প্রথাবিরোধী বহুমাত্রিক লেখক, শিক্ষাবিদ অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ তার আলোচিত প্রবচন গ্রন্থ ‘প্রবচনগুচ্ছ’-এ লিখেছেন, ‘আমি ঈর্ষা করি শুধু তাদের, যারা আজও জন্মায়নি’। আজকের বাস্তবতায় অনেক দেশে কিংবা সমাজে বেঁচে থাকা, চারপাশের পরিবেশ এবং মানুষের নির্মমতার অনেক কিছু আমাদের নানাভাবে পীড়িত করে। হুমায়ুন আজাদ এও বলেছিলেন, যারা এখনো জন্মায়নি, তারা ভাগ্যবান এবং তাদের প্রতি তিনি ঈর্ষা বোধ করেন। কারণ তাদের এই পৃথিবীর কোনো দুঃখ-কষ্ট বা ক্রূরতার মুখোমুখি হতে হয় না। তার এ অভিব্যক্তির মর্মার্থ আরও ব্যাপ্ত। ৬ অক্টোবর দেশ রূপান্তরে ‘২০ লাখ শিশু নেই সরকারের খাতায়’ শিরোনামে প্রকাশিত শীর্ষ প্রতিবেদনটি যেন তার অভিব্যক্তিকে ছুঁয়ে গেছে। আমরা যদি স্বল্পায়ু কবি, দ্রোহী সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘ছাড়পত্র’ কবিতার ‘যে শিশু ভূমিষ্ঠ হল আজ রাত্রে/তার মুখে খবর পেলুম/সে পেয়েছে ছাড়পত্র এক,/...নতুন বিশ্বের দ্বারে তাই ব্যক্ত করে অধিকার...’ এই পঙ্তিগুলো বিশ্লেষণ করি সেক্ষেত্রেও প্রকাশিত প্রতিবেদনটির মর্মার্থ আরও গভীরভাবে উপলব্ধিতে আসে।
জাতীয় জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন দিবসে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে উঠে আসা চিত্র অর্থাৎ জন্মের পর একটি শিশুর প্রথম সরকারি পরিচয়ের প্রাথমিক পর্বটির ব্যাখ্যা করলে সহজেই ধারণা করা যায়, এই সমাজে একজন শিশুর অধিকার বঞ্চনার চিত্র কত প্রকট। যে জন্ম নিবন্ধন একজন মানুষের পর্যায়ক্রমে জীবনের অধিকারের সড়ক নির্মাণের অনুষঙ্গ এবং বর্তমান বাস্তবতায় সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ, এর সূচনাতেই কত গলদ, অবহেলা দৃশ্যমান! বলা হয়েছে, অন্তত ২০ লাখ শিশুর জন্মের তথ্যই নেই সরকারের খতিয়ানে! এই ‘নেই’র ফলে পরিচয় ও বয়সের প্রমাণ থেকে শুরু করে শিক্ষা, চিকিৎসা, সামাজিক সুরক্ষা ও বিভিন্ন নাগরিকসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে তৈরি হচ্ছে বহুবিধ বাধা-বিপত্তি। সরকারের খতিয়ানবহির্ভূত শিশুরা বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পা বাড়াচ্ছে বিপথে। বহুমাত্রিক অপরাধের স্রোতে তারা সমাজবিরোধী চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। ওই প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, পুলিশের অনুসন্ধানেও রাজধানীর কিশোর গ্যাংয়ের বেশিরভাগ সদস্যকে ভাসমান বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সৃষ্ট এ ক্ষত ক্রমেই হয়ে উঠছে অনিরাময়যোগ্য। এ যেন চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘অ্যাকিউট’ (গুরুতর) কিংবা ‘ইনকিউরেবল’ (দুরারোগ্য) অবস্থা।
আমরা জানি, আমাদের রাষ্ট্রীয় সেবার অনেক ক্ষেত্রেই রয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা। প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে, ইউনিসেফের ২০২৪ সালের গবেষণায়ও পথ-সংযুক্ত শিশুদের সংগঠিত অপরাধী চক্রের তাদেরকে ব্যবহারের তথ্যও উঠে এসেছে। জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনের জন্য সরকার কাঠামোর দায়িত্বশীল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রয়েছে। ‘নির্ভুল নিবন্ধন, নিশ্চিত হবে সুশাসন’ এ স্লোগানের মর্মার্থ, সঠিক নিবন্ধনের মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব তুলে ধরে। জন্ম নিবন্ধন আধুনিক আইনি, প্রশাসনিক ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিতকরণের প্রক্রিয়া হওয়া সত্ত্বেও কেন পথটি অমসৃণ এর ব্যাখ্যা দেওয়ার দায় সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষেরই এড়ানোর অবকাশ নেই। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তি বা পরিবারের দায়ের বিষয়টিও সমভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। এক সমীক্ষায় প্রকাশ, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনের হার যথাক্রমে শতকরা প্রায় ৫০ ও ৪৭ ভাগ! সার্বিক সুশাসন ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই চিত্র কত বড় অন্তরায়, এর ব্যাখ্যাও নি®প্রয়োজন।
নবজাতক বা মৃত ব্যক্তির সঠিক পরিসংখ্যান ও তথ্যভাণ্ডারে যে অসংগতি রয়েছে তাতে ব্যাহত হচ্ছে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা। অনলাইন নিবন্ধনে জটিলতা, সফটওয়্যারের সমস্যা এবং জন্ম-মৃত্যু সনদে বাবা-মায়ের তথ্য যুক্ত করতে গিয়ে নানা হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে এও পুরনো অভিযোগ। জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন আইন-২০০৪ অনুযায়ী, শিশুর জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে জন্মসংক্রান্ত তথ্য নিবন্ধকের কাছে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। একইভাবে কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পরও একই নিয়ম। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও নিবন্ধনের সুযোগ বিদ্যমান সত্ত্বেও বিঘ্ন বিদ্যমান! নাগরিকের আইনগত পরিচয়ের অন্যতম এই ভিত্তির উৎসে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের নজর গভীর করতেই হবে। কার্যক্রম জোরদার করতে প্রশাসনের তৃণমূল স্তর পর্যন্ত জোরদার ভূমিকা নিতে হবে। জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন টাস্কফোর্সকে আরও সক্রিয় করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া বাঞ্ছনীয়। জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রম গতিশীল, স্বচ্ছ ও নির্ভুল করার জন্য স্থানীয় সরকার পর্যায়ে যে টাস্কফোর্স রয়েছে, বিদ্যমান অবস্থার প্রেক্ষাপটে তাদের সক্রিয়তার সমান্তরালে জবাবদিহি নিশ্চিতকরণের বিকল্প নেই।