ইরান কি নতিস্বীকার করবে

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৩৮ এএম

কূটনীতিকরা যখন চুক্তির জন্য জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন, তখন নিউ ইয়র্কে গত মঙ্গলবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে ইরানকে ধ্বংস করার হুমকি দিলেন ট্রাম্প। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ‘যুদ্ধ অবসানের চুক্তি না হলে, ইরানকে ধ্বংস করে দিতে পারেন। তবে চলমান কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যে এমন ইঙ্গিতও দিয়েছেন শিগগিরই হয়তো কোনো সমঝোতা হতে পারে।’ নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া এক ভাষণে ট্রাম্প বলেন, ‘আমাকে একটি বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ইরানের সঙ্গে কি এমন চুক্তি করা হবে, যা তাদের পুনর্গঠিত হয়ে অতীতের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী ও উন্নত একটি দেশ গড়ে তোলার সুযোগ দেবে, নাকি আমি এই ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে ধ্বংস করে দেব?’ ‘যুক্তরাষ্ট্র যত দমন-পীড়ন চালাবে, ইরান তত কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।’ ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বুধবার ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এমন সতর্ক করেছেন।  জাতিসংঘ রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়ার সময় পেজেশকিয়ান বলেন, ‘ইরান সংলাপ, কূটনীতি ও আলোচনার জন্য প্রস্তুত, কিন্তু তারা শক্তির ভাষা মেনে নেবে না।’ যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল আবার হামলা চালালে, চলমান যুদ্ধ ভারত মহাসাগর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির উপদেষ্টা ইয়াহিয়া রহিম সাফাভি। যুক্তরাষ্ট্রের দূত স্টিভ উইটকফ ‘এক্স’-এ জানিয়েছেন, ‘গত মঙ্গলবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা হয়েছে। মধ্যস্থতাকারীরা দিনভর উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচনা করেছেন। তারা কার্যক্রম চালিয়ে যাবেন বলে উল্লেখ করে উইটকফ আশা প্রকাশ করে বলেছেন, মঙ্গলবারের আলোচনা ‘গঠনমূলক ও আশাব্যঞ্জক’। ইতিমধ্যে ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের এমন সব দেশের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন, যারা হরমুজ প্রণালি দিয়ে পুনরায় জাহাজ চলাচল শুরু করতে আগ্রহী। এই প্রণালিটি যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশের পথ ছিল। তবে তাদের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী ইরানকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়ে তারা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। উপসাগরীয় অনেক দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, যেগুলো যুদ্ধের সময় বারবার ইরানের হামলার শিকার হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের সময় ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা মনে করি, ইরানের বিষয়টি (৩ নভেম্বর) মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর বা তার আগেই মীমাংসা হতে পারে, আমি নিশ্চিত নই। আসলে আগে থেকে কিছু বলা যায় না।’ এই কূটনৈতিক তৎপরতা এমন সময়ে চলছে, যখন ট্রাম্পকে বিভিন্ন চাপের মোকাবিলা করতে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে জ¦ালানি মূল্যবৃদ্ধি, বিদেশে আঞ্চলিক সংঘাত বিস্তার এবং মাত্র ছয় সপ্তাহ দূরে থাকা মধ্যবর্তী নির্বাচন, যা  ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থানকে নতুন রূপ দিতে পারে। এই আলোচনার ফলে কোনো চুক্তি হবে নাকি সংঘাত আরও তীব্র হবে, তার ওপর নির্ভর করছে বিশ্ব তেলের বাজার, উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা এবং লাখ লাখ ইরানি নাগরিকের ভাগ্য। ইরানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি সামরিক চাপ কমায় এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধ তুলে নেয়, তবে তেহরান কয়েক দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে পারে। রয়টার্সকে তিনি জানান, গত সপ্তাহে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনকে তাদের সর্বশেষ প্রস্তাব জানানো হয়েছে এবং দাবি পূরণ হলে সাত দিনের মধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচলের জন্য প্রণালিটি খুলে দেওয়া সম্ভব। ইরানের দৃঢ় অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ বলেছেন, ‘ইরান কখনো নতি স্বীকার করবে না। ট্রাম্পকে অবশ্যই বুঝতে হবে, তিনি ইরানি জনগণ ও তাদের সশস্ত্র বাহিনীর ওপর নিজের ক্ষমতা চাপিয়ে দিতে পারবেন না।’  উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে বৃহত্তম রাষ্ট্র সৌদি আরব, চলতি মাসে যুদ্ধের আরও গভীরে জড়িয়ে পড়েছে। কারণ ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতি যোদ্ধারা সৌদি-সমর্থিত সরকারের বাহিনীকে পরাজিত করে সামনে এগিয়েছে এবং লোহিত সাগরের মধ্য দিয়ে সৌদি তেল রপ্তানির জন্য হুমকি সৃষ্টি করেছে। গত বছর দুই মাস ধরে হুথিদের ওপর বোমা হামলা চালানো যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের যুদ্ধে পুনরায় যোগ দেওয়ার অনুরোধ বারবার প্রত্যাখ্যান করেছেন। নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ট্রাম্প গত রবিবার শেষ মুহূর্তে হুথিদের বিরুদ্ধে মার্কিন হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত বাতিল করেন। হুথিদের ওপর হামলা থেকে ওয়াশিংটন কেন বিরত রয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন,  যুক্তরাষ্ট্র সবসময় সৌদি আরবকে সমর্থন করবে। তিনি আরও বলেন, ‘তবে এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক ও জটিল একটি সংঘাত, যা অনেক আগে থেকেই চলে আসছে।  হুথিদের সঙ্গেও আমাদের একটি ইতিহাস রয়েছে এবং আমরা চাই না যে, এর ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ুক।’  গত মঙ্গলবার তেলের বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে। রয়টার্স জানাচ্ছে, সৌদি আরব তাদের ‘ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন’-এর কার্যক্রম পুনরায় শুরু করেছে এবং লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর থেকে তেল রপ্তানি আবার চালু করতে পারে, যদিও তা হবে সীমিত পরিমাণে। হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট বিঘœ এড়াতে ব্যবহৃত সৌদি আরবের প্রধান রপ্তানিপথ পাইপলাইনটি চলতি মাসে হামলার শিকার হওয়ার পর বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। সৌদি আরব ইরাকে অবস্থিত ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোকে এই হামলার জন্য দায়ী করেছে। তবে ট্রাম্পের হুমকি শেষ পর্যন্ত কোন দিকে গড়ায়, তা নিয়ে অনেক দেশ বিভিন্ন কারণে শঙ্কিত। কারণ বিশ্ববাজারে জ¦ালানি তেল সরবরাহের বড় বাজার হচ্ছে ইরান।

লেখক : সাংবাদিক

 [email protected] 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত