ছেলেকে জমি লিখে দিয়েও ঠাঁই মেলেনি ঘরে

আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১১ এএম

চার মেয়ে ও এক ছেলের বাবা শামসুল হক। জীবনের প্রায় পুরোটা সময় কেটেছে অভাব-অনটনের সঙ্গে লড়াই করে। কৃষিকাজ করে সংসার চালিয়েছেন, মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। একমাত্র ছেলেকে ঘিরে ছিল অনেক স্বপ্ন। কিন্তু বয়সের ভারে যখন কাজ করার সক্ষমতা হারালেন, তখনই বদলে যেতে শুরু করল সেই সংসারের চিত্র। একসময় নিজের ঘর ছেড়ে ভোলা শহরের নিজাম-হাসিনা ফাউন্ডেশন পরিচালিত বৃদ্ধনিবাসে আশ্রয় নেন ৮৫ বছর বয়সী শামসুল হক। কেটে গেছে প্রায় দেড় দশক। নিজের নামে থাকা জমিও ছেলের নামে লিখে দিয়েছেন। সেই জমিতে ছেলে ঘর তুলেছেন। কিন্তু সেই ঘরে ঠাঁই হয়নি বৃদ্ধ বাবার।

গত বুধবার দুপুরে বৃদ্ধনিবাসে বসে জীবনের কষ্টের কথা জানান ভোলা সদর উপজেলার আলীনগর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা শামসুল হক। তিনি বলেন, ‘জীবনের বেশিরভাগ সময় কৃষিকাজ করে কেটেছে আমার। চার মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। সংসারে অভাব ছিল, তাই সন্তানদের তেমন পড়ালেখা করাতে পারিনি। চার মেয়ের জামাই সবাই দিনমজুর। একমাত্র ছেলেকে নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন ছিল।’

তিনি আরও জানান, ২০০৬ সালে ছেলে মফিজুর রহমান বিয়ে করেন। ছেলে বিয়ের পর প্রথম দিকে সংসার স্বাভাবিক থাকলেও বয়সের কারণে কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। ছেলে দিনের বেশিরভাগ সময় ভোলা সদর হাসপাতালের সামনে চা-পানের দোকানে থাকতেন। এ সময় ছেলের স্ত্রীর কাছ থেকে অবহেলা ও অপমান সহ্য করতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

শামসুল হক বলেন, ‘ছেলে বাড়িতে না থাকলে ছেলের বউ ঠিকমতো খাবার দিত না। যা দিত, তাতে পেটের খিদা মিটত না। খাবার চাইলে ঝাড়ু নিয়ে মারতে আসত। ছেলে এসব জানলেও তাকে কিছু বলত না।’

এ অবস্থায় ২০১১ সালের দিকে অভিমান করে বাড়ি ছেড়ে বৃদ্ধনিবাসে আশ্রয় নেন শামসুল হক। এরপর থেকে এই বৃদ্ধনিবাসই হয়ে উঠেছে তার স্থায়ী ঠিকানা।

বৃদ্ধনিবাসে আসার পর নিজের নামে থাকা জমি ছেলেমেয়েদের মধ্যে লিখে দেন তিনি। তার দেওয়া জমিতে ছেলে নতুন ঘরও তুলেছেন। কিন্তু সেখানে বাবার জন্য জায়গা হয়নি।

স্ত্রী বিলকিস বেগমের কথা বলতে গিয়ে শামসুল হক জানান, বাড়ি ছাড়ার পর স্ত্রী বেশিরভাগ সময় মেয়েদের কাছে থাকতেন। ২০১৭ সালে তিনি মারা যান। শামসুল হক বলেন, ‘বৃদ্ধ নিবাসে আসার পর প্রথম দিকে ছেলেমেয়েদের কথা খুব মনে পড়ত। মেয়েরা মাঝেমধ্যে বিভিন্ন খাবার নিয়ে আমাকে দেখতে আসত। কিন্তু ছেলে কোনো কাজ ছাড়া আমাকে দেখতে আসে না।’ তবে দীর্ঘদিন বৃদ্ধনিবাসে থাকার পর এখন আর বাড়িতে ফিরতে মন চায় না তার। এখানকার মানুষদেরই আপনজন মনে হয়। তিনি বলেন, ‘এখন এখানেই ভালো লাগে। ১৫ বছর ধরে এখানে আছি। এখানকার সবাই আন্তরিক। সময়মতো খাবারসহ প্রয়োজনীয় সবকিছুই পাই। বাড়িতে গেলে এখন আর মন টেকে না। বাকি জীবনটা এখানেই কাটাতে চাই।’

সন্তানদের প্রতি কোনো অভিযোগ আছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে শামসুল হক বলেন, ‘সন্তানদের প্রতি কোনো অভিযোগ নেই। তারা ভালো থাকুক এটাই কামনা করি।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত