সব মানুষের চিন্তা একরকম নয়। একই বিষয়কে দুজন মানুষ ভিন্নভাবে দেখতে পারে, একই ঘটনা থেকে দুজন ভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে। এটি মানুষের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। পৃথিবীতে যতদিন মানুষ থাকবে, ততদিন মতের পার্থক্যও থাকবে। সমস্যা মতভেদে নয়, সমস্যা তখনই হয়, যখন মতভেদ আমাদের হৃদয়ে বিদ্বেষ সৃষ্টি করে, সম্পর্ক নষ্ট করে এবং একে অপরের প্রতি সম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়।
একটি সুন্দর সমাজ এমন হওয়া উচিত, যেখানে মতভেদ থাকবে, কিন্তু মনোমালিন্য থাকবে না। যুক্তিতে ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু হৃদয়ে থাকবে ভালোবাসা। সিদ্ধান্তে পার্থক্য থাকবে, কিন্তু পরস্পরের প্রতি থাকবে শ্রদ্ধা। ইসলামের সৌন্দর্য এখানেই, মতপার্থক্যকে মানবিক বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করে সম্পর্ক ও ভ্রাতৃত্ব রক্ষার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
মতভেদ মানেই শত্রুতা নয় : আমরা অনেক সময় এমনভাবে আচরণ করি, যেন আমার মতের সঙ্গে যার মত মেলে না, সে আমার প্রতিপক্ষ। অথচ মতের অমিল মানেই সবকিছুর অমিল নয়। একজন মানুষ কোনো বিষয়ে আমার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতে পারেন, কিন্তু তিনি আমার বন্ধু, আত্মীয়, সহকর্মী কিংবা দ্বীনি ভাই হিসেবেই থাকতে পারেন।
দুঃখজনকভাবে বর্তমান সময়ে আমরা মতের পার্থক্যকে ব্যক্তিগত বিরোধে পরিণত করে ফেলছি। রাজনৈতিক মত, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, শিক্ষাপদ্ধতি, পারিবারিক সিদ্ধান্ত কিংবা কোনো ধর্মীয় বিষয়ে মতভেদ হলেই অনেক সময় সম্পর্ক ছিন্ন করার প্রবণতা দেখা যায়।
সাহাবায়ে কেরামের জীবন থেকে শিক্ষা : সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সরাসরি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মানুষ। তাদের মধ্যেও বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য হয়েছে। কিন্তু মতপার্থক্য তাদের পারস্পরিক ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বকে নষ্ট করেনি।
কোনো বিষয়ে নিজের মতকে সঠিক মনে করা আর অন্যকে অপমান করা এক বিষয় নয়। নিজের বক্তব্যের পক্ষে দলিল উপস্থাপন করা যায়, যুক্তি দেওয়া যায়, অন্যের বক্তব্যের দুর্বলতা তুলে ধরা যায়, কিন্তু এ জন্য ব্যক্তিকে হেয় করা, তার নিয়ত নিয়ে প্রশ্ন তোলা কিংবা তার সম্মান নষ্ট করা ইসলামের আদর্শ নয়।
আমাদের পূর্বসূরি আলেমদের জীবনেও ইলমি মতপার্থক্যের অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। তারা একে অপরের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছেন, কিন্তু পরস্পরের ইলম, মর্যাদা ও ব্যক্তিত্বকে সম্মান করেছেন। তাদের মতভেদ ছিল জ্ঞানচর্চার অংশ, ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণ নয়।
সত্যকে যাচাই করা : মনোমালিন্যের অন্যতম কারণ হলো, নিজের মতকেই একমাত্র সত্য মনে করা। আমরা অনেক সময় মনে করি, আমি যেভাবে বিষয়টি বুঝেছি, সেটিই একমাত্র সঠিক ব্যাখ্যা। অন্য কেউ ভিন্ন কথা বললে মনে করি, সে হয় অজ্ঞ, নয়তো অসৎ উদ্দেশ্যে কথা বলছে। অথচ একজন মানুষ আন্তরিক হয়েও ভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেন। তার কাছে এমন কোনো তথ্য থাকতে পারে, যা আমার জানা নেই। তার অভিজ্ঞতা আমার চেয়ে ভিন্ন হতে পারে। এমনকি একই দলিল থেকেও কেউ ভিন্ন ব্যাখ্যা গ্রহণ করতে পারেন। তাই নিজের মতের প্রতি দৃঢ় থাকা এবং নিজের ভুলের সম্ভাবনা স্বীকার করা, দুটিকে পাশাপাশি রাখতে হবে। সত্যের অনুসন্ধানী মানুষ নিজের বক্তব্যকে ভালোবাসেন, কিন্তু সত্যকে তার চেয়েও বেশি ভালোবাসেন।
কথায় সংযম : মতভেদের সময় আমাদের সবচেয়ে বেশি সতর্ক হতে হয় জিহ্বা ও ভাষার ব্যাপারে। একটি কঠিন শব্দ অনেক বছরের সম্পর্ক নষ্ট করে দিতে পারে। একটি অপমানজনক মন্তব্য মানুষের হৃদয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষত তৈরি করতে পারে। কেউ আমার বক্তব্যের বিরোধিতা করলে তাকে বোকা, অজ্ঞ, স্বার্থপর কিংবা অন্য কোনো অপমানজনক শব্দ দ্বারা আঘাত করার প্রয়োজন নেই। তার বক্তব্যের জবাব বক্তব্য দিয়েই দেওয়া যায়।
সোশ্যাল মাধ্যমে সতর্কতা : বর্তমানে মতভেদের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্রগুলোর একটি হলো সামাজিক মাধ্যম। এখানে মানুষ মুহূর্তের মধ্যে নিজের মত প্রকাশ করতে পারে। ফলে অনেক সময় যাচাই-বাছাই ছাড়াই মন্তব্য, পোস্ট ও প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করা হয়। সামনাসামনি কাউকে যে কথা বলতে আমরা সংকোচ বোধ করি, মোবাইলে তা খুব সহজেই লিখে ফেলি। অথচ অনলাইনে লেখা কথাও মানুষের হৃদয়ে আঘাত করে। বরং তা আরও ভয়াবহ হতে পারে। কারণ একটি মন্তব্য মুহূর্তে হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
মতভেদে সম্পর্ক যেন না ভাঙে : কোনো বিষয়ে দ্বিমত হলে আমরা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে পারি, দলিল উপস্থাপন করতে পারি, নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে পারি। কিন্তু ব্যক্তিগত বিষয় টেনে আনা, পুরনো ভুল মনে করিয়ে দেওয়া, গোপন তথ্য প্রকাশ করা কিংবা পরিবারের সদস্যদের সামনে অপমান করা কোনোভাবেই সুস্থ মতভেদের পদ্ধতি নয়।
লেখক : শিক্ষক, মাদরাসাতুদ দাওয়াহ
আশ-শরইয়্যাহ, নারায়ণগঞ্জ