পাহাড়-ঝরনা-সাগরে পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা মিরসরাইয়ে

আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:০০ পিএম

চট্টগ্রামের মিরসরাই ভৌগোলিক বৈচিত্র্য, পাহাড়, ঝরনা, বন, সাগর ও জলাশয়ের অপূর্ব সমন্বয়ে দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় পর্যটন উপজেলা। আজ বিশ্ব পর্যটন দিবসে নতুন করে আলোচনায় এসেছে মিরসরাইয়ের পর্যটন সম্ভাবনা। একদিকে পাহাড়ি ঝরনার স্বচ্ছ জলধারা, অন্যদিকে সাগরের বিস্তীর্ণ উপকূল, জলাভূমি ও সবুজ প্রকৃতি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিকল্পিত বিনোদনকেন্দ্র ও প্রকৃতিনির্ভর পর্যটনস্থল। সব মিলিয়ে মিরসরাই এখন শুধু চট্টগ্রাম নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছেও আকর্ষণের একটি নাম।

মিরসরাইয়ের পর্যটন বলতেই প্রথম সারিতে আসে মহামায়া ইকো পার্ক। পাহাড়, লেক, ঝরনা ও সবুজ বনভূমির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই পর্যটনকেন্দ্র প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই জনপ্রিয়। বিশেষ করে ছুটির দিন ও বিভিন্ন উৎসবের সময় পরিবার, বন্ধু ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে মহামায়া। লেকের নীল জল, পাহাড়ের সবুজ আর নিরিবিলি পরিবেশ দর্শনার্থীদের প্রকৃতির কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ করে দেয়।

দেশজুড়ে মিরসরাইয়ের পর্যটন পরিচিতিকে আরও বিস্তৃত করেছে খৈয়াছড়া ঝরনা। পাহাড়ি পথ পেরিয়ে ঝরনার কাছে পৌঁছানোর রোমাঞ্চ এবং কয়েক ধাপের ঝরনা থেকে নেমে আসা পানির দৃশ্য পর্যটকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। তরুণদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছেও খৈয়াছড়া এখন একটি পরিচিত গন্তব্য। একইভাবে রূপসী ঝরনা ও নাপিত্তাছড়া ঝরনাও মিরসরাইয়ের পাহাড়ি পর্যটনকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। এসব ঝরনাকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে গড়ে উঠেছে গাইড, পরিবহন, খাবার ও অন্যান্য সেবার ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের আয়ের সুযোগও তৈরি হয়েছে।

খৈয়াছড়া ঝরনা, ছবি: প্রতিনিধি

মিরসরাইয়ের পর্যটনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে উপকূলীয় অঞ্চল। মুহুরী প্রজেক্টের বিস্তীর্ণ জলরাশি, নদী ও সবুজ প্রকৃতি দীর্ঘদিন ধরেই দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে আসছে। এর পাশাপাশি সাগরপাড়ে গড়ে ওঠা কয়েকটি নতুন সি বিচ পয়েন্ট মিরসরাইয়ের পর্যটন মানচিত্রকে আরও বিস্তৃত করেছে। এসব স্থানে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখা, সমুদ্রের ঢেউ উপভোগ করা কিংবা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সময় কাটানোর জন্য প্রতিদিনই মানুষের আগ্রহ বাড়ছে।

প্রকৃতির পাশাপাশি মিরসরাইয়ে আধুনিক বিনোদনকেন্দ্রও পর্যটনের নতুন মাত্রা যোগ করেছে। প্রকৃতিপ্রেমী ও নিরিবিলি পরিবেশে সময় কাটাতে আগ্রহী মানুষের কাছে প্রজেক্ট সোনাপাহাড় ইতোমধ্যে আকর্ষণীয় একটি স্থান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। পাহাড় ও প্রকৃতির সৌন্দর্যের সঙ্গে পরিকল্পিত পরিবেশের সমন্বয় এই স্থানকে ভিন্ন ধরনের দর্শনার্থীদের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছে।

অন্যদিকে শিশু ও তরুণদের বিনোদনের কথা মাথায় রেখে গড়ে উঠেছে আরশিনগর ফিউচার পার্ক। বিভিন্ন বিনোদন উপকরণ ও খোলামেলা পরিবেশের কারণে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা মানুষের কাছে এটি একটি উল্লেখযোগ্য গন্তব্য হয়ে উঠছে। ফলে মিরসরাইয়ের পর্যটন এখন শুধু পাহাড় ও ঝরনাকেন্দ্রিক নয়, বরং প্রকৃতি, সমুদ্র, জলাশয় এবং আধুনিক বিনোদনকেন্দ্রকে ঘিরে বহুমাত্রিক রূপ পেয়েছে।

পর্যটনখাত সংশ্লিষ্টদের মতে, মিরসরাইয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো একই উপজেলায় এত বৈচিত্র্যময় পর্যটন উপাদানের উপস্থিতি। পাহাড়ি ঝরনা দেখতে আসা পর্যটক একই ভ্রমণে সমুদ্রসৈকত, মহামায়া কিংবা অন্যান্য বিনোদনকেন্দ্র ঘুরে দেখার সুযোগ পান। ফলে মিরসরাইকে কেন্দ্র করে এক দিনের পরিবর্তে দুই বা তিন দিনের পর্যটন পরিকল্পনাও করা সম্ভব। প্রয়োজন শুধু এসব স্থানকে সমন্বিত পর্যটন পরিকল্পনার আওতায় আনা।

মিরসরাইয়ের পর্যটন সম্ভাবনার সঙ্গে স্থানীয় অর্থনীতির সম্পর্কও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। পর্যটকদের যাতায়াতকে কেন্দ্র করে পরিবহন, হোটেল, রেস্তোরাঁ, চা ও খাবারের দোকান, স্থানীয় পণ্য বিক্রি, গাইড সেবা এবং বিভিন্ন ধরনের ক্ষুদ্র ব্যবসার প্রসার ঘটছে। পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে এসব খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়ে। অর্থাৎ পাহাড়ের ঝরনা কিংবা সাগরের ঢেউ শুধু দর্শনার্থীদের বিনোদন দিচ্ছে না, এর সঙ্গে স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও আয়ও যুক্ত হচ্ছে।

সোশ্যাল অ্যাক্টিভিস্ট ও প্রাণ-প্রকৃতি বিষয়ক লেখক মঈনুল হোসেন টিপু বলেন, মিরসরাই পর্যটনের জন্য অপার সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। মিরসরাইয়ের পর্যটন খাতকে আরও সমৃদ্ধ করতে প্রশাসনিকভাবে এর ব্র্যান্ডিং জরুরি। পাশাপাশি পর্যটনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ইকো ট্যুরিজম বাস্তবায়নও সময়ের দাবি। পর্যটন ব্যবসার সাথে জড়িতদেরও পর্যটকদের স্বার্থরক্ষায় ভূমিকা রাখতে হবে। পাশাপাশি ভালো আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে ২-৪ দিনের ট্যুর প্ল্যানও পর্যটকরা করতে পারবেন।

তিনি আরও বলেন, পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করা গেলে মিরসরাই ভবিষ্যতে চট্টগ্রামের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্রের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে।

এ বিষয়ে মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সোমাইয়া আক্তার বলেন, মিরসরাইয়ের পর্যটনখাত প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ হচ্ছে। স্থানীয়রা ও উদ্যোক্তাদের সাথে নিয়ে পর্যটকদের নিরাপত্তা জোরদারে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। অনেকে পর্যটনকে কেন্দ্র করে নতুন নতুন ব্যবসা ও কাজের সাথে যুক্ত হচ্ছেন, এটাকে আমরা সাধুবাদ জানাই। বিভিন্ন ঝরনার ইজারাদার ও পর্যটনখাত সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদেরও পর্যটকবান্ধব হতে হবে। পাশাপাশি আবাসনের ক্ষেত্রে ব্যক্তি উদ্যোগে উদ্যোক্তারা এগিয়ে এলে এ খাতটি আরও সমৃদ্ধ হবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত