বাধা পেরিয়ে মাল্টা চাষে সাফল্য

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৯ এএম

নিজের বলতে ছিল কেবল বসতভিটা, ছিল না কোনো চাষযোগ্য জমি। তবুও মাঠের বুকেই নিজের ভাগ্য বদলেছেন পাবনার চাটমোহর উপজেলার ডিবিগ্রাম ইউনিয়নের গৃহবধূ শারমিন খাতুন। লিজ নেওয়া জমিতে বিষমুক্ত মাল্টা চাষ করে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছেন তিনি। পেয়েছেন সফল নারী উদ্যোক্তার সম্মানজনক স্বীকৃতি। উপজেলাজুড়ে এখন তিনি সমাদৃত ‘মাল্টা ভাবি’ নামে। তার বাগানের উৎপাদিত মাল্টা স্বাদ, আকার ও মানে আমদানি করা বিদেশি ফলের সঙ্গে দারুণ প্রতিযোগিতা করছে।

সবুজ রঙের হওয়ায় স্থানীয় বাজারে কিছুটা কম দামে বিক্রি করতে হলেও দমেননি শারমিন। বাজার প্রতিযোগিতায় আরও এগিয়ে থাকতে তিনি নতুন করে এক বিঘা জমিতে অস্ট্রেলীয় হলুদ জাতের মাল্টা চাষ শুরু করেছেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলের এই নারীর ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প এখন স্থানীয়দের মুখে মুখে, যা উদীয়মান তরুণ কৃষি উদ্যোক্তাদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কৃষি উদ্যোক্তা শারমিন খাতুনের যাত্রার শুরু ২০২৩ সালের শেষের দিকে। মহামারী পরবর্তী সময়ে তরুণরা যখন কৃষিমুখী হচ্ছিলেন, তিনিও ব্যতিক্রমী কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন। পাঁচ বছরের জন্য দুই বিঘা জমি ভাড়া নিয়ে গড়ে তোলেন ভিয়েতনামী ও বারি-১ জাতের মাল্টা বাগান। প্রথম দুই বছর সীমিত ফলন পেলেও গত বছর থেকে বাগানে ভালো ফলন আসতে শুরু করে। জমি লিজ ও আনুষঙ্গিক খরচ সামলে প্রথম বছরেই তিনি প্রায় ২ লাখ টাকারও বেশি লাভ করেন। চলতি মৌসুমে প্রতিটি গাছে থোকা থোকা ফল শোভা পাচ্ছে। সব খরচ বাদ দিয়ে এবার অন্তত ৪ লাখ টাকা মুনাফা অর্জনের আশা করছেন তিনি।

বাগানটি রেললাইনের ধারের দুর্গম এলাকায় হলেও যোগাযোগের নানা বাধা পেরিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ভিড় করছেন তার ফলন দেখতে। অনেকে আসছেন পরামর্শ নিতে, শিখছেন চাষের কৌশল ও আয়ের হিসাব।

শারমিন খাতুন জানান, সাধারণত তাদের এলাকায় ধান, সরিষা ও অন্যান্য সবজির বা ফসলের আবাদ হয়ে থাকে। এ ফলের আবাদে তিনিই প্রথম, তাই শুরুতে প্রতিবেশীদের নানামুখী সামাজিক কটু কথা শুনতে হতো। তবে তিনি কখনো লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি। যে অনুর্বর জমিতে প্রচলিত ফসল বুনে আয় করা কঠিন ছিল, সেখান থেকেই এখন তার বার্ষিক আয় লাখ টাকার ওপরে। বাজারে সবুজ মাল্টার চাহিদা কিছুটা কম থাকায় বাণিজ্যিক লাভের পরিধি বাড়াতে এবার নতুনভাবে হলুদ মাল্টা সম্প্রসারণ করেছেন তিনি।

চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া থেকে আসা জামাল ও প্রকাশ চন্দ্র জানান, লোকের মুখে গল্প শুনে বাগান দেখতে ও ফল কিনতে এসেছেন তারা। বাগান ঘুরে দেখে তারা বেশ অনুপ্রাণিত হয়েছেন। তারা জানান, মাঠে কিছু পতিত জমি রয়েছে। লাভজনক মনে হলে তারাও মাল্টা চাষে ঝুঁকবেন বলে জানান।

কামালপুর ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম জানান, শারমিন খাতুনের উদ্যোগে শুরু থেকেই তারা নিয়মিত তদারকি ও বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন। অপর উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সাইদুর রহমান সাঈদ জানান, বিশেষ করে সারা বছর ফলন দেওয়া ভিয়েতনামী জাতটি অত্যন্ত সুস্বাদু ও রসালো হওয়ায় এই অঞ্চলে এর গ্রহণযোগ্যতা দ্রুত বাড়ছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ কুন্তলা জানান, শারমিন খাতুনের মতো প্রত্যয়ী উদ্যোক্তাদের কৃষি বিভাগ থেকে সার্বিক সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় ফল মেলায় তার বাগানের মাল্টা প্রদর্শিত হওয়ার পর এলাকার অনেক কৃষকই উদ্বুদ্ধ হয়ে মাল্টা চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। আগামীতে এই উপজেলায় মাল্টার আবাদ আরও বৃদ্ধি পাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত