শরতের হিমেল হাওয়ার পরশ নিয়ে সাতক্ষীরায় শুরু হয়েছে ৪০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী গুড়পুকুর মেলা। বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) বিকেলে শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কে বর্ণিল ফিতা কেটে এবং আকাশে রঙিন বেলুন ও ফেস্টুন উড়িয়ে মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক মিজ কাউসার আজিজ।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন জেলা পুলিশ সুপার আবু সালেহ মো. আশরাফুল আলম। এ সময় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রিপন বিশ্বাস, সাতক্ষীরা পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. আসাদুজ্জামান, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অর্ণব দত্ত, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক এইচ এম রহমতুল্লাহ পলাশ, সদস্যসচিব আবু জাহিদ ডাবলুসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
উদ্বোধনকালে জেলা প্রশাসক মিজ কাউসার আজিজ বলেন, গুড়পুকুর মেলা সাতক্ষীরার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে মেলার আয়োজন করা হয়েছে। দর্শনার্থীরা যাতে আনন্দঘন ও নিরাপদ পরিবেশে মেলা উপভোগ করতে পারেন, সে বিষয়ে প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, মেলার ঐতিহ্য ও সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখে আগামী দিনগুলোতে এটিকে আরও সুশৃঙ্খল ও আকর্ষণীয় করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। স্থানীয় কারুশিল্প, লোকজ পণ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পৃক্ততা বাড়াতে এ ধরনের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে মেলায় যাতে কোনো ধরনের অনিয়ম, হয়রানি বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়, সেদিকেও প্রশাসনের বিশেষ নজর থাকবে।
মেলা উপলক্ষে শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্ক সেজেছে উৎসবের সাজে। বসেছে প্রায় দেড় শতাধিক মনোহারি পণ্যের স্টল। রয়েছে চিরায়ত বাংলার বাঁশ ও বেতের শিল্পকর্ম, লৌহজাত দ্রব্য, ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির দোকানসহ নানা ধরনের পণ্যের সমাহার। শিশুদের বিনোদনের জন্য রয়েছে নাগরদোলা, পুতুলনাচ ও ট্রেনগাড়ি।
পুলিশ সুপার আবু সালেহ মো. আশরাফুল আলম বলেন, মেলায় দর্শনার্থীদের নিরাপত্তায় পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দায়িত্ব পালন করছে। চাঁদাবাজি, জুয়া ও যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রিপন বিশ্বাস বলেন, ‘মেলার সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রশাসনের নজরদারি রয়েছে। পৌরসভার সিইও মো. আসাদুজ্জামান বলেন, মেলা ঘিরে বাড়তি জনসমাগমের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে পরিচ্ছন্নতা ও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা হচ্ছে।’
প্রবীণ নাগরিক নেতা মাধব দত্ত বলেন, ছোটবেলায় গুড়পুকুর মেলা ছিল সাতক্ষীরার মানুষের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় আয়োজনগুলোর একটি। তখন মেলায় যাওয়ার জন্য শিশু-কিশোরদের মধ্যে কয়েক দিন আগে থেকেই উৎসাহ তৈরি হতো। মাটির তৈরি খেলনা, বাঁশ-বেতের সামগ্রী, মিষ্টি, নাগরদোলা ও নানা লোকজ পণ্যের মধ্যে অন্যরকম আনন্দ খুঁজে পেত মানুষ। সময়ের সঙ্গে মেলার ধরন ও আয়োজনের অনেক পরিবর্তন হলেও এর প্রতি মানুষের আবেগ ও আকর্ষণ এখনো অটুট রয়েছে। এই ঐতিহ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে মেলার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা প্রয়োজন।
মেলায় আসা কিশোরী নওরীন জানায়, পরিবার নিয়ে মেলায় এসে তার খুব ভালো লাগছে। নাগরদোলা, খেলনা ও বিভিন্ন পণ্যের সমাহার শিশু-কিশোরদের আনন্দ বাড়িয়েছে।
শ্যামনগর থেকে আসা মনিরুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন পর গুড়পুকুর মেলায় এসে পুরোনো দিনের স্মৃতি মনে পড়ছে। এ মেলা শুধু বিনোদনের নয়, সাতক্ষীরার লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মেলা প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকায় সার্বক্ষণিক নজরদারির জন্য সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। প্রাথমিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, লোকজ সংস্কৃতির এ উৎসব চলবে আগামী ২০ দিন।