পূজার মৌসুমেও শাঁখার ব্যবসায় মন্দা, দুশ্চিন্তায় শাঁখারী পল্লীর কারিগররা

শাঁখার বিভিন্ন ধরন রয়েছে। কেটে প্রস্তুত করা হলে তাকে কাঁচা শাঁখা এবং কাটা শাঁখায় নকশা করে তৈরি করা হলে পাকা শাঁখা বলা হয়। 

আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০২:১৫ পিএম

শরতের আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। দুয়ারে দুর্গাপূজা। প্রতিবছর পূজার এই মৌসুমে ব্যস্ত হয়ে ওঠে নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার জামনগর গ্রামের শাঁখারী পল্লি। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ঘুরতে থাকে শাঁখা কাটার মেশিন, উড়তে থাকে শঙ্খের সাদা গুঁড়ো। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যাপারীরা এসে শাঁখা কিনে নিয়ে যান। তবে এবার সেই চেনা ব্যস্ততা অনেকটাই কম। পূজার মৌসুমেও শাঁখার ব্যবসায় মন্দা যাচ্ছে। আগের বছরগুলোর তুলনায় ব্যাপারীদের আনাগোনা ও অর্ডার কম থাকায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন পল্লির কারিগররা। তবুও পূজার দিন যত ঘনিয়ে আসবে, বিক্রি কিছুটা বাড়বে—এমন আশায় আছেন তাঁরা।

উপজেলার জামনগর গ্রামের প্রায় শতাধিক পরিবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শাঁখা তৈরির সঙ্গে জড়িত। সারা বছর ব্যবসা চললেও দুর্গাপূজাকে ঘিরে বছরের সবচেয়ে বড় বাজার তৈরি হয় এ সময়। তাই কয়েক মাস আগে থেকেই শুরু হয় প্রস্তুতি। কাঁচা শঙ্খ কেটে, ঘষে, পালিশ করে নানা নকশার শাঁখা তৈরি করেন কারিগররা। পরে সেগুলো দেশের বিভিন্ন জেলা ও অঞ্চলে পাঠানো হয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন জামনগরের শাঁখারীরা।

স্থানীয় কারিগররা জানান, বিগত বছরগুলোতে পূজাকে সামনে রেখে এ সময় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে শাঁখা কিনতে ব্যাপারীরা জামনগরে আসতেন। তারা একসঙ্গে অনেক শাঁখা কিনে নিয়ে যেতে। ফলে পূজার কয়েক মাস আগে থেকেই কারিগরদের কাজের চাপ বেড়ে যেত। কিন্তু এ বছর ব্যাপারীদের আনাগোনা অত্যন্ত কম। অর্ডারও এসেছে তুলনামূলক কম। ফলে উৎপাদন চললেও আগের মতো বিক্রি হচ্ছে না। এতে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে শাঁখারী পল্লির শতাধিক পরিবারের।

জানা যায়, ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে সোনারগাঁ থেকে বাংলার রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়। নতুন নগর প্রতিষ্ঠায় তখন বিভিন্ন পেশার মানুষকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। সুবেদার ইসলাম খাঁ শঙ্খশিল্পীদের বাখেরগঞ্জ থেকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। পরবর্তী সময়ে রাজধানী মুর্শিদাবাদে সরিয়ে নেওয়া হলে ঢাকার গুরুত্ব কমে যায়। তখন শঙ্খশিল্পীরাও বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েন। তাদের একটি বড় অংশ নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার জামনগর গ্রামে স্থায়ীভাবে বসতি গড়ে তোলেন। তাদের তৈরি শাঁখা ও গহনা আজও এ অঞ্চলে পরিচিত ও সমাদৃত।

শাঁখারী পল্লির কারিগররা জানান, প্রায় শতাধিক পরিবার বহু বছর ধরে এ পেশার সঙ্গে যুক্ত। শাঁখা তৈরির মূল উপকরণ শঙ্খ ভারত ও শ্রীলঙ্কা থেকে আমদানি করা হয়। পুরুষ কারিগররা শঙ্খ কেটে বালা, আংটি ও শাঁখার আকৃতি দেন। আর নারীরা নিপুণ কারুকাজে সেগুলোকে আকর্ষণীয় করে তোলেন। এক জোড়া শাঁখা তৈরিতে খরচ হয় ২০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত। আর স্বর্ণালংকার ব্যবহার করা শাঁখায় খরচ হয় ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত।

কারিগররা আরও জানান, শাঁখার বিভিন্ন ধরন রয়েছে। কেটে প্রস্তুত করা হলে তাকে কাঁচা শাঁখা এবং কাটা শাঁখায় নকশা করে তৈরি করা হলে পাকা শাঁখা বলা হয়। তারা পাথর শাঁখা, সোনা শাঁখা, সাদা শাঁখা, কড়ি শাঁখা, মোটা ও চিকন শাঁখা, চূড়া শাঁখা, ব্রেসলেট শাঁখা ও মান্তরা শাঁখাসহ বিভিন্ন ধরনের শাঁখা তৈরি করেন। এসব শাঁখা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে রংপুর, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, বরিশাল, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ ও চট্টগ্রামে বিক্রি হয়। নবাবদের আমল থেকে এই শিল্প দেশের একটি স্থায়ী ঐতিহ্য হিসেবে চলে আসছে বলে জানান তাঁরা।

জামনগরের শাঁখারী কারিগর তুলসী সেন বলেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি শাঁখা শিল্পের সঙ্গে জড়িত। বাবার বাড়ি, তারপর শ্বশুরবাড়িতেও এ কাজ করে আসছেন। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতেই ৩৮ বছর ধরে এ পেশায় আছেন তিনি। তিনি আরও বলেন, এবার ব্যবসায় অনেকটা ভাটা পড়েছে। যেখানে সারা বছর গড়ে প্রতি মাসে দেড় থেকে দুই লাখ টাকার ব্যবসা হয়, আর পূজার সময় এক-দুই মাস আগে থেকে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকার ব্যবসা হতো—কিন্তু এখন পূজার সময়ও তা সারা বছরের মতোই ব্যবসা হচ্ছে। তবে পূজার এখনো কয়েক দিন বাকি, তাই আশা করছেন শেষ দিকে কিছুটা হলেও ব্যবসা ভালো হবে।

Bagatipara  ‍Shakha

শাঁখারী পল্লির আরেক কারিগর জগন্নাথ পাল জগা বলেন, তার বাপ-দাদারাও এ কাজ করেছেন। তিনিও দীর্ঘদিন ধরে এ পেশায় আছেন। তিনি বলেন, প্রথমে শঙ্খ গোটা আসে। এরপর সেটি ভাঙা, কাটা, পিস করা, ঘষামাজা ও ডিজাইনের কাজ করতে হয়। এক কথায়, পাঁচ ধাপের প্রক্রিয়ার পর শাঁখা তৈরি হয়। পূজার সময় আমাদের বছরের সবচেয়ে বেশি শাঁখা বিক্রি হয়। কিন্তু এবার এখন পর্যন্ত সেই চাহিদা দেখা যাচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, কাঁচামালের দাম না বাড়লেও শ্রমিকের খরচ আগের চেয়ে বেড়েছে। যেখানে একজন শ্রমিক ৪০০ টাকায় কাজ করতেন, এখন ৮০০ টাকা দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যায় না। দেশের বাইরে থেকে আসা ব্যবসায়ীদের চাহিদাও কম। সব মিলিয়ে এ বছরের ব্যবসা সন্তোষজনক নয়।

শাঁখারী পল্লির আরও কয়েকজন কারিগর জানান, শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় শাঁখা তৈরির উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। অন্যদিকে এ বছর বাজারে চাহিদা কম থাকায় আগের মতো লাভ হচ্ছে না। তারপরও দীর্ঘদিনের এ পেশা ধরে রেখে কাজ করে যাচ্ছেন তাঁরা।

জামনগরে তৈরি শাঁখা শুধু নাটোর বা রাজশাহী অঞ্চলে নয়, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রি হয়। পূজার মৌসুমে ব্যবসায়ীরা সরাসরি এসে পণ্য কিনে নিয়ে যান। আবার অনেকে মোবাইল ফোনে অর্ডার দিয়ে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমেও শাঁখা সংগ্রহ করেন। তবে এবার আগের তুলনায় অর্ডার কম হওয়ায় অনেক কারিগর ক্রেতার অপেক্ষায় রয়েছেন।

স্থানীয় প্রবীণদের মতে, কয়েক প্রজন্ম ধরে জামনগর গ্রামে শাঁখা তৈরির কাজ চলে আসছে। পূজার মৌসুম এলেই পুরো শাঁখারী পল্লি তে ব্যস্ততা বেড়ে যেত। এবার বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় সেই ব্যস্ততা অনেকটাই কমেছে।

শাঁখারী ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান জানান, ব্যবসায় মন্দা দেখা দেওয়ায় তিনি কয়েক মাস আগে ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। আগের মতো ব্যবসা ভালো না হওয়ায় তিনি এ পেশা থেকে সরে গেছেন।

আরেক ব্যবসায়ী মিন্টু কুমার সেন বলেন, এলাকার প্রায় ২০-২৫ জন ব্যবসায়ী এ শাঁখা শিল্পের সাথে জড়িত। তবে ব্যবসা আগের থেকে অনেক মন্দা। পূজার সময় বরাবরই ব্যবসা ভালো হয়, তবে এবার তুলনামূলক অনেকটাই খারাপ আর বাইরের ব্যাপারীর সংখ্যাও তুলনামূলক অনেক কম।

Bagatipara  ‍Shakha 1

জামনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম রব্বানী বলেন, যুগ যুগ ধরে শাঁখা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত শাঁখারী পল্লির কারিগররা। এটি তাদের ঐতিহ্যবাহী পেশা। প্রায় শতাধিক পরিবার এ পেশার সঙ্গে জড়িত। এটি জামনগর ইউনিয়নের গর্বের বিষয়। তাদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে শাঁখারী পল্লির কারিগরদের সাহায্য-যোগিতা করা হয়ে থাকে। ভবিষ্যতেও ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে তাদের সহযোগিতা করা হবে।

বাগাতিপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শামসুল ইসলাম বলেন, তিনি নতুন দায়িত্ব নেওয়ার পর শাঁখারী পল্লিতে গিয়েছেন। তিনি জানান, শাঁখা শিল্প এ অঞ্চলের একটি গৌরব ও ঐতিহ্য। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত হতে ব্যবসায়ীরা এখানে শাঁখা নিতে আসেন। ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত কারিগরদের উন্নয়ন এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে গুরুত্ব দেবেন বলে তিনি জানান।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত