উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান সংঘাত আট মাসে পড়লেও, তা বন্ধের দৃশ্যমান কোনো লক্ষণ নেই। এই অচলাবস্থা থেকে উত্তরণে ইরানের দেওয়া সর্বশেষ প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রত্যাখ্যান করায় সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। তেহরান জানিয়েছে ওয়াশিংটনের প্রতি গভীর অনাস্থা থাকলেও, তারা কূটনীতির দরজা উন্মুক্ত রেখেছে। তবে একইসঙ্গে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, তাদের ভূখ-ে নতুন করে কোনো সামরিক হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ধ্বংসাত্মক যুদ্ধে যেতে প্রস্তুত ইরান। গত রবিবার যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম এনবিসি-র ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই হুঁশিয়ারি দেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তিনি বলেন, ‘আমরা কূটনীতির জন্য প্রস্তুত। আবার একই সঙ্গে আমরা যুদ্ধের জন্যও প্রস্তুত।’
ইরানে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যৌথ হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল।
তেহরান এর পাল্টা পদক্ষেপ নিলে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে যুদ্ধের দামামা। এর পর থেকে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের দফায় দফায় যুদ্ধ চলছে। সংকটের জেরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি পণ্যের দাম বেড়েছে; মূল্যস্ফীতি আরও বেড়েছে। আরাগচি বলেন, ‘আপনি যদি আমাদের জিজ্ঞাসা করেন, তাহলে কূটনীতিতে ফেরার কোনো কারণ নেই। এরপরও আমি কূটনীতির চেষ্টা চালাব। কারণ, শান্তির কোনো সুযোগ আমাদের হাতছাড়া করা উচিত নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যেমন আলোচনা করতে প্রস্তুত, তেমনি যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্যও প্রস্তুত। যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আমরা দৃঢ় থাকব। এমনকি সেই সংঘাত যদি দুনিয়া ধ্বংস হয়ে যাওয়ার মতো যুদ্ধেও গড়ায়।’
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা নিয়ে গভীর অনাস্থা প্রকাশ করেন ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি অভিযোগ করেন, ২০২৫ এবং ২০২৬ সালে আলোচনা চলাকালেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালিয়েছিল এবং চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই তা লঙ্ঘন করেছে। ট্রাম্পকে বিশ্বাস করেন কি না এমন সরাসরি প্রশ্নের জবাবে আরাগচি বলেন, ‘আমরা কেবল নিজেদের ওপর বিশ্বাস রাখি।’ যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য নতুন হামলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগের লড়াইগুলো থেকে ইরান শিক্ষা নিয়েছে এবং নিজেদের সামরিক কৌশল পুরোপুরি বদলে ফেলেছে। তিনি উল্লেখ করেন, নতুন সামরিক হামলা নাকি আলোচনাসেই সিদ্ধান্ত এখন পুরোপুরি ট্রাম্পের ওপর নির্ভর করছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি, তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেবল চিকিৎসা এবং অন্যান্য ‘শান্তিপূর্ণ’ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। এমনকি ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা পারমাণবিক জ্বালানি নিয়ে আলোচনা করতেও তেহরান প্রস্তুত। আস্থা তৈরির স্বার্থেই প্রাথমিক সাত দিনের প্রস্তাব থেকে পারমাণবিক বিষয়টি আলাদা রেখে পরবর্তী ধাপের জন্য রাখা হয়েছে বলে তিনি ব্যাখ্যা দেন।
হরমুজে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন জব্দ : কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সাবমেরিন ড্রোন জব্দ করেছে ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর অভিজাত শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। গত রবিবার এক বিবৃতিতে আইআরজিসির নৌবাহিনী বলেছে, গোয়েন্দা নজরদারি ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধের সমন্বয়ে পরিচালিত একটি জটিল ও সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের সামরিক বাহিনীর মালিকানাধীন একটি উন্নতমানের চালকবিহীন পানির নিচের যান (ইউইউভি) সফলভাবে আটক করা হয়েছে। আইআরজিসি জানিয়েছে, ড্রোনটির মডেল হলো রেমাস৬০০ অটোমেটেড আন্ডারওয়ার ভেহিকল। গোয়েন্দাগিরির উদ্দেশ্যে এটি হরমুজ প্রণালিতে সক্রিয় ছিল। যানটি এখন বাহিনীর বিশেষজ্ঞদের হাতে রয়েছে এবং এর তথ্য পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে। চলতি মাসের শুরুতেও হরমুজে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সাবমেরিন ড্রোন আটক করেছিল। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, আটক করা যানটি ডাইভএলডি। এটি তৈরি করেছে ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যান্ডুরিল। ১৯ ফুট বা ৫ দশমিক ৮ মিটার দীর্ঘ এই ডুবোযানটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালিত হতে পারে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের বিরুদ্ধে ইরানের হামলায় হতাহতদের তথ্য গোপনের অভিযোগ উঠেছে। তিনটি সূত্রের বরাতে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজ জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে একটি জাহাজে ইরানের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় আটজন মেরিন সেনা আহত হওয়ার তথ্য চেপে গেছে পেন্টাগন।