রক্ষকই যেখানে ভক্ষক

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:১৮ এএম

মা থাকেন ঢাকায়। সংসারের অভাব মেটাতে গৃহকর্মীর কাজ করেন। লালমনিরহাট সদর উপজেলার ছোট মেয়েটি থাকত সৎবাবার সঙ্গে। বয়স মাত্র ১২। যে বয়সে মায়ের হাত ধরে স্কুলে যাওয়ার কথা, বিকেলে সহপাঠীদের সঙ্গে খেলায় মেতে ওঠার কথা, সেই বয়সেই সৎবাবার যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে তাকে।

সম্প্রতি মাকে টেলিফোনে নিজের ওপর ঘটে যাওয়া নির্যাতনের কথা জানায় মেয়েটি। মেয়েটির কথায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েন মা। দূর শহরে থেকে সন্তানের নিরাপত্তার কথা ভেবে যিনি প্রতিদিন দুশ্চিন্তা করেন, সেই মায়ের কাছেই এবার মেয়েটিকে বলতে হলো যে ঘরটিকে সে নিরাপদ ভেবেছিল, সেখানেই সে নিরাপদ ছিল না।

লালমনিরহাট সদর উপজেলার কালমাটি গ্রামের এই শিশুর ঘটনা একটি পরিবারের ভেতরের ভয়াবহতার চিত্র সামনে আনলেও বাস্তবতা আরও বিস্তৃত। শিশু যৌন নির্যাতনের অনেক ঘটনা ঘরের ভেতরেই থেকে যায়। অপরাধী অনেক সময় অপরিচিত কেউ নয় পরিবারের সদস্য, আত্মীয়, প্রতিবেশী, শিক্ষক কিংবা শিশুর বিশ্বাসের মানুষ। শুধু তা-ই নয়, একজন শিশুকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ার দায়িত্ব যে শিক্ষকদের হাতে তাদের কাছেও নিরাপদ নয় শিশুরা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো পবিত্র প্রাঙ্গণে শিক্ষকদের হাতে বাজে স্পর্শ, ধর্ষণ ও বলাৎকারের শিকার হচ্ছে শিশুরা।

রাজধানীর নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলিক্রস কলেজের শিক্ষক অনিমেষ সাহা। সম্প্রতি একাদশ শ্রেণির এক ছাত্রীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং পরে জোরপূর্বক গর্ভপাত করানোর গুরুতর অভিযোগ ওঠে এই শিক্ষকের বিরুদ্ধে। এরপর সামাজিক মাধ্যমে একাধিক শিক্ষার্থী জানান, বিভিন্ন প্রলোভনে এই শিক্ষক কমপক্ষে ২০ জন শিক্ষার্থীকে তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য করেছেন।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মোবাইলে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও অনিমেষ সাহাকে পাওয়া যায়নি। তবে হলিক্রস কলেজের অধ্যক্ষ সিস্টার শিখা লায়েতিসিয়া গোমেজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে, প্রতিবেদন পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার নতুনবাজার বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক কামাল উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে ছাত্রীদের শারীরিকভাবে হেনস্তা ও অশোভন আচরণের অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি দেশ রূপান্তরের এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেছেন বিদ্যালয়টির অন্তত ২০ জন সাবেক নারী শিক্ষার্থী। তাদের অনেকের অভিযোগ, ক্লাসে পড়া ধরার অজুহাতে শরীরে হাত দিতেন ওই শিক্ষক।

সাবেক শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, গণিত, ইংরেজি ও বিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয়ে পড়ানোর পাশাপাশি তিনি শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়তে চাপ দিতেন। তার কাছে প্রাইভেট না পড়লে ফেল করিয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো, অভিভাবকদের ডেকে অভিযোগ করা এবং বিনা পারিশ্রমিকে প্রাইভেট পড়ানোর প্রস্তাব দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ তাদের। এক শিক্ষার্থী অভিযোগ করে জানান, একদিন স্কুল ছুটির পর দুই বান্ধবীকে নিয়ে প্রাইভেট পড়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন তিনি। কামাল উদ্দিন মেয়েদের বেঞ্চে এসে বসেন। একপর্যায়ে তার শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে হাত দেন। ঘটনার পর টানা এক সপ্তাহ স্কুলে যাননি তিনি।

কামাল উদ্দিনের বাড়ি ময়মনসিংহের কেন্দুয়ায়। স্ত্রী-সন্তানও সেখানে থাকতেন। দীর্ঘদিন কর্মস্থলে একা থাকলেও তার ব্যক্তিগত জীবনকে শিক্ষার্থীদের প্রতি এমন আচরণের কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ২০২৪ সালে তিনি অবসরে যান। তবে সাবেক শিক্ষার্থীদের অভিযোগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাদের নিরাপত্তা ও শিক্ষকের ক্ষমতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।

শিক্ষক কামাল উদ্দিন সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমি সততার সঙ্গে শিক্ষকতা করেছি। এসব বিষয় নিয়ে আমার চাকরিকালে কোনো অভিযোগ ওঠেনি। এই বলে তিনি ফোন রেখে দেন।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের এক গবেষণায় দেখা যায়, ২০২০-২৫ সালে শিক্ষকদের হাতে শিক্ষার্থী নির্যাতনের ৯৪৮টি ঘটনা পাওয়া যায়। এর মধ্যে ২১১টিই ছিল যৌন হয়রানির ঘটনা। চাইল্ড রাইটস অ্যাডভোকেসির অন্য এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৮ বছরের কম বয়সী শিক্ষার্থীদের ২০২০-২৩ সাল পর্যন্ত সময়ে শিক্ষকদের হাতে ৫৪২টি, এর মধ্যে কেবল নারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটেছে ৬৮টি।

ভয়, লজ্জা, সামাজিক অপমান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের প্রভাব, পরিবারের ভেতরের সম্পর্ক, অর্থনৈতিক নির্ভরতা কিংবা অপরাধীর প্রভাব সবকিছু মিলিয়ে অনেক শিশু ও শিক্ষার্থী মুখ খুলতে পারে না। কেউ কেউ জানেই না কোথায় গিয়ে সাহায্য চাইতে হবে। ফলে নির্যাতনের পরও তাদের একই পরিবেশে থাকতে হয়। অপরাধীও থেকে যায় তার আশপাশেই। আর পরিবার যখন ঘটনাটি জানার পরও ‘মান-সম্মানের’ কথা বলে চুপ করে যায়, তখন শিশুটির জন্য সেই নীরবতাই হয়ে ওঠে দ্বিতীয় নির্যাতন।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেও নিরাপদ নয় শিশুরা : শুধু ঘরের ভেতর নয়, শিশুর নিরাপদ থাকার কথা যেসব জায়গায়, সেখানেও উঠছে গুরুতর অভিযোগ। লালমনিরহাট সদর উপজেলার কালমাটি গ্রামের আরেক শিশু নিজের অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে জানান, মক্তবে পড়ার সময় তিনি একজন হুজুরের হাতে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। তার ভাষ্য, একদিন দুপুরে মসজিদে ওই হুজুরের জন্য খাবার নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। তখন মসজিদের ভেতরের একটি কক্ষে তাকে যৌন নির্যাতন করা হয়।

একটি শিশুর কাছে শিক্ষক শুধু শিক্ষক নন; তিনি জ্ঞান ও শাসনের পাশাপাশি বিশ্বাসেরও একজন মানুষ। সেই বিশ্বাসের জায়গাতেই যখন আঘাত আসে, তখন শিশুর কাছে শুধু একজন মানুষ নয়, পুরো নিরাপত্তাবোধ ভেঙে পড়ে।

মাদ্রাসা নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ : সাম্প্রতিক সময়ে মাদ্রাসায় শিশু যৌন নির্যাতনের একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে। ২০২৬ সালের মে মাসে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিশুদের প্রতি যৌন সহিংসতার ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে সব মাদ্রাসায় যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠনের দাবি জানায়।

চট্টগ্রামে আট বছর বয়সী মাদ্রাসাছাত্রকে একাধিকবার বলাৎকারের অভিযোগে গত ৩ আগস্ট বাঁশখালী উপজেলার দারুসসুন্নাহ খাইরিয়া মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক মুহাম্মদ রমিজ উদ্দীনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ভুক্তভোগী শিশুটি ওই মাদ্রাসার নাজেরা বিভাগের শিক্ষার্থী। মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়ার পর থেকে প্রধান শিক্ষক রমিজ উদ্দীন বিভিন্ন সময় তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে মাদ্রাসার ওয়াশরুমে নিয়ে বলাৎকার করতেন।

গত ২৩ জুলাই বিকেলে মাদ্রাসা ছুটির পর অন্য শিক্ষার্থীরা মাঠে খেলতে গেলে ওই শিশুকে এতিমখানার হেফজ বিভাগের দ্বিতীয় তলার একটি শ্রেণিকক্ষে ডেকে নিয়ে আবারও বলাৎকার করা হয়। পাশাপাশি বিষয়টি কাউকে না বলতে ভয়ভীতিও দেখানো হয়। এদিকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সাভারের এক মাদ্রাসায় সাত শিশু বলাৎকারের শিকার হয়। প্রথমে এক সিনিয়র শিক্ষার্থী সাত বছরের শিশুশিক্ষার্থীকে বলাৎকার করে। সেই খবর জেনে যায় মাদ্রাসার আরেক শিক্ষার্থী। পরে সেই শিক্ষার্থীও শিশুটিকে ধর্ষণ করে। এভাবে ক্রমান্বয়ে বিভিন্ন সময়ে শিশুটিকে ধর্ষণে যুক্ত হয় ওই মাদ্রাসারই আরও তিন শিক্ষার্থী। একপর্যায়ে শিশুটিকে ধর্ষণ করেন ওই মাদ্রাসার এক শিক্ষকও। সহপাঠীদের কাছে নির্যাতনের শিকার হয়ে নিরাপত্তার জন্য শিশুটি ওই শিক্ষকের দ্বারস্থ হয়েছিল। গত জুনেও গোপালগঞ্জে ছয় বছর বয়সী এক শিশুকে মাদ্রাসার নুরানি বিভাগের শিক্ষক কয়েক মাস ধরে যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণ করেছেন—এমন অভিযোগে মামলা ও গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়।

শুধু মাদ্রাসা নয়, ২০২৫ সালের মার্চে বাংলাদেশে শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতা বৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল ইউনিসেফও। সংস্থাটি বিশেষভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো শিশুদের সুরক্ষা ও বিকাশের জন্য নির্ধারিত স্থানেও যৌন সহিংসতার ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিল।

নিরাপত্তার জায়গাগুলোতেই যদি নিরাপত্তা না থাকে : বাড়ি, স্কুল, মক্তব, মাদ্রাসা, মসজিদ শিশুর বেড়ে ওঠার প্রতিটি জায়গার সঙ্গেই জড়িয়ে থাকে বিশ্বাস। অভিভাবক সন্তানকে শিক্ষকের কাছে দেন এই বিশ্বাসে যে তিনি তাকে শিক্ষা দেবেন। মক্তবে পাঠান ধর্মীয় জ্ঞান শেখার জন্য। আত্মীয়ের কাছে রেখে যান এই ভরসায় যে আপনজনের কাছে সন্তান নিরাপদ থাকবে। কিন্তু সেই বিশ্বাসের জায়গাগুলোতেই যদি নির্যাতন ঘটে, তাহলে শিশুটি সাহায্য চাইবে কার কাছে?

এ কারণেই শিশু সুরক্ষার ব্যবস্থা শুধু কাগজে-কলমে থাকলে হবে না। প্রতিটি শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে শিশুর অভিযোগ জানানোর নিরাপদব্যবস্থা, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অভিযোগকারীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. আনিসুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, কোনো শিশু অস্বাভাবিক আচরণ করলে তাকে বকাঝকা না করে শুনতে হবে। সে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে ‘ও এমন করবে কেন’ এই প্রশ্ন না তুলে প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত, ‘তুমি নিরাপদ তো?’ নির্যাতনের শিকার শিশুরা অনেক সময় দেরিতে কথা বলে। বাবা মায়েরা এতদিন যে ভয় কল্পনাও করেননি, সেটিই তার সন্তানের বাস্তবতা। বাবা-মার উচিত এসব বিষয় নিয়ে সন্তানদের সঙ্গে খোলামেলা আলাপ করা। তাহলে অনেক শিশুর জীবন বেঁচে যাবে।

তিনি বলেন, সন্তানদের শেখাতে হবে গুড টাচ ও ব্যাড টাচ সম্পর্কে। পরিবারের সদস্য হলেও কেউ তার শরীরের সীমা লঙ্ঘন করতে পারে না; শিক্ষক হলেও কেউ তাকে স্পর্শ করার অধিকার পায় না; আর কেউ তাকে ভয় দেখালে বা কোনো কিছু গোপন রাখতে বললে অবশ্যই বাসায় জানাতে হবে।

শিক্ষা সচিব আব্দুল খালেক বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি সেল বাধ্যতামূলক। যারা এ নিয়ম মানবে না তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা বিষয়টি নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবছি। যেসব শিক্ষকদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ প্রমাণিত হবে তাদের বিরুদ্ধে কঠিন ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত