‘আমার কইলজাডা ফাডি যায়। শুধু জমি না থায়নে আমার মাইয়ার চাকরি অয় না।’ কথাগুলো বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন বাবা অহিদুর রহমান। কুমিল্লার লালমাই উপজেলার পরতি গ্রামের এই অটোরিকশাচালকের মেয়ে তাসলিমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। তবে পরিবারের নিজস্ব ভূমি না থাকায় শেষ মুহূর্তে তার নিয়োগ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। মেয়ের চাকরি না হওয়ার আশঙ্কায় অহিদুর রহমানের কান্নার একটি ভিডিও গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সামাজিক
মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে বিষয়টি নজরে আসে কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরীর। তিনি সঙ্গে সঙ্গে জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেন। এরপর তাসলিমার নিয়োগ নিশ্চিত হয়েছে এবং তার হাতে নিয়োগপত্র তুলে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা। অহিদুর রহমানের বাড়ি লালমাই উপজেলার ভুলইন দক্ষিণ ইউনিয়নের পরতি গ্রামে। ছয় সন্তানের এই পরিবারে অভাব নিত্যসঙ্গী। অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি সন্তানদের পড়াশোনা করিয়েছেন তিনি।
পরিবারের সদস্যরা জানান, তাসলিমা নিজের মেধা ও যোগ্যতায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। নিয়োগের শেষ পর্যায়ে এসে পরিবারের নিজস্ব ভূমি না থাকার বিষয়টি নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। এতে চাকরি হবে কি না, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে পরিবারটি।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে অহিদুর রহমানকে বলতে শোনা যায়, ‘আমার অভাবের সংসার। অনেক কষ্ট করে মাইয়াডারে পড়াশোনা করাইছি। কত দিন না খাইয়া থেকেও ও পড়ছে। মাইয়াডা খুব মেধাবী আছিলো। নিজের যোগ্যতায় চাকরির পরীক্ষায় পাস করছে, ভাইভাও দিছে। এখন শুধু আমার ভূমি নাই এ কারণে যদি চাকরিটা না হয়, তাইলে আমি কী করমু?’ তিনি আরও বলেন, ‘মাইয়ার চাকরি হইছে এই খবর শুনে কত খুশি হইছিলাম। ভাবছিলাম, এতদিনের কষ্ট শেষ হইছে। কিন্তু এখন শুনতেছি, একটা খতিয়ান না থাকার কারণে চাকরি হবে না। এই কথা শুনে আমার গুদ্দাডা ফাডি যায়।’ অহিদুর রহমানের ওই ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নজরে আসে সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরীর। পরে তিনি জেলা প্রশাসক ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেন। তাসলিমা বলেন, কোনো এক অজানা কারণে আমার নিয়োগটি স্থগিত হয়েছিল। বিষয়টি এমপির সহায়তায় সমাধান হয়েছে। এখন আমার নিয়োগপত্র হাতে পেয়েছি। এমপি সাহেবকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।
কুমিল্লা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনছুর আলী চৌধুরী বলেন, নিয়োগের সময় এখনো শেষ হয়নি। তবু বিষয়টি এমপি মহোদয় বলাতে গুরুত্ব দিয়ে চাকরির কাগজপত্র তাকে দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে গতকাল শুক্রবার সকালে মুঠোফোনে সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, মেয়েটি ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে পাস করে প্রাইমারি চাকরির পরীক্ষায় টিকলেও ভূমির জন্য নাকি চাকরি হয় না। এমন বিষয়টি ডিসি ও ডিপিওকে জানালে রাতের মধ্যে তারা জানালো মেয়েটির চাকরি নাকি কনফার্ম। তিনি আরও বলেন, আমি মেয়েটিকে পরে বললাম, কে তোমাকে বলছে ভূমির জন্য চাকরি হবে না। আমি বলতে পারি, তোমার চাকরি হয়ে গেছে।’