বিশেষ ওষুধে যুক্তরাষ্ট্রের ১০০% শুল্ক ছাড়

বাংলাদেশের সামনে নতুন সম্ভাবনা

আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৫০ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানির জন্য বড় একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে। দেশটির সরকার নির্দিষ্ট শ্রেণির বিশেষায়িত ওষুধ এবং এসব ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত সংশ্লিষ্ট উপকরণের ওপর আরোপিত ১০০ শতাংশ শুল্ক থেকে বাংলাদেশকে অব্যাহতি দিয়েছে। তবে এই সুবিধা বাংলাদেশের সব ধরনের ওষুধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। শুধু বিরল রোগের ওষুধ, নিউক্লিয়ার মেডিসিন, প্লাজমা-উদ্ভূত চিকিৎসা, বন্ধ্যত্বের ওষুধ, সেল ও জিন থেরাপি, অ্যান্টিবডি-ড্রাগ কনজুগেট (এডিসি), কিছু জরুরি চিকিৎসা উপকরণ এবং প্রাণীর চিকিৎসায় ব্যবহৃত বিশেষায়িত ওষুধ এ সুবিধার আওতায় পড়বে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশে এই ধরনের ওষুধ তৈরি হয় না। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এই ধরনের ওষুধ তৈরির পরিকল্পনা করছে। আগামীতে এ ধরনের ওষুধ তৈরি করলে তখন বাংলাদেশ এর সুফল পাবে। ওষুধ খাত সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, শুল্ক মুক্তের তালিকায় বাংলাদেশের নাম থাকা দেশে জন্য ইতিবাচক। এখনই সুবিধা না পেলেও, সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। সামনে বাংলাদেশের জন্য সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের ওষুধশিল্প দেশের অন্যতম শক্তিশালী উৎপাদন খাত। বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটির তথ্য অনুযায়ী, দেশের ওষুধশিল্প অভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ পূরণ করে এবং বিশ্বের ১৫০টির বেশি দেশে ওষুধ রপ্তানি করে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো কঠোর নিয়ন্ত্রিত বাজারেও বাংলাদেশের ওষুধ যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বাজার হলেও সেখানে বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানির পরিমাণ এখনো তুলনামূলকভাবে কম। জাতিসংঘের কমট্রেড-ভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১৮ দশমিক ৩৭ মিলিয়ন ডলারের ‘মেডিক্যামেন্টস’ আমদানি করেছে। বর্তমান রপ্তানি পরিমাণ খুব বড় না হলেও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ওষুধ বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ।

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ব্যুরো অব ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড সিকিউরিটি (বিআইএস) ২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ফেডারেল রেজিস্টারে এ বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা দিয়েছে। সেখানে বাংলাদেশসহ ২০টি দেশ বা বাণিজ্যিক অঞ্চলকে নির্দিষ্ট বিশেষায়িত ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্যের ক্ষেত্রে শূন্য শতাংশ অ্যাড ভ্যালোরেম শুল্কের জন্য যোগ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হচ্ছে ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২ এপ্রিল ‘সেকশন ২৩২’-এর আওতায় নির্দিষ্ট পেটেন্টযুক্ত ওষুধ, বায়োলজিক্যাল পণ্য এবং সংশ্লিষ্ট উপাদানের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। প্রাথমিকভাবে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ৩১ জুলাই থেকে এ শুল্ক কার্যকর হয় এবং অন্য কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হওয়ার কথা ছিল।

ডেল্টা ফার্মা লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘আমরা বিষয়টাকে অবশ্যই ইতিবাচকভাবে দেখছি। তার কারণ হচ্ছে যে কথাটা বলছে, যে বিশেষায়িত ওষুধের ব্যাপারে ছাড় দিয়েছে। আমরা যেটুকু জানতে পেরেছি, বিরল এবং জটিল রোগের ব্যবহারের জন্য যে ওষুধ সেগুলোর জন্য, যেমন বন্ধ্যত্বের চিকিৎসা, কোষ, ভিত্তিক থেরাপি, জিন থেরাপি এগুলো। রেগুলার ওষুধের ব্যাপারে কিন্তু তারা ছাড় দেয়নি। এখন দুটি জায়গায় একটু চিন্তা করতে হবে, আমরা আসলে ওই দেশে কী কী ওষুধ রপ্তানি করি? আমরা এখন পর্যন্ত কিন্তু ওই ধরনের কোনো প্রোডাক্ট ওই দেশে রপ্তানি করি না। আর এই যেগুলো ছাড় দেওয়ার কথা বলেছে, এগুলো বেসিক্যালি প্যাটেন্টেড প্রোডাক্ট। এ জন্য আপাতত হয়তো আমরা এটা থেকে বেনিফিট পাব না। কিন্তু দরজা যখন খুলছে, তখন হয়তো আপাতত জটিল এবং বিরল রোগের জন্য খুলছে, ভবিষ্যতে যদি আরও কিছু খোলে, তাহলে আমাদের জন্য উপকার হবে। আমাদের কয়েকটা কোম্পানি চেষ্টা করছে যারা এই বায়োলজিকস নিয়ে কাজ করছে, তারা যদি সফল হয়ে যায়, তাহলে তখন তাদের জন্য উপকার হবে। আর এগুলো বেশ দামি ওষুধ। ভলিউমটা তখন ভালো পাওয়া যাবে। আমরা বিষয়টি ইতিবাচকভাবেই দেখছি। কিন্তু এখনই একেবারে এটার জন্য যে বাংলাদেশ খুব উপকার হবে সেটা না, দরজা খুলল এটাই আমাদের জন্য ইতিবাচক।’

ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির সভাপতি আবদুল মুক্তাদির বলেন, এটার ইমপ্যাক্ট আমরা এখনই পাব না। আগামীর জন্য পথ তৈরি হলো। ভবিষ্যতে হয়তো সুফল পাওয়া যেতে পারে।

বিশেষায়িত ওষুধের শুল্ক ছাড়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের তালিকায় বাংলাদেশ ছাড়াও রয়েছে আর্জেন্টিনা, কম্বোডিয়া, ইকুয়েডর, এল সালভাদর, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, গুয়াতেমালা, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, জর্ডান, মালয়েশিয়া, উত্তর মেসিডোনিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, সুইজারল্যান্ড, লিশটেনস্টাইন, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, যুক্তরাজ্য ও ভিয়েতনামসহ মোট ২০টি অংশীদার দেশ বা অঞ্চল।

যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশের ওষুধ কোম্পানিগুলোর জন্য বিশেষায়িত ওষুধের বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যেসব কোম্পানি ইতিমধ্যে মার্কিন ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফডিএ) অনুমোদন বা প্রয়োজনীয় কমপ্লায়েন্স পূরণ করেছে, তাদের জন্য এই সুযোগ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, ‘বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখছি। যেসব ওষুধে শুল্ক আরোপ করত, তাদের শুল্ক মওকুফে যেহেতু বাংলাদেশের নাম উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশ থেকে তারা যদি ওষুধ ইমপোর্ট করে, তার ওপর শুল্ক থাকবে না। সেই ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কথা তাদের মাথায় আছে। তারা বাংলাদেশ থেকে ওষুধ ইমপোর্ট করবে। বাংলাদেশের কথা যদি তাদের মাথায় না থাকত, তাহলে তারা বাংলাদেশের নাম উল্লেখ করত না। আমাদের দেশ থেকে ওখানে ইমপোর্ট করে থাকে। সেক্ষেত্রে এই তালিকায় বাংলাদেশের নাম থাকায় সুযোগ তৈরি হতে পারে। কোনো দেশের শুল্ক ছাড়ের সুবিধা সেই দেশের নাগরিকরাই পায়। কারণ তখন ওষুধ সস্তায় আসে। ধরেন আমরা কোনো একটা ওষুধ দিতে পারছি না, তারা যে প্রাইসে চাচ্ছে সেই প্রাইসে। এখন যেহেতু শুল্ক উঠিয়ে দিয়েছে, দেখা যাচ্ছে আগে যেটি দেওয়ার সুযোগ ছিল না, এখন সেই ওষুধ সেখানে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ এই সুযোগ নিতে পারলে ভালোই হবে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশেষায়িত ওষুধের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের শূন্য শুল্ক সুবিধা বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনা তৈরি করলেও এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে রপ্তানি বাড়াবে না। এ সুবিধা কাজে লাগাতে হলে স্থানীয় কোম্পানিগুলোকে গবেষণা ও উন্নয়ন, উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি, বায়োটেকনোলজি, ক্লিনিক্যাল গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের সক্ষমতায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত ওষুধের বড় অংশ উৎপাদন করছে জেনেরিক মডেলে। ভবিষ্যতে উচ্চমূল্যের বায়োলজিক্যাল, সেল ও জিন থেরাপি, অরফান ড্রাগ এবং অন্যান্য বিশেষায়িত পণ্যে প্রবেশ করতে পারলে রপ্তানি আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত