সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগের চূড়ান্ত তালিকায় পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার সুমাইয়া আক্তার ও জাহিদ হাসানের নাম প্রকাশিত হয়েছে। পুলিশ ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) ভেরিফিকেশনে বাদ পড়ার পর তারা নিয়োগ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ছিলেন।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) পিরোজপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তালিকায় নিজেদের নাম দেখতে পান তারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায়, সুমাইয়া গর্ভকালীন সময়েও পড়াশোনা চালিয়ে যান এবং নবজাতক সন্তানকে রেখে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেন।
এদিকে ভেরিফিকেশনে বাদ পড়ার বিষয়টি নিয়ে শনিবার ও রবিবার দেশের কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরপর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
মঠবাড়িয়া উপজেলার মিরুখালী ইউনিয়নের বাসিন্দা সুমাইয়া সাফা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং পিরোজপুর মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে পিরোজপুর সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজের গণিত বিভাগে ভর্তি হন। পরে ওই বিভাগ থেকে প্রথম স্থান অধিকার করে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
সুমাইয়ার অভিযোগ ছিল, পুলিশ ও এনএসআইয়ের ভেরিফিকেশনে তাকে অযৌক্তিকভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। এদিকে তিনি দাবি করেন তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। এমনকি ভেরিফিকেশনের বিষয়টি পুনরায় যাচাই করে নিয়োগ দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদনও করেছিলেন তিনি।
নিয়োগের তালিকায় নাম প্রকাশের পর সুমাইয়া বলেন, ‘নিয়োগপত্র না পাওয়ার কঠিন সময়ে আমার পাশে দাঁড়িয়ে বিষয়টি তুলে ধরার জন্য গণমাধ্যমকর্মীদের আন্তরিক ধন্যবাদ। আপনাদের লেখনী ও সহযোগিতায় আমার সমস্যাটি সবার নজরে এসেছে। আজ আমি আমার কাঙ্ক্ষিত নিয়োগপত্র হাতে পেয়েছি-এ আনন্দের মুহূর্তে আপনাদের অবদান কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখনো সারাদেশে প্রায় ৮০০ প্রার্থী বাদ রয়েছেন। শুনেছি, তাদেরও চাকরি হবে।’
অন্যদিকে মঠবাড়িয়া উপজেলার সাপলেজা ইউনিয়নের বাসিন্দা জাহিদ হাসানও একই তালিকায় স্থান পেয়েছেন। ২৮ বছর বয়সী জাহিদের মেধাক্রম ছিল ৫৪তম। তিনি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন কোটায়ও আবেদন করেছিলেন। চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হওয়ার পরও নিয়োগপত্র না পাওয়ায় জাহিদ ও তার পরিবার হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। তার অভিযোগ ছিল, পুলিশ ও এনএসআইয়ের ভেরিফিকেশনে তাকে বাদ দেওয়া হয়েছিল।
জাহিদের বাবা আবু জাফর হাওলাদার কৃষক এবং মা জাহানারা বেগম গৃহিণী। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা না থাকলেও পড়াশোনা চালিয়ে যান তিনি। সাপলেজা মডেল হাইস্কুল থেকে এসএসসি ও ডা. রুস্তম আলী ফরাজী কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। পরিবারের প্রথম সদস্য হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পান তিনি। ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগে ভর্তি হয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
নিয়োগের তালিকায় নাম আসার অনুভূতি জানিয়ে জাহিদ বলেন, ‘যখন দেখলাম আমার রেজাল্ট এসেছে, তখন খুব ভালো লাগছিল। বিশেষ করে আমার পরিবারের জন্য অনেক ভালো লাগছিল। কারণ আমার পরিবারের সবাই ভেঙে পড়েছিল।’
তিনি বলেন, ‘পিরোজপুরের ওয়েবসাইটে আমার চাকরির খবর দেখে প্রথমে আব্বুকে ফোন দিয়েছিলাম। তখন তিনি আলহামদুলিল্লাহ পড়ছিলেন। পরে আম্মুকে ফোন দিলে তিনি কান্না করে দেন।’
জাহিদ আরও বলেন, ‘আমি সবচেয়ে বেশি ধন্যবাদ জানাচ্ছি গণমাধ্যমকে। তারা আমার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে। যার কারণে সংবাদটি মন্ত্রণালয় পর্যন্ত গেছে। আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। পাশাপাশি সরকারকেও ধন্যবাদ জানাই, যেহেতু তারা পুনরায় আমার চাকরিটি ফিরিয়ে দিয়েছে।’
এ বিষয়ে জানতে পিরোজপুরের জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোল্লা বখতিয়ার রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। এর আগে তিনি জানিয়েছিলেন, বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা চলছে।
পিরোজপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২৪৪ জন প্রার্থীর মধ্যে দুই ধাপে মোট ২৪২ জনকে সুপারিশ করা হয়েছে।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দেশের বিভিন্ন জেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত প্রার্থীদের নিয়োগপত্র দেওয়া শুরু হয়। অন্য প্রার্থীরা নিয়োগপত্র পেলেও ভেরিফিকেশনে বাদ পড়ায় সুমাইয়া ও জাহিদ তখন তা পাননি।