কৃষির সুফলের জন্য প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৩১ এএম

খ্যাতনামা বিজ্ঞানী আবেদ চৌধুরী। মাত্র তেইশ বছর বয়সে ৎবপউ নামে জেনেটিক রিকম্বিনেশনের একটি নতুন জিন আবিষ্কার করে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন বিজ্ঞানের জগতে।

পিতৃহীন ধানের বীজ উৎপাদন করে কৃষিতে তিনি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। তার আবিষ্কৃত পঞ্চব্রীহি ধানের জাত এমন একটি সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করেছে, যার মাধ্যমে পৃথিবী চিরদিনের জন্য মুক্ত হতে পারে দুর্ভিক্ষ থেকে। বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রেক্ষাপটে আগামী দিনে বাংলাদেশের কৃষি কেমন হওয়া উচিত, তা জানিয়েছেন ধানতারাকে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এনাম-উজ-জামান

ধানতারা : শৈশব ও বেড়ে ওঠার কোন বিষয়গুলো আপনাকে বিজ্ঞানী হতে অনুপ্রাণিত করেছে?

আবেদ চৌধুরী : আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা গ্রামে। এরপরে ৯ বছর বয়সে আমি একটা ছোট শহরে যাই। ৯ বছর গ্রামে প্রকৃতির সঙ্গে থাকার স্মৃতি আমার মস্তিষ্কের ভেতরে সম্ভবত রয়ে গেছে (এটা আমি এখন চিন্তা করে বের করেছি)। প্রকৃতি নিয়ে চিন্তা যে কারণে আমার মাথা থেকে যাচ্ছে না। একই কারণে হয়তো ফসল, ধান নিয়ে আমার ধারাবাহিক কাজ করার ইচ্ছা রয়েছে এবং এটা নিয়ে লেগে থাকার একটা ধৈর্যও রয়েছে। কৃষিকে হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করা এটা আমার শৈশব জীবনের কারণে হয়েছে।

ধানতারা : পঞ্চব্রীহি ধান উদ্ভাবনের পেছনের গল্পটি জানতে চাই।

আবেদ চৌধুরী : এটিও চারপাশের জীবন ও পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত। ধানের চাষ দেখে আমার মনে হয়েছিল, ধান কেন বারবার লাগাতে হবে? যেভাবে আম কাঁঠাল লিচু প্রত্যেক বছর ফসল দেয় সেভাবে কেন ধানও আমরা পাব না? এই চিন্তাটা, স্বয়ংক্রিয়ভাবে এসেছিল, যেভাবে একটা কবিতা আসে। পরে জেনেছি চাইনিজদের একটা পদ্ধতি আছে, রাটুন নামে। কিন্তু পঞ্চব্রীহির যেটা ইউনিকনেস তা হলো, এটা বারবার হয়।

ধানতারা : পঞ্চব্রীহি ধান প্রচলিত ধানের তুলনায় কী কী বিশেষ সুবিধা দেয়?

আবেদ চৌধুরী : পঞ্চব্রীহি ধানের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটা বোরো ধান দেয়, তারপর আউশ ধান দেয়। কিন্তু প্রচলিত প্রক্রিয়ায় ধান চাষ করতে গেলে জমি চাষ ও অন্যান্য প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার অনেক খরচ আছে। কিন্তু এখন আমার মাঠে যে ধান আছে, সেটা একটা বোরো দিয়েছে, দুইটা আউশ দিয়েছে। প্রতি হেক্টরে আট টন বোরো দিয়েছে, পরে ছয় টন আউশ দিয়েছে, পরে আবার পাঁচ টন আউশ দিয়েছে। উনিশ টন খাদ্য শস্য দিয়ে দিয়েছে ইতিমধ্যে। সাধারণ ধানগাছ থেকে সারা বছরেও উনিশ টন পাওয়া যায় না। কিন্তু আমার মাঠে এটা হচ্ছে। এটাই তো এই ধানের সবচেয়ে বড় সুবিধা। আরেকটা বড় সুবিধা হলো, দ্বিতীয় ও তৃতীয় উৎপাদনের সময় খুবই অল্প পরিমাণ সার লাগে। এ ছাড়া, এই চাষে আমরা রাসায়নিক সার ব্যবহার করি না। জৈব সার ব্যবহার করি। ফলে পরিবেশের ক্ষতি হয় না। অর্থ সাশ্রয় হয়। পঞ্চব্রীহির আরেকটা বৈশিষ্ট্য হলো, এটা শেকড়কে অনেক বড় করে দেয়। যার ফলে অনেক কার্বন ডাইঅক্সাইড বাইরের পরিবেশ থেকে মাটিতে চলে যায়। পঞ্চব্রীহি ধান বেশি ধান তো দিচ্ছেই, তাছাড়াও এটা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের বিপরীতে কাজ করছে।

ধানতারা : ভবিষ্যতের জন্য কী ধরনের ধানের জাত সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হবে?

আবেদ চৌধুরী : ভবিষ্যতে সে ধরনের ধানের জাত বেশি প্রয়োজন হবে যেটি খরাসহিষ্ণু বা তাপমাত্রাসহিষ্ণু, যেটি লবণাক্ততাসহিষ্ণু। এই সমস্ত কাজে আমি এখন নিয়োজিত আছি। আরেকটা ব্যাপার হলো, আমাদের বিদ্যুৎ বা জ্বালানি একটা বড় সমস্যা। ওপরে সোলার প্যানেল আর নিচে ধান, মানে ছায়ার নিচে ধান হবে এমন একটি জাত তৈরি করেছি। যার নাম আমি দিয়েছি ছায়াব্রীহি। সেটার ট্রায়াল দিচ্ছি। বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে আমাদের অধিকাংশ জমি পানির নিচে চলে যেতে পারে। সেজন্য আমাদের দরকার বন্যাসহিষ্ণু ধান বা পানিসহিষ্ণু ধান। গভীর পানির ধান আগে আমাদের দেশে ছিল। সেটা ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করতে হবে। সে কাজটা অবশ্য আমি করছি না। হয়তো অন্যরা করবে। এটার জন্য অনেক ইনভেস্টমেন্ট দরকার। তাপমাত্রাসহিষ্ণু, খরাসহিষ্ণু, বন্যাসহিষ্ণু এবং লবণাক্ততাসহিষ্ণু ধান উৎপাদনের চেষ্টা করতে হবে আমাদের।

ধানতারা : আগামী ২০-৩০ বছরে বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ কী হতে পারে?

আবেদ চৌধুরী : খাদ্য নিরাপত্তা বাড়াতে প্রথমে উৎপাদন বাড়াতে হবে। হেক্টরপ্রতি ধানের উৎপাদনের পরিমাণ বাড়াতে হবে। যদি অল্প জায়গায় অধিক শস্য ফলানো যায় তাহলে কৃষিজমির অবমুক্তি ঘটবে। আমাদের গড় উৎপাদন চার টন, এটা আট টন হতে পারে। তাহলে অর্ধেক জমিকে আমরা মুক্ত করতে পারি। ধানের উৎপাদন বৃদ্ধি নিয়ে গবেষণায় সরকারের আরও অর্থ দেওয়া উচিত। দ্বিতীয়ত, খরা, বন্যা সহনশীল ধানের উৎপাদনের দিকে আমাদের যাওয়া উচিত। আরেকটা কাজ করা উচিত, যেটা আমি ভিয়েতনামে দেখলাম, একটা গ্রামে একটা মাঠ। মাঠটি সমবায়ের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে। যার যতটুকু জমি সে সে-ই অনুপাতে ফসল পেয়ে যাচ্ছে। জমির চাষ করছে একটি প্রতিষ্ঠান, দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে তাদের বাছাই করা হচ্ছে। আর আমাদের এখানে টুকরো টুকরো জমি। একেকজন একেক জাতের ফসল লাগাচ্ছে, এতে ভালো সুফল পাওয়া যায় না। আমরা যদি তেমনভাবে সম্মতির ভিত্তিতে কৃষিজমি একত্র করে চরম আধুনিক উপায়ে কৃষিকাজ করি তাহলে সুফল পাব। এর জন্য প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য। আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা আমাদের অনৈক্য। আমাদের উচিত সবাই মিলে ঠিক করা, আমরা কোন দিকে যাব সে লক্ষ্য ঠিক করা। তাহলে এইসব বড় কাজগুলো আমরা করতে পারব।

ধানতারা : বাংলাদেশের কৃষির সবচেয়ে বড় শক্তি এবং সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?

আবেদ চৌধুরী : সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, আমাদের এখনো কৃষিজমি রয়েছে। সঙ্গে আমাদের আবহাওয়া সবকিছু মিলিয়ে ধানের একটা অভ্যুদয় হয়েছিল।

কৃষিকে একটা উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার একটা শক্তি আমাদের রয়েছে। এটা আমাদের বড় শক্তি। এই শক্তিকে কাজে না লাগানোর যে প্রবণতা বা অক্ষমতা সেটা হলো আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা বা চ্যালেঞ্জ। আমাদের আনকাট ডায়মন্ড রয়েছে কিন্তু সেগুলো পরিশীলিত করে, সুন্দর করে মূল্যবান মণিমুক্তায় পরিণত করব, ধনী হয়ে উঠব সেটা পারছি না। আমি ভিয়েতনামে দেখলাম, তারা কাঁঠালের প্রতিটি অংশ থেকে প্রোডাক্ট বানিয়ে ইউরোপে রপ্তানি করছে। আর আমাদের কাঁঠালগুলো পচে যায়। আমাদের রিসোর্সগুলো ব্যবহার করছি না। আমরা শুধু নিজেদের মধ্যে কলহে জড়িয়ে আছি। এখন তো গ্রামগুলো উপশহরে পরিণত করা হচ্ছে। কৃষিজমি হারিয়ে যাচ্ছে। কৃষিজমি হারিয়ে যাওয়া হলো আমাদের পরিবেশের জন্য সবচেয়ে বড় বিপর্যয়।

কৃষিজমি যদি হারিয়ে যায় তাহলে এই ধান-চাল কে আমাদের দেবে, এখন চাল পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু এমন একটা সময় আসবে যখন কেউ চাল দেবে না। এখন যারা দিচ্ছে তাদেরই হয়তো থাকবে না। তারা দেবে কীভাবে? এই যে কৃষিজমি অবলীলায় নষ্ট হচ্ছে এগুলোর দিকে তো কেউ তাকাচ্ছে না। অথচ যদি আমরা কৃষি শক্তিশালী করতে পারি, একটা উপজেলায় উৎপাদিত ধান দিয়ে সিঙ্গাপুর ও ব্রুনাই উভয়কেই খাওয়াতে পারব। ধান রপ্তানি করেই আমাদের অর্থনীতি শক্তিশালী হয়ে যাবে। কিন্তু আমরা করছি না। আমাদের স্পর্ধা ও স্বপ্নের অভাব রয়েছে। সারা পৃথিবীর মানুষের এই দেশে আসার কথা ধান সম্পর্কে শিখতে। এই দেশে ধানের অভ্যুদয় হয়েছিল। সুরমা, কুশিয়ারা অববাহিকায় ধানের অভ্যুদয় হয়েছিল।

ধানতারা : গবেষকের কোন দক্ষতাগুলো সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন?

আবেদ চৌধুরী : একজন গবেষককে বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, গ্রন্থগত শিক্ষা নয়, প্রকৃত শিক্ষার জন্য চরম আগ্রহ গবেষকের থাকতে হবে। সেই আগ্রহটা ধৈর্যের সঙ্গে লালন করার জন্য সহনশীলতা থাকতে হবে। এক বছর, ছয় মাসে কোনো শিক্ষা হয় না। আমরা তিন বছরে ডিগ্রি ধরিয়ে দিই। তিন বছরে শিক্ষা হয় না। ত্রিশ বছরে শিক্ষা হয়। বড় বড় ডিসকভারির দিকে আমরা দেখি দশ বছর, বিশ বছর কিংবা তারও বেশি সময় লেগেছে। সেটার জন্য তো ধৈর্য লাগবে। প্রতিদিন সকালে উঠে কাজ করতে ইচ্ছে করবে এমন মনোভাব লাগবে। একটা দীর্ঘপথ যাওয়ার সাধনা করতে হবে।

ধানতারা : আগামী ১০ বছরে বাংলাদেশের কৃষিকে আপনি কোথায় দেখতে চান?

আবেদ চৌধুরী : আমি নিজে খুব অপটিমিস্টিক মানুষ। আমি আশা রাখি যে, দেখব, বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। সামাজিক, রাজনৈতিক সমস্যাগুলো সমাধান করেছে। ভিয়েতনাম তো দীর্ঘ যুদ্ধ করেছে। সারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যে বোমা ফেলেনি তার তিনগুণ বোমা ফেলেছিল ভিয়েতনামে। তারপরেও তো ভিয়েতনাম ধ্বংস হয়নি। তারা ঘুরে দাঁড়াল। সেটা দেখে আমি অনুপ্রেরণা পেয়েছি। আমি চাইব আমরা যেন ভিয়েতনামের মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি। এটার জন্য আমার পক্ষ থেকে যা করা দরকার তা আমি করব।

ধানতারা : কোন আবিষ্কার বা গবেষণা নিয়ে আপনার সবচেয়ে গর্ব বোধ করেন?

আবেদ চৌধুরী : আমার প্রথম আবিষ্কার হলো ৎবপউ। তেইশ চব্বিশ বছর বয়সে আবিষ্কার করেছিলাম। গর্বিত সেটা বলব না, আমি বলব, এটা স্মরণ করে আমি আনন্দ পাচ্ছি। তারপরে- পিতৃহীন বীজ। তারপর আমি প্রাতিষ্ঠানিক বিজ্ঞান ছেড়ে গ্রামে এসে যে বিজ্ঞান শুরু করলাম, সে বিজ্ঞান আমাকে দিল পঞ্চব্রীহি, ক্লাইমেট মিটিগেশন টেকনোলজি দিল, আর শেষে পেলাম ছায়াব্রীহি। এগুলো আমার আনন্দের কারণ। এগুলো আমি আরও এগিয়ে নিতে পারব এমন একটা আশাবাদই আমার চালিকাশক্তি।

ধানতারা : একজন বিজ্ঞানী হিসেবে আপনার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত কোনটি?

আবেদ চৌধুরী : সবচেয়ে স্মরণীয় মূহূর্ত হলো, পঞ্চব্রীহির আবিষ্কার, এর থেকে ভালো আর কী হতে পারে? বিশ হাজার বছর আগে থেকে মানুষ ধান চাষ করছে। কিন্তু একটা গাছ পাঁচবার ফসল দেয় এমন তো কেউ দেখেনি। এটা আমার জন্য ভীষণ আনন্দময় একটা কাজ।

ধানতারা : আগামী প্রজন্মের জন্য আপনার বার্তা কী?

আবেদ চৌধুরী : সবাই নিজের মতো করে একটা পথ খুঁজে নেবে। রাস্তাই আপনাকে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যাবে। সলিল চৌধুরী লিখেছেন, ‘পথে এবার নামো সাথী, পথেই হবে পথ চেনা।’ পথই পথ ঠিক করে দেয়। আরেকজন লিখেছেন, ‘আই টুক দ্য রোড লেস ট্রাভেল্ড বাই আন্ড দ্যাট মেড অল দ্য ডিফরেন্স।’ যে পথে কম লোক যায় আমি সে পথটা বেছে নিয়েছিলাম আর সে কারণেই আমি সার্থক। সে জন্য আমি বলতে চাই, নিজের মতো নিজের পথ খুঁজে নিন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত