ভিটামিন সুস্বাস্থ্যের জন্য অত্যাবশ্যকীয় জৈবিক উপাদান। খুব অল্প পরিমাণে ভিটামিন বিভিন্ন মেটাবলিক বিক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে শরীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভিটামিনের অভাবে এসব গুরুত্বপূর্ণ মেটাবলিক বিক্রিয়া বিঘিœত হলে, স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। ভিটামিন ও খনিজ পদার্থের উৎকৃষ্ট উৎস খাদ্য। সুষম খাদ্য গ্রহণকারী একজন স্বাস্থ্যবান লোক বাড়তি ভিটামিন অর্থাৎ বাজারজাত ভিটামিন খেয়ে বাড়তি সুবিধা বা উপকার লাভ করে না। যুক্তরাষ্ট্রে কার্যত ভিটামিন ঘাটতি মোটেই পরিলক্ষিত হয় না। তাই এ প্রসঙ্গে দ্য আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব নিউট্রেশন, দ্য আমেরিকান সোসাইটি ফর ক্লিনিক্যাল নিউট্রেশন, দ্য আমেরিকান ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশন এবং আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন সম্মিলিতভাবে নিম্নে প্রদত্ত বিবৃতিটি প্রকাশ করে ‘স্বাস্থ্যবান শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক লোকের উচিত, খাদ্যদ্রব্য থেকে পর্যাপ্ত পুষ্টি গ্রহণ করা। বাজারজাত ভিটামিন বা খনিজ পদার্থের পরিবর্তে, পরিমিত খাদ্যদ্রব্য থেকে পুষ্টি গ্রহণ করলে পুষ্টি ঘাটতি বা পুষ্টি এবং ভিটামিনের মাত্রাধিক্যের ভয়ংকর ঝুঁকি নেমে আসে।’
ভিটামিন শরীরের জন্য অত্যাবশ্যকীয় উপাদান হলেও, মানুষের প্রতিদিন মাত্র কয়েক মিলিগ্রাম পরিমাণ ভিটামিন প্রয়োজন হয়। উদাহরণস্বরূপ, শিশুরা মায়ের দুধ থেকে প্রতিদিন প্রায় ৩৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন ‘সি’ পেয়ে থাকে। একজন শিশুর প্রতিদিন এর চেয়ে বেশি ভিটামিন ‘সি’ দরকার হয় না। একজন প্রাপ্তবয়স্ক লোকের ভিটামিন ‘সি’ এর চাহিদা ৬০-৭০ মিলিগ্রাম। একটি মাঝারি আকারের কমলায় ১১০ মিলিগ্রাম ভিটামিন ‘সি’ থাকে। এ ছাড়া লেবু, টমেটো, পেয়ারা, কাঁচামরিচ, ফুলকপি, পালংশাক, কলিজা, কালোজাম, আঙ্গুর, ফুটি, আনারস, জাম্বুরা, স্ট্রবেরি, তরমুজ, বাঁধাকপি, ভিটামিন সি-এর উৎকৃষ্ট উৎস। একজন প্রাপ্তবয়স্ক লোকের জন্য ভিটামিন ‘এ’-এর দৈনিক চাহিদা মাত্র ১.৫ মিলিগ্রাম (৫০০০ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিট)। ৪ আউন্স গরুর বাছুরের কলিজায় ১১.১৩ মিলিগ্রাম ভিটামিন ‘এ’ থাকে। এক কাপ গাজরে রয়েছে ৫.০৪ মিলিগ্রাম, এক কাপ মিষ্টি কুমড়ায় ৪.৩৭ মিলিগ্রাম, এক কাপ রান্না করা পালংশাকে ৫ মিলিগ্রাম, একটি মিষ্টি আলুতে (১১০ গ্রাম) ৩ মিলিগ্রাম ভিটামিন ‘এ’ রয়েছে। এ ছাড়া তরমুজ, টমেটো, ডিম, দুধ, শিম, ব্রোকলি. অ্যাপ্রিকট এবং হলুদ ফলমূল ও শাকসবজিতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ‘এ’ থাকে। ডিম, দুধ, পনির, মাখন, ফিশ লিভার অয়েল, যেমন কডলিভার অয়েল ভিটামিন ‘ডি’-এর চমৎকার উৎস। এ ছাড়া বাংলাদেশের মতো রোদের দেশে সূর্য কিরণের প্রভাবে গাত্রচর্ম থেকে যথেষ্ট ভিটামিন ‘ডি’ উৎপন্ন হয়। ভিটামিন ‘ই’-এর দৈনন্দিন চাহিদা সম্পর্কে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য নেই। তবে এর প্রয়োজনও খুব বেশি কেউ অনুভব করে না। যাবতীয় খাদ্যদ্রব্য বিশেষ করে ভোজ্য তেলে প্রচুর ভিটামিন ‘ই’ পাওয়া যায়। শাকসবজি ভিটামিন ‘ই’-এর খুব ভালো উৎস। থায়মিন (বি ১) রাইবোফ্ল্যাভিন (বি ২), নিয়াসিন বা নিকোটেনিক অ্যাসিড (বি ৩), পিরিডকসিন (বি ৬) পেন্টোথেনিক অ্যাসিড, ফোলিক অ্যাসিড, বায়োটিন, সায়ানোকোবালেমাইন (বি ১২) বি কমপ্লেক্স গ্রুপের ভিটামিন। থায়মিন বা বি ১-এর দৈহিক চাহিদা প্রতি এক হাজার ক্যালরির জন্য মাত্র ০.৪ মিলিগ্রাম। ঢেঁকি ছাঁটা চালের আবরণ, শিমের বিচি, ডিম, দুধ, মাংস, মাছ, সবুজ শাকসবজি ভিটামিন বি ১-এর উৎকৃষ্ট উৎস। রাইবোফ্ল্যাভিন বা বি ২ ভিটামিনের দৈনিক চাহিদা পুরুষের জন্য ১৭ এবং মহিলাদের জন্য ১৫ মিলিগ্রাম। দুধে সবচেয়ে বেশি ভিটামিন বি-২ পাওয়া যায়। এ ছাড়া সবুজ শাকসবজি, মাংস, বিশেষ করে কলিজা, বাদাম, ইস্ট, নিয়াসিন বা ভিটামিন বি-৩ এর ভালো উৎস। একজন পুরুষের জন্য প্রতিদিন ১৮ এবং একজন মহিলার জন্য প্রতিদিন ১৩ মিলিগ্রাম নিয়াসিন দরকার। প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য পিরিডকসিনের দৈনন্দিন প্রয়োজন ২ মিলিগ্রাম মাত্র। ডিম, দুধ, গম, শাকসবজিতে প্রচুর পিরিডকসিন থাকে। সাধারণ খাদ্যদ্রব্যে এত বেশি পেন্টোথেনিক অ্যাসিড থাকে যে, এ ভিটামিনের ঘাটতির কথা একদম শোনাই যায় না। সায়ানোকোবালেমাইন বা ভিটামিন বি ১২-এর দৈনিক চাহিদা মাত্র ৫ মাইক্রোগ্রাম। ডিম, দুধ, কলা, যকৃতে প্রচুর বি ১২ রয়েছে।
ওষুধ কোম্পানিগুলো এবং এদের সহায়ক শক্তিগুলো অপুষ্টিকে রোগ হিসেবে চিহ্নিত করে অপুষ্টি ও ভিটামিন ঘাটতির প্রতিকারে চিকিৎসার ওপর বেশি গুরুত্ব ও প্রাধান্য দিয়ে থাকে এবং ভিটামিনকে ড্রাগ হিসেবে প্রমোট করতে সব ধরনের কলাকৌশল ব্যবহার করে। ভিটামিন শুধু ওষুধ ব্যবসায়ী বা ওষুধ ব্যবসায়ী দ্বারা প্রলুব্ধ চিকিৎসকদের কাছে নয়, এদের কারণে ভিটামিন সাধারণ মানুষের কাছেও মোহনীয় অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন সুপার স্টার, এক মহানায়ক। এক সময় ঢালাওভাবে বলা হতো, বাজারজাত ভিটামিন, মাল্টিভিটামিন ছাড়া শিশুর বয়ঃবৃদ্ধি হয় না, মগজ খোলে না, ভিটামিন ছাড়া গর্ভবতী মায়েদের সুসন্তান জন্ম হয় না, শ্রীবৃদ্ধি এবং জীবনীশক্তি ফিরে পাওয়ার জন্য মাল্টিভিটামিন, দীর্ঘদিন সুস্থ ও জোয়ান থাকার জন্য মাল্টিভিটামিন আরও কত কী! এবার উদাহরণ। মনে আছে, ১৯৯১ সালের এপ্রিল মাসে ‘দ্য জার্নাল অব দ্য আমেরিকান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের ভারতীয় সংস্করণে স্মিথ ক্লাইন বিচাম কোম্পানি তাদের দস্তাসমৃদ্ধ মাল্টিভিটামিন জেভিটের দীর্ঘ তালিকায় অন্য সবের মধ্যে মেজাজ পরিবর্তন, কর্মপ্রেরণা হারানো, অনুর্বরতা, পুরুষত্বহীনতা, বিষণœতা, তন্দ্রাচ্ছন্নতার মতো উপসর্গে মাল্টিভিটামিন জেভিট কার্যকর বলে দাবি করেছিল। এই পরিপ্রেক্ষিতে বই, পুস্তক, জার্নাল এবং অন্যান্য উৎস অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, এসব অলৌকিক দাবির ভিত্তি নেই।
১৯৯১ সালে ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে এবোট কোম্পানি তাদের খনিজ ও ভিটামিন সমৃদ্ধ মাল্টিভিটামিন ‘প্যারামেটস’কে শিশুর বয়ঃবৃদ্ধির উদ্দীপক (Grwoth Stimulant) হিসেবে উল্লেখ করছিল। ভিটামিনকে শিশুর বয়ঃবৃদ্ধির উদ্দীপক হিসেবে আখ্যায়িত করা চরম ভুল এবং নৈতিকতা বিরুদ্ধ। ১৯৯২ সালে ব্রিটেন তিনটি ভিটামিন প্রস্তুতকারক ওষুধ কোম্পানি Seven Seas, Rwa Power, Lakhall Labortotries-কে ‘ভিটামিন শিশুর প্রতিভা বৃদ্ধি করে’ এ দাবির জন্য অভিযুক্ত করা হয়েছিল। এ ধরনের বক্তব্য বা দাবির পেছনে বৈজ্ঞানিক কোনো ভিত্তি নেই। রোগ ও ওষুধের প্রতি মানুষ চিরদিনই দুর্বল। মানুষ ভালো থাকতে চায়, সুস্থ থাকতে চায়, চিরজীবন জোয়ান ও শক্তিশালী থাকতে চায়। তাই মানুষ অসৎ ব্যবসায়ীদের প্ররোচনায় প্রলুব্ধ হয়ে খাদ্য না কিনে নামি-দামি ভিটামিন, মাল্টিভিটামিন কিনে। আমাদের বেশিরভাগ চিকিৎসকও নির্বিচারে এসব ভিটামিন অহেতুক তাদের প্রেসক্রিপশনে লিখেন। তাই ভিটামিন, অ্যালকালাইজার, হজমকিারক, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, কফমিকচার, টনিকজাতীয়
তথাকথিত ওষুধের ব্যবসা বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা। এসব পণ্যের উৎপাদন ব্যয় অত্যন্ত কম, অথচ বাজারে চড়াদামে বিক্রি করে প্রচুর মুনাফা অর্জন করা সম্ভব।
ভিটামিন ‘এ’-এর মাত্রাতিরিক্ত প্রয়োগ শরীরের রক্তের ক্যালসিয়ামের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় এবং ফলে শরীরে দুর্বলতা, বমিবমি ভাব, তন্দ্রাভাব, পেটের ব্যথা, তৃষ্ণা, কোষ্ঠকাঠিন্য, ক্ষুধামান্দ্য, কিডনিতে পাথর সৃষ্টিসহ কিডনি ধ্বংস করতে পারে। আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন শিশু-কিশোর এবং যাদের পর্যাপ্ত সূর্যকিরণের সংস্পর্শে আসার সুযোগ রয়েছে এবং স্বাভাবিক খাবার খাওয়ার সংগতি রয়েছে। তাদের বাজারজাত ভিটামিন ‘ডি’ পরিহার করে চলতে পরামর্শ দিয়ে থাকে। দীর্ঘদিন ধরে মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণে ভিটামিন ‘ডি’ গ্রহণ করলে শিশুর শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতে পারে। কিডনির নিষ্ক্রিয়তার কারণে মৃত্যু ঘটতে পারে। প্রতিদিন ২৫ মাইক্রোগ্রামের অধিক ভিটামিন ‘ডি’ প্রয়োগে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
যেহেতু ভিটামিন ‘ই’ তেলে দ্রবণীয় ভিটামিন, এই ভিটামিনের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারেও যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত মাত্রায় ভিটামিন ‘ই’ খেলে পেশির দুর্বলতা, বমি বমি ভাব, মাথা ব্যথা, অবসাদ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যেতে পারে। শরীরে ভিটামিন ‘ই’ ঘাটতি হয় বলে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই বাজারজাত ভিটামিন ‘ই’ গ্রহণের যৌক্তিকতা নেই। পানিতে দ্রবণীয় ‘বি’ ভিটামিনগুলো এবং ভিটামিন ‘সি’ বেশি মাত্রায় গ্রহণ করলেও সহজেই শরীর থেকে বেরিয়ে যায় বলে এসব ভিটামিন তেমন কোনো জটিল পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে না। তারপরও দৈনিক এক গ্রামের বেশি ভিটামিন ‘সি’ খেলে ডায়রিয়া এবং অন্ত্রনালির অস্বাভাবিকত্ব দেখা দেয়। বেশি মাত্রায় ভিটামিন ‘সি’ খেলে সাধারণ রক্ত পরীক্ষার ফলাফলে বেশ অসংগতি পরিলক্ষিত হয়।
অনেকে মনে করেন, যথেচ্ছ ভিটামিন গ্রহণে কোনো ক্ষতি নেই, ভিটামিন নিরাপদ উপাদান ধারণাটি সত্য নয়। কোনো কোনো ভিটামিনের মাত্রাতিরিক্ত প্রয়োগ, স্বল্প পরিমাণে কার্যকর অত্যাবশ্যকীয় উপাদানগুলোর ঘাটতি সৃষ্টি করে এবং অত্যাধিক মাত্রায় খনিজদ্রব্য, তেলে দ্রবণীয় ভিটামিন (ভিটামিন এ, ডি, কে, ই) এবং কিছু কিছু জলে দ্রবণীয় ভিটামিনের (ভিটামিন সি, বি গ্রুপের ভিটামিনগুলো) মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে। ভিটামিন গ্রহণের পূর্বে প্রত্যেকের এ ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা বাঞ্ছনীয়।
লেখক : ওষুধ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। সাবেক ডিন, ফার্মেসি অনুষদ, ঢাবি। বর্তমানে ডেফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনারত।