। পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর মোট আমানতের ১০ দশমিক ৬৭ শতাংশ রয়েছে ব্যাংকটিতে। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের হিস্যা ৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ, এক্সিম ব্যাংকের ৬ দশমিক ৮৬ শতাংশ এবং শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ৬ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
সামগ্রিক ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থাতেও আমানত কমেছে
শুধু পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংক নয়, প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোর ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রমেও আমানত কমেছে। বর্তমানে প্রচলিত ব্যাংকগুলো পৃথক ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডো ও শাখার মাধ্যমে এসব সেবা দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রচলিত ব্যাংকের ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডোর বাজার হিস্যা ৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ এবং ইসলামী শাখাগুলোর হিস্যা ৬ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংক, প্রচলিত ব্যাংকের ইসলামী উইন্ডো ও ইসলামী শাখা—সব মিলিয়ে জুন শেষে দেশের ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৬৮ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা। মার্চ শেষে এ পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৭৯ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে সামগ্রিক ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আমানত কমেছে ১১ হাজার ৫৩৯ কোটি টাকা।
ব্যাংকাররা বলছেন, ইসলামী ব্যাংকগুলোর আমানত পরিস্থিতির উন্নতির জন্য গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি। বিশেষ করে দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন, গ্রাহকদের আমানত ফেরত দেওয়া এবং ব্যাংক পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে সহায়ক হতে পারে।