চুক্তির গিঁটে থার্ড টার্মিনাল!

আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:২৯ এএম

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহুল প্রতীক্ষিত তৃতীয় টার্মিনাল নিয়ে একের পর এক সমস্যা লেগেই আছে। একটির সমাধান হলে আরেকটি জন্ম নিচ্ছে। তারপরও চলতি বছরের ডিসেম্বরেই টার্মিনাল চালু করতে তোড়জোড় চলছে। তবে টার্মিনাল পরিচালনা নিয়ে জাপানের সঙ্গে এক ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে।

চলতি মাসের মধ্যেই চুক্তি হওয়ার কথা থাকলেও জাপানি প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে গড়িমসির অভিযোগ উঠেছে। তারা টার্মিনালের বিমানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং থেকে আয়ের ভাগও চাচ্ছে। বিমান তাতে রাজি হলেও লিখিতভাবে রাষ্ট্রের গ্যারান্টি চাচ্ছে। এদিকে, দুই দিন আগে প্রকল্পের ব্যয় ৮৪৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা বাড়ালেও জটিলতা কাটছেই না।

এসবের পাশাপাশি আরও কিছু বিষয়ে দূরত্বের কারণেই মূলত জাপানের সঙ্গে এখনই চুক্তি হচ্ছে না। তবে বেবিচক নানা উপায়ে চেষ্টা করছে দ্রুত চুক্তির প্রক্রিয়া সারতে। গতকালও এই নিয়ে বেবিচকে বিশেষ বৈঠক হয়েছে। বৈঠক সূত্র জানায়, বেবিচক ও মন্ত্রণালয় আগামী ডিসেম্বরেই থার্ড টার্মিনালটি চালু করতে চায়। ৩১ অক্টোবরের মধ্যে জাপানের সঙ্গে চুক্তি সেরে ফেলার টার্গেট নিয়ে কাজ করছে বেবিচক। এই নিয়ে মন্ত্রণালয় ও বেবিচক দফায় দফায় বৈঠক করেছে। থার্ড টার্মিনাল নিয়ে সংশয় থাকলেও স্বস্তির বার্তা কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। ইতিমধ্যে বিমানবন্দরের নতুন টার্মিনালের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। চলতি মাসেই বিমানবন্দরটি আন্তর্জাতিকভাবে রূপান্তর করার কথা রয়েছে। এটি উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

বেবিচক সূত্র জানায়, শাহজালালের থার্ড টার্মিনালের অবকাঠামো দাঁড়িয়ে আছে, আধুনিক যন্ত্রপাতিও স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি, রাজস্ব ভাগাভাগি, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও অপারেশনাল প্রস্তুতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। ফলে টার্মিনালটি চালু করতে গিয়ে একের পর এক জটিলতা সামনে আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ও জাপানি কনসোর্টিয়ামের মধ্যে চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চুক্তি চূড়ান্ত না হওয়ায় সংশয় কাটেনি। আগস্টে জাপানি পক্ষ তাদের কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব জমা দিয়েছে। প্রস্তাব মূল্যায়ন ও আলোচনার মাধ্যমে অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স চুক্তি চূড়ান্ত করার কথা ছিল।

‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে বিবেচনা : থার্ড টার্মিনালকে দেশের অ্যাভিয়েশন খাতের ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে চলতি বছরের ডিসেম্বরে যাত্রীসেবার জন্য এটি উন্মুক্ত করে দেওয়ার যে পরিকল্পনা ছিল, তা বাস্তবায়নে দুটি বড় বাধা সামনে এসেছে। টার্মিনালের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়ার কথা রয়েছে জাপানের একটি কনসোর্টিয়ামকে। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলের আওতায় এই চুক্তি হওয়ার কথা। কিন্তু এখন পর্যন্ত সরকারের সঙ্গে জাপানি কনসোর্টিয়ামের চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষর হয়নি। চুক্তির শর্ত, লাভ-ক্ষতির অংশীদারত্ব এবং বিমানবন্দর পরিচালনার কারিগরি দিক নিয়ে দরকষাকষি দীর্ঘায়িত হচ্ছে। চুক্তি হওয়ার পর জাপানি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব জনবল নিয়োগ, সিস্টেম সেটআপ এবং ট্রায়াল রান দিতেই কয়েক মাস সময় লেগে যাওয়ার কথা। চুক্তি না হওয়ায় সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি এখন থমকে আছে। টার্মিনালের অবকাঠামোগত মূল কাজ বড় অংশে শেষ হলেও সামগ্রিক প্রকল্পের গড়ে ১০ শতাংশ কাজ এখনো বাকি। বিশেষ করে শেষ মুহূর্তের অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা, সফটওয়্যার ও ডেটা ইন্টিগ্রেশন, কাস্টমস ও ইমিগ্রেশনের স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম স্থাপন এবং গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ভারী যন্ত্রপাতি বসানোর কাজ এখনো শেষ হয়নি।

চালুর বড় বাধা জাপানি প্রতিষ্ঠান : বেবিচক সূত্র জানায়, ২০২৩ সালের অক্টোবরে আংশিক (সফট) উদ্বোধনের পর আশা করা হয়েছিল যে ২০২৪-২৫ সালের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গ যাত্রীসেবা শুরু হবে। তবে পরিচালনা-সংক্রান্ত চুক্তির অমীমাংসিত অবস্থা, অবকাঠামোগত অসম্পূর্ণতা এবং বাড়তি ব্যয় পর্যালোচনার কারণে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। আবারও যদি সফট ওপেনিং হয় তাহলে আরও পেছাবে ফ্লাইট চলাচল। তবে বেবিচকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, আমরা চেষ্টা করছি আগামী ১৬ ডিসেম্বর পুরোপুরি ফ্লাইট কার্যক্রম চালু করতে। তবে কিছু সমস্যা আছে। সবচেয়ে বড় বাধা জাপান। তাদের হাতে পরিচালনার বেশিরভাগ অংশ চলে গেলে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তারপরও চেষ্টা চলছে দ্রুত সময়ে টার্মিনাল চালু করতে। ডিসেম্বরের মধ্যে সব কাজ শেষ হলেও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর ছাড়পত্র এবং মহড়া (ড্রাই রান) শেষ না করে ফ্লাইট পরিচালনা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের অবহিত করা হয়েছে।

চুক্তিতেই মূল জট : টার্মিনাল পরিচালনার জন্য বেবিচক ও জাপানি কনসোর্টিয়ামের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। মূল বিরোধ হলো রাজস্ব ভাগাভাগি। আগের কাঠামোতে বাংলাদেশ ১৫ শতাংশ রাজস্ব পেত, আর জাপানি অংশীদারের অংশ ছিল ৮৫ শতাংশ। জাপানি কনসোর্টিয়াম টার্মিনালের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব দিয়েছে। প্রস্তাব যাচাইয়ের পর গত মাসে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। বেবিচকের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি চলতি মাসের মধ্যে জাপানের সঙ্গে চুক্তি করতে। কিন্তু তারা কৌশলে দেরি করতে চাচ্ছে। যেভাবেই হোক চুক্তি করতেই হবে। অন্যথায় ডিসেম্বরে টার্মিনালের কার্যক্রম চালু করা সম্ভব হবে না।

বিমানের আয় নিয়েও আলোচনা : তৃতীয় টার্মিনালের পরিচালনা কাঠামোর সঙ্গে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের রাজস্বের পাশাপাশি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যবসাও যুক্ত। বর্তমানে বিমান যাত্রীসেবা-সংক্রান্ত গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ পরিচালনা করে। গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ৫০ ভাগ করতে পারবে বিমান। তবে এ খাত থেকে আয়ের অংশে ভাগ বসাতে চায় জাপানের প্রতিষ্ঠান। এই প্রসঙ্গে বিমানের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, দ্রুত টার্মিনাল পরিচালনার জন্য জাপানের সঙ্গে চুক্তি করতে চাচ্ছি। কিন্তু তারা আমাদের আয়ে কৌশলে ভাগ বসাতে চাচ্ছে। দেশের স্বার্থে আমরা মেনে নিয়েছি। কিন্তু তারা চাচ্ছে রাষ্ট্রের কাছ থেকে লিখিত গ্যারান্টি।

বরাদ্দ বাড়ছে, কমছে না জটিলতা : টার্মিনাল প্রকল্পের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো ব্যয় বৃদ্ধি। প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ছিল প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা। বিভিন্ন সংশোধনের পর তা ২১ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকার বেশি হয়েছিল। সর্বশেষ ৮৪৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা বাড়িয়ে মোট ব্যয় ২২ হাজার ২১৩ কোটি ৯ লাখ টাকা করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (্আইকাও) আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী, নতুন টার্মিনাল পূর্ণাঙ্গ চালুর আগে নিরাপত্তা মহড়া এবং সার্বিক গ্রাউন্ড অপারেশনের ফিটনেস সার্টিফায়েড হতে হয়। থার্ড টার্মিনালটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালুর আগে এই ছাড়পত্র পাওয়ার প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা জরুরি। অত্যাধুনিক ব্যাগেজ হ্যান্ডলিং সিস্টেম, বোর্ডিং ব্রিজেস, মেকানিক্যাল সার্ভিস এবং আধুনিক আইটি নেটওয়ার্ক সচল রাখার জন্য দক্ষ জনবল ও বিদেশি বিশেষজ্ঞ চুক্তি প্রয়োজন।

আংশিক চালুর লক্ষ্য : সরকার আগামী ১৬ ডিসেম্বর আংশিকভাবে চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। শুরুতে দিনে ২০টি ফ্লাইট পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে যাত্রা শুরু করতে চায়। পরে ধাপে ধাপে ফ্লাইট ও সেবা বাড়ানো হবে। তবে সবকিছু নির্ভর করবে জাপানের ওপর। এই প্রসঙ্গে প্রস্তাব মূল্যায়ন কমিটির সভাপতি ও বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) এস এম লাবলুর রহমান বলেন, ‘মূল্যায়ন কমিটির সভা শেষ হয়েছে। এখন জাপানি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চলমান আলোচনা শেষে চুক্তি হবে। আমরা ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে সীমিত পরিসরে উদ্বোধনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি। আশা করছি, সবকিছু সময়ের মধ্যেই শেষ করতে পারব।’

কক্সবাজারে নতুন টার্মিনাল চালু : তৃতীয় টার্মিনালের জটিলতার মধ্যেই দেশের পর্যটননগরী কক্সবাজার বিমানবন্দরের নতুন টার্মিনাল দিয়ে যাত্রীসেবা শুরু হয়েছে। চলতি মাসেই এটি উদ্বোধন করা হবে। নবনির্মিত আন্তর্জাতিক টার্মিনাল দিয়ে পরীক্ষামূলক ফ্লাইট শুরু হয়েছে। নতুন টার্মিনালে যাত্রী ও লাগেজ নিরাপত্তায় রয়েছে সাতটি স্ক্যানার, যাত্রীদের দ্রুত সেবা দিতে রয়েছে ১৪টি চেক-ইন কাউন্টার ও ১০টি ইমিগ্রেশন ডেস্ক। টার্মিনাল প্রজেক্টের মেকানিক্যাল প্রকৌশলী নুর নবী বলেছেন, ‘টার্মিনালে হোল্ড ব্যাগেজ স্ক্যানিংয়ের জন্য চারটি এবং কেবিন ব্যাগেজের জন্য তিনটি স্ক্যানার রয়েছে। রয়েছে আধুনিক মেটাল ডিটেকশন ও ব্যাগেজ কন্ট্রোল সিস্টেম। পাসপোর্ট কন্ট্রোল ও ইমিগ্রেশন এলাকাতেও রয়েছে প্রয়োজনীয় স্ক্যানিং সুবিধা।’

কক্সবাজার বিমানবন্দরের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) গোলাম মোর্তজা হোসেন বলেন, ‘আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা করতে আমরা প্রস্তুত। জনবলও পর্যাপ্ত রয়েছে। পরীক্ষামূলক টার্মিনাল চালু করা হয়েছে। সবকিছু ভালোই মনে হচ্ছে। রানওয়ে এবং নতুন আধুনিক টার্মিনাল সবকিছু ঠিক আছে।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত