কালোটুপির গাঙচিল

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:২২ এএম

দুই বছর আগের কথা। ছোট নডি নামে নতুন একটি পাখির খোঁজে কক্সবাজারের সোনাদিয়া দ্বীপপুঞ্জে গিয়েছি। দুজন বিদেশি পক্ষিবিদ ২০২৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর সোনাদিয়ায় পাখিটির সন্ধান পান। ২৭ সেপ্টেম্বর ভোরে কক্সবাজার পৌঁছে নূরুল আফসারের স্পিডবোটে করে আমরা ছয়জন মহেশখালী চ্যানেলের দিকে যাই। ওখানে পাখিটিকে না পেয়ে কালাদিয়া চরের উদ্দেশ্যে রওনা হই। কালাদিয়ায় হাজারখানেক সৈকত পাখির একটি ঝাঁকের দেখা পাই। কিন্তু ওই ঝাঁকে নতুন পাখিটি ছিল না। আমি যখন ঝাঁকের পাখিগুলোর ছবি তোলায় ব্যস্ত তখন হঠাৎ ঝাঁক থেকে দুটি পাখিকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পাশের বেলেকেরদিয়ার চরের দিকে যেতে দেখলাম। তখন সকাল ১০টা ১০ মিনিট। দ্রুত উড়ন্ত পাখি দুটির দিকে ক্যামেরা তাক করে দুটি ক্লিক করলাম। ছবি রিভিউ করতেই মনটা খুশিতে ভরে উঠল। কারণ দুটি পাখির মধ্যে যেটির মাথায় কালোটুপির মতো ছিল, সেটি একটি দুর্লভ পানপায়রা বা গাঙচিল। যদিও ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মার্চের মধ্যে পাখিটির প্রচুর ছবি তুলেছিলাম, কিন্তু হার্ডড্রাইভ নষ্ট হওয়ার কারণে সব ছবি হারিয়ে ফেলেছিলাম। দুপুর পৌনে ১২টায় একই প্রজাতির আরেকটি পাখির দেখা পাই বেলেকেরদিয়ার চরে গাঙচিল-গঙ্গাকৈতরের ঝাঁকে। এরপর দুপুর সোয়া ২টায় আরও দুটিকে দেখলাম বেলেকেরদিয়ার পাশের ছোট্ট একচিলতে চরে।

২০২০ সালের ১৭ জানুয়ারি কালোটুপির গাঙচিলটিকে প্রথম দেখেছিলাম কালাদিয়া চরে মহাবিপন্ন চামচঠোঁটি চাপাখির খোঁজ করতে গিয়ে। সেবার স্পিডবোট কালদিয়া চরের মাটি স্পর্শ করতেই আমরা ছয়জন পক্ষি আলোকচিত্রী চরের চারদিকে ছড়িয়ে পড়লাম। যেখানেই ছোট চাপাখির ঝাঁক দেখছি সেখানেই বাইনোকুলার ধরছি। আর এভাবে করতে করতেই মহাবিপণœ পাখিটি খুঁজে পাওয়ার আগেই কালাদিয়া চর থেকেই চার-চারটি নতুন পাখি (লাইফার) পেয়ে গেলাম। চর ধরে হাঁটতে হাঁটতে একসময় তীরের কাছে চলে এলাম। ওখান থেকে খানিকটা সামনে যেতেই বিশাল একঝাঁক গাংচিলকে চরের ভেতর একচিলতে খাদের পানিতে নামতে দেখলাম। ওরা গোসল করছে। খানিকটা এগিয়েই পটাপট কয়েকটা সাক্ষী ছবি তুললাম। ক্যামেরার স্ক্রিনে জুম করতেই পঞ্চম নতুন পাখি পাওয়ার আনন্দে মনটা ভরে উঠল। সেই নতুন পাখিটিই ছিল ২০২৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর দেখা মাথায় কালোটুপি পরা গাংচিলটি।

এতক্ষণ কক্সবাজারের সোনাদিয়া দ্বীপপুঞ্জে দেখা কালোটুপির যে গাংচিলটির গল্প বললাম, সে এদেশের দুর্লভ শীতের পরিযায়ী পাখি মাঝারি গাংচিল। পশ্চিমবঙ্গে বলে কালোটুপি পানপায়রা। ইংরেজি নাম ঈড়সসড়হ ঞবৎহ। ল্যারিডি গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম ঝঃবৎহধ যরৎঁহফড়। উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ, আফ্রিকা, এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় পাখিটির বৈশি^ক বিস্তৃতি রয়েছে।

কালোটুপি গাংচিলের দৈর্ঘ্য ৩২-৩৯ সেন্টিমিটার। ওজন ৯৭-১৪৬ গ্রাম। প্রজননকাল ছাড়া অন্য সময় পাখিটির কপাল সাদা, মাথার পেছন ও ঘাড় কালো, পিঠ-ডানা হালকা ধূসর ও দেহের নিচটা সাদা। চঞ্চু কালো ও পা লালচে-কালো। অন্যদিকে, প্রজননকালে প্রাপ্তবয়স্ক পাখির মাথায় ঘন কালো টুপির মতো দেখা যায়। দেহের ওপরটা হয় হালকা ধূসরাভ এবং ঘাড়, গলা, কোমর ও দেহের নিচটা হয় সাদাটে। চোখের রঙ কালচে-বাদামি। কালো আগাসহ ঠোঁট উজ্জ¦ল লাল। পা ও পায়ের পাতা লাল। স্ত্রী ও পুরুষ পাখি দেখতে একই রকম। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির দেহের উপরটায় গাঢ় দাগছোপ থাকে। চোখের রঙ কালচে-বাদামি। চঞ্চু কালো। পা ও পায়ের পাতা কমলা।      

শীতকালে পাখিটিকে এদেশের উপকূলীয় এলাকা এবং বড় নদী ও জলাশয়ে দেখা যায়। দিবাচর, জলচর ও স্থলচর পাখিটি একাকী বা ছোট দলে বিচরণ করে। পানির সামান্য উপরে উড়ে চলে ও পানি থেকে ছোঁ মেরে মাছ ধরে খায়। তবে চিংড়ি, শামুক ও জলজ পোকামাকড়ও খেতে পারে। সচরাচর কর্কশ গলায় ‘ক্রিয়াহ-ক্রিয়াহ-ক্রিয়াহ ---’ শব্দে ডাকে।

এপ্রিল থেকে জুন প্রজননকাল। এ সময় প্রজনন এলাকার পানির কাছাকাছি সৈকত বা দ্বীপের ভূমিতে ভেজা ঘাস ও আগাছার মাঝখানে বালি সরিয়ে তাতে সাদামাটা বাসা বানায়। ডিম পাড়ে তিনটি, রঙ গাঢ় ছিটছোপসহ হালকা হলুদ। স্ত্রী-পুরুষ মিলেমিশে তা দেয়। ডিম ফোটে ২১-২৮ দিনে। ছানারা ২৭-৩০ দিনে উড়তে শিখে। তবে বয়ঃপ্রাপ্ত হতে প্রায় তিন বছর সময় লাগে। গড় আয়ুষ্কাল এগার বছর।

লেখক : পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত