ঘরের দরজা খুললেই হয়তো ছেলে ফিরে আসবে এই আশায় প্রতিদিন দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন সূর্যবান বেগম। গত দুই মাস ধরে এমনই অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে মাদারীপুর সদর উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের ঘটকচর দত্তের হাট এলাকার সূর্যবান বেগমের। ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে পাড়ি দেওয়া তার ছেলে সাইদুল বেপারী এখন নিখোঁজ। দীর্ঘদিন ধরে তার কোনো সন্ধান না পাওয়ায় উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে পুরো পরিবারের।
সরেজমিন দেখা যায়, সাইদুলের অপেক্ষায় শুধু তার মা নন, পথ চেয়ে আছে স্ত্রী ও দুই শিশুসন্তানও। চার বছরের মেয়ে বাবার সঙ্গে কথা বলার জন্য মায়ের হাতে মুঠোফোন তুলে দেয়। কিন্তু মুঠোফোনের ওপাশ থেকে ভেসে আসে না বাবার কণ্ঠ। আর ১১ মাসের ছেলেটি বুঝতেই পারে না, কেন তার বাবা নেই।
সাইদুলের মা সূর্যবান বেগম বলেন, ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে পরিবারের জমিজমা বিক্রি, ধারদেনা ও সুদের ওপর টাকা নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৩৯ লাখ টাকা দেওয়া হলেও এখনো ছেলের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন ছেলে কোথায় আছে, কেমন আছে, কিছুই জানি না। প্রতিদিন দরজার দিকে তাকিয়ে থাকি। মনে হয়, এই বুঝি আমার ছেলে এসে ডাকবে। আমি আমার ছেলেকে ফিরে পেতে চাই।
কোলে ছোট সন্তানকে নিয়ে স্বামী সাইদুলের ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন স্ত্রী মেরি আক্তার। দুই সন্তানকে কীভাবে বড় করবেন এবং সংসারের খরচ কীভাবে চালাবেন এসব চিন্তায় প্রতিটি দিন তার কাছে দীর্ঘ হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, মেয়েটা প্রতিদিন আব্বুর সঙ্গে কথা বলতে চায়। কিন্তু আব্বু তো আর ফোনের ওপাশে নেই। আমি কীভাবে সন্তানদের মানুষ করব, বুঝতে পারি না।
সাইদুলের ভাই মাহিদুল বেপারীর অভিযোগ করে বলেন, ইতালি নেওয়ার কথা বলে আমার ভাইকে প্রলোভন দেখিয়ে লিবিয়ায় নিয়ে মাফিয়ার কাছে বিক্রি মাদারীপুরে বাবার পথ চেয়ে দুই শিশু করে দেওয়া হয়েছে। আমরা দালালদের বিচার চাই এবং আমার ভাইয়ের সন্ধান চাই।
স্থানীয়রা জানান, সাইদুলদের সহায়-সম্পদ যা ছিল, তার প্রায় সবই বিক্রি করে দালালদের টাকা দিয়েছে। এখন সম্পদও নেই, ছেলেটাও নেই। পুরো পরিবারটি পথে বসেছে। তাদের সহযোগিতা করারও কেউ নেই। তারা সাইদুল কোথায় আছে, কী অবস্থায় আছে তার সন্ধানেরও দাবি জানান।
এদিকে ভুক্তভোগীর পরিবারের অভিযোগ, ঘটকচর এলাকার মৃত বাদশা ফরাজির ছেলে আনোয়ার ফরাজী ২৩ লাখ টাকার চুক্তিতে সাইদুলকে ইতালি পাঠানোর প্রলোভন দেখান। চুক্তি অনুযায়ী ২০২৫ সালের ৬ মে অগ্রিম ১২ লাখ টাকা নেওয়া হয়। পরে একই বছরের ৯ জুন শ্রীলঙ্কা ও দুবাই হয়ে ইতালির উদ্দেশে সাইদুলকে নেওয়া হলেও পরিবারের অভিযোগ তাকে লিবিয়ায় পাঠানো হয়েছে।
স্বজনদের দাবি, লিবিয়ায় নেওয়ার পর সাইদুলকে স্থানীয় একটি চক্রের কাছে জিম্মি করা হয়। পরে তাকে নির্যাতনের ভয় দেখিয়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্টসহ বিভিন্ন মাধ্যমে পরিবারের থেকে ধাপে ধাপে প্রায় ৩৯ লাখ টাকা নেওয়া হয়। তারা বলেন, কিন্তু গত দুই মাস ধরে সাইদুলের সঙ্গে পরিবারের কোনো যোগাযোগ নেই।
স্থানীয়ভাবে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করেও কোনো ফল না পাওয়ায় গত ১১ সেপ্টেম্বর সাইদুলের বড় ভাই সামাদ হোসেন বাদী হয়ে সাতজনের বিরুদ্ধে মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান অপরাধ প্রতিরোধ ও দমন ট্রাইব্যুনাল, মাদারীপুরে মামলা করেন।
তবে টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত আনোয়ার হোসেন ওরফে আনু। তিনি বলেন, আমি তাদের থেকে কোনো টাকা-পয়সা নেইনি।
এ বিষয়ে মাদারীপুর সদর থানার ওসি আবুল কালাম আজাদ বলেন, সাইদুল নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় তার পরিবার আদালতে মামলা করেছে বলে জেনেছি। আদালতের নির্দেশনা থানায় পৌঁছালে বিষয়টি নিয়মিত মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হবে এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিখোঁজ সাইদুল কোথায়-কেমন আছেন, তা দ্রুত নিশ্চিত করা এবং তাকে দেশে ফিরিয়ে আনাই পরিবারের দাবি। একই সঙ্গে তারা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।