বৈপরীত্যের নীরব কবিতা

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:০৩ এএম

‘ইট ওয়াজ দ্য বেস্ট অব টাইমস, ইট ওয়াজ দ্য ওয়ার্স্ট অব টাইম..., ইট ওয়াজ দ্য সেশন অব লাইট, ইট ওয়াজ দ্য সেশন অব ডার্কনেস, ইট ওয়াজ দ্য স্প্রিং অব হোপ, ইট ওয়াজ দ্য উইন্টার অব ডিসপেয়ার...’। আলো ও অন্ধকার, আশা ও হতাশার কী অদ্ভুত সহাবস্থান একই সময়ের ভেতর। কেউ কাউকে মুছে দেয় না; বরং একে অন্যকে করে তোলে আরও স্পষ্ট, আরও অর্থবহ। হ্যাঁ, বৈপরীত্বের এমন এক ঘোর দিয়েই শুরু চার্লস ডিকেন্সের বিখ্যাত উপন্যাস ‘এ টেল অব টু সিটিজ’। আলোকচিত্রও কখনো কখনো এমনই দুটি ভিন্ন বাস্তবতা একই ফ্রেমে এসে খুলে দেয় তৃতীয় কোনো অর্থের দুয়ার।’

যে নান্দনিক বিন্যাস দুটি বিপরীত উপাদানকে পাশাপাশি বসিয়ে পরস্পরের অর্থকে গভীর করে তোলে, আলোকচিত্রের ভাষায় সেটাই জাক্সটাপজিশন। বার্ধক্য ও শৈশব, প্রকৃতি ও নগরায়ণ, ঐশ্বর্য ও দারিদ্র্য, আলো ও ছায়া বৈপরীত্যের ক্ষেত্র হতে পারে অসংখ্য। কিন্তু শুধু দুটি ভিন্ন বিষয়কে একই ফ্রেমে আনলেই এই নান্দনিকতা সম্পূর্ণ হয় না। প্রয়োজন এমন এক অদৃশ্য সম্পর্ক, যা দর্শকের চোখকে প্রথমে থামায়, তারপর ধীরে ধীরে তাকে নিয়ে যায় ভাবনার গভীরে।

২০১৯ সালের দিকে ঢাকার দেয়ালে দেয়ালে পরিচিত হয়ে উঠেছিল একটি বিজ্ঞাপনচিত্র বিশাল একজোড়া ডানা, সঙ্গে লেখা ‘ডরহমংমনের পাংখা খোল’। ফটোগ্রাফারদের কাছে সেই দেয়াল ছিল এক আকর্ষণীয় পটভূমি। ডানার মাঝখানে কাউকে এনে দাঁড় করালেই যেন তৈরি হতো এক মায়ার মুহূর্ত। সেদিন বিকেলে আমিও এমন একটি মুহূর্তের অপেক্ষায় ক্যামেরা হাতে দাঁড়িয়েছিলাম বাসার কাছেই সদ্য আঁকা এক ‘মনের পাখা’র সামনে।

কিছুক্ষণ পর প্রত্যাশার চেয়েও বড় একটি সম্ভাবনা এসে দাঁড়াল ফ্রেমে। একজন মানুষ একটি ক্রাচে ভর করে ডান দিক থেকে বাম দিকে এগিয়ে আসছিলেন। তার শরীর যেন ধীরে ধীরে ডানার সঙ্গে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু উত্তেজনায় ঠিক সময়ে শাটার চাপতে পারলাম না। মুহূর্তটি ফসকে গেল চোখের সামনে দিয়ে। কন্টিনিউয়াস শাটার মোডে ক্যামেরা না রাখার আফসোস যখন তীব্র, তখনই খেয়াল করলাম, তিনি একই পথে ফিরে আসছেন। এবার আর ভুল করার সুযোগ নেই। ক্যামেরা প্রস্তুত, ফ্রেম প্রস্তুত, চোখ ভিউফাইন্ডারে। মানুষটি কাক্সিক্ষত জায়গায় এসে পৌঁছামাত্রই শাটারও তার উত্তর দিয়ে দিল। ছবিটিতে প্রথমে চোখে পড়ে ডানাগুলো। বিশাল, বিস্তৃত যেন আকাশেরই কোনো অংশ এসে নেমেছে দেয়ালে। মানুষটির শরীরের সঙ্গে সেগুলোর এমন এক মায়াবী মিলন ঘটেছে যে, এক নিমেষের জন্য মনে হয় ডানাগুলো যেন তারই। তিনি বুঝি এইমাত্র মাটি ছেড়ে উড়ে যাবেন।

তারপর চোখ একটু নিচে নামে।

ক্রাচ।

ভেঙে যায় মুহূর্তেও মায়া। আর ঠিক তখনই ছবিটি বলতে শুরু করে তার আসল গল্প। ডানা সেখানে শুধু উড্ডয়নের প্রতীক নয়, ক্রাচও নয় শুধু চলার অবলম্বন। দুটো একসঙ্গে এসে দাঁড়ায় স্বপ্ন ও বাস্তবতার দুই প্রান্তে। একদিকে আকাশে উড়ে যাওয়ার আকাক্সক্ষা, অন্যদিকে মাটিকে আঁকড়ে এগিয়ে চলার সংগ্রাম। দেয়ালে ডানা স্থির, অথচ তার নিচে জীবন চলমান স্থিতি আর গতিরও যেন এক নীরব সংলাপ। এক ফ্রেমে এসে মিলে যায় একঝাঁক বিপরীত সত্য।

এমন দৃশ্য খুঁজে পেতে শুধু ক্যামেরা হাতে রাস্তায় বেরিয়ে পড়াই যথেষ্ট নয়। ছবির আগে প্রয়োজন চোখের প্রস্তুতি একটি দেয়াল, একটি ছায়া, একটি পোস্টার, কিংবা কোনো স্থির পটভূমির মধ্যে কোথায় লুকিয়ে আছে বৈপরীত্বের আরেকটি গল্প, তা দেখতে পাওয়া। ক্যামেরা প্রস্তুত থাকতে পারে, কম্পোজিশন আর আলোর হিসেবও মিলিয়ে নেওয়া যায়; কিন্তু গল্পটি কখন ফ্রেমে এসে দাঁড়াবে, তার জন্য আলোকচিত্রীকে অপেক্ষা করতেই হয়। কখনো সেই অপেক্ষা কয়েক মুহূর্তের, কখনো বা দীর্ঘ। আর সেই অপেক্ষার ভেতরেই ধীরে ধীরে চোখ চিনতে শেখে সম্ভাবনার মুহূর্ত।

জাক্সটাপজিশন তাই শুধু ছবির বিন্যাস নয়, জীবনকে দেখারও এক দৃষ্টিভঙ্গি। মানুষের ভেতরে যেমন আলো থাকে, তেমনি থাকে অন্ধকার; সাহসের পাশে থাকে ভয়, সাফল্যের পাশে ব্যর্থতা, আকাক্সক্ষার পাশে সীমাবদ্ধতা। জীবনের সৌন্দর্য যেমন মানুষের গুণে, তেমনি তার অসম্পূর্ণতার মধ্যেও। ডানা ও ক্রাচের মতো আমাদের স্বপ্ন আর বাস্তবতা পরস্পরের বিপরীত হয়েও একে অন্যকে অস্বীকার করে না। মানুষ উড়তে চায় বলেই তার সীমাবদ্ধতা মুছে যায় না; আবার সীমাবদ্ধতা থাকলেই উধাও হয়ে যায় না তার আকাশ। তাদের সংঘাতে নয়, বরং সহাবস্থানেই জীবনের পূর্ণতা।

ফটোগ্রাফির সৌন্দর্যও হয়তো সেখানেই চেনা কোনো দৃশ্যের মধ্যে এমন দুটি বিপরীত সত্যকে পাশাপাশি আবিষ্কার করা, যাদের একসঙ্গে দেখার পর পৃথিবী আর ঠিক আগের চোখে ধরা দেয় না।

ডানাগুলো দেয়ালেই থেকে যায়।

ক্রাচটিও মাটিতে।

শুধু মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি নীরবে বলে যান উড়ে যাওয়ার স্বপ্ন আর মাটির বাস্তবতা, দুটিকে নিয়েই মানুষের জীবন। আর কখনো কখনো সেই নীরব বৈপরীত্যের মধ্যেই জন্ম নেয় একটি ছবিএকটি কবিতাএকটি গল্প।

লেখক : আলোকচিত্রী ও ব্যাংক কর্মকর্তা

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত