নাটোরে দিন দিন বাড়ছে খামারি ও গবাদি পশু-পাখির সংখ্যা। তবে সেই তুলনায় বাড়েনি প্রাণিসম্পদ দপ্তরের জনবল। ফলে তীব্র কর্মী সংকট নিয়ে বছরের পর বছর সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতাল।
দপ্তরটিতে অনুমোদিত ১১টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কাগজে-কলমে কর্মরত আছেন মাত্র ছয়জন। এর মধ্যে আবার দুজন ডেপুটেশনে (প্রেষণে) থাকায় বাস্তবে নিয়মিত দায়িত্ব সামলাচ্ছেন মাত্র চারজন কর্মকর্তা-কর্মচারী। দীর্ঘ প্রায় পাঁচ বছর এই তীব্র জনবল সংকট নিয়েই জোড়াতালি দিয়ে চলছে দপ্তরের যাবতীয় কার্যক্রম। স্থানীয় খামারিদের দাবি, দ্রুত এই শূন্য পদগুলো পূরণ করা হলে টিকাদান, রোগপ্রতিরোধ, আধুনিক প্রশিক্ষণসহ মাঠ পর্যায়ের সেবার মান আরও উন্নত হবে। এতে যেমন প্রাণিসম্পদ খাতের উৎপাদনশীলতা বাড়বে, তেমনি উপকৃত হবেন স্থানীয় খামারিরা।
প্রাণিসম্পদ দপ্তর সূত্র জানা যায়, উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় ছোট-বড় প্রায় ১২ হাজার খামারি রয়েছেন। এসব খামারির চিকিৎসা, রোগপ্রতিরোধ, টিকাদান, খামার ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষণ ও সম্প্রসারণমূলক কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় জনবল কম থাকায় মাঠ পর্যায়ে কাক্সিক্ষত সেবা দিতে নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের। আরও জানা যায়, অনুমোদিত ১১টি পদের বিপরীতে বর্তমানে ছয়জন কর্মরত দেখানো হচ্ছে। এর মধ্যে ড্রেসার পদে কর্মরত আসাদুজ্জামান প্রায় ছয় মাস রাজশাহীতে ডেপুটেশনে রয়েছেন। অন্যদিকে ভেটেরিনারি ফিল্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট (ভিএফএ) পদে কর্মরত একজন প্রায় এক বছর ঢাকায় ডেপুটশনে রয়েছেন। ফলে কাগজে-কলমে ছয়জন কর্মরত থাকলেও বাগাতিপাড়া দপ্তরে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন চার জন। এতে করে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাদের প্রায় বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিনের জনবল সংকটের কারণে প্রাণিসম্পদ দপ্তরের মাঠ পর্যায়ের সেবার পরিধি কাক্সিক্ষতভাবে বাড়ছে না। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে পশু অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা, পরামর্শ ও রোগপ্রতিরোধমূলক সেবা পেতে অনেক সময় সমস্যায় পড়তে হয়। জনবল বাড়ানো হলে নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন, টিকাদান ও রোগপ্রতিরোধ কার্যক্রম আরও জোরদার হবে বলে মনে করেন তারা।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. রোকনুজ্জামান বলেন, দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ উপসহকারী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (সম্প্রসারণ) পদে দীর্ঘদিন ধরে জনবল সংকট রয়েছে। একজনকে পদায়ন করা হলেও তিনি প্রায় এক বছর ঢাকায় ডেপুটেশনে রয়েছেন। ফলে মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারণ কার্যক্রম পরিচালনায় সমস্যা হচ্ছে। জনবল সংকটের কারণে সরকারি টিকাদান কর্মসূচি নির্ধারিতভাবে বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক সময় স্বেচ্ছাসেবকদের (ভলান্টিয়ার) মাধ্যমে টিকাদানের কাজ পরিচালনা করতে হলেও সরকারি প্রশিক্ষিত জনবল না থাকায় কাক্সিক্ষত মান নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি আরও জানান, বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ৭০ থেকে ৮০ জন খামারি ও পশুপালক চিকিৎসা ও পরামর্শের জন্য উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে আসেন। কিন্তু সীমিত জনবল দিয়ে সবার কাছে দ্রুত ও মানসম্মত সেবা পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে খামারিদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে রোগপ্রতিরোধ, পরামর্শ প্রদান, উঠান বৈঠক ও সম্প্রসারণমূলক কার্যক্রম অনেকটা ব্যাহত হচ্ছে। তবে কৃত্রিম প্রজনন (এআই) কার্যক্রমে বর্তমানে তেমন কোনো সমস্যা নেই বলে জানান তিনি। এ খাতে প্রয়োজনীয় জনবল থাকায় সেবাটি স্বাভাবিকভাবে চলমান রয়েছে।
জরুরি রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে পরিস্থিতি মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে ডা. মো. রোকনুজ্জামান বলেন, অর্ধেকেরও কম জনবল দিয়ে কাজ করা অত্যন্ত কঠিন। তারপরও বিদ্যমান জনবল নিয়েই আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। জনবল সংকট নিরসনে মহাপরিচালকের কাছে লিখিতভাবে বিষয়টি জানানো হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দ্রুত শূন্য পদগুলো পূরণ করা হলে জনগণের দোরগোড়ায় আরও কার্যকরভাবে প্রাণিসম্পদ সেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
উপজেলার সোনাপাতিল মহল্লার ছাগল খামারি আনোয়ার বলেন, আমার একটি ছাগলের খামার রয়েছে। উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের কাক্সিক্ষত সেবা আমরা পাচ্ছি না। দপ্তরের কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে পরিচালিত হলে আমরা খামার সম্প্রসারণে আরও উৎসাহিত হতাম।
উপজেলার মুরাদপুর এলাকার গরুর খামারি আনিসুর রহমান বলেন, উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের সেবায় আমরা পুরোপুরি সন্তুষ্ট নই। সরকারের উচিত দ্রুত জনবল সংকট দূর করে দপ্তরের কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করা, যাতে খামারিরা সময়মতো প্রয়োজনীয় সেবা পান।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. রোকনুজ্জামান জানান, তিনি বাগাতিপাড়ার প্রাণিসম্পদ খাতকে আরও এগিয়ে নিতে চান। এই উপজেলার প্রতিটি বাড়িতে একটি মডেল খামারে পরিণত হবে।