বন্ধু আনন্দ ফোন দিল। ফোন ধরতেই আনন্দ বলে উঠল সিলেটে শত বছর পুরনো দুর্গাবাড়ি আছে নাকি? আমি শুনে বললাম নাম শুনেছি কিন্তু যাব যাব বলে যাওয়া হয়নি। আমি মনে মনে ভাবলাম পাপী মানুষ দেবী দর্শনে যদি পাপ কিছুটা খ-ন হয়। আমি বললাম ঠিক আছে সামনের সপ্তাহ থেকেই তো পূজা। এর মধ্যে আমরা ঘুরে আসব দুর্গাবাড়ি থেকে। বাঙালি হিন্দুদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয়া দুর্গোৎসব। শারদীয়া দুর্গাপূজাকে ‘অকালবোধন’ বলা হয়। হিন্দুশাস্ত্র অনুসারে, শরৎকালে দেবতারা ঘুমিয়ে থাকেন। তাই এই সময়টি তাদের পূজা যথাযথ সময় নয়। অকালের পূজা বলে তাই এই পূজার নাম হয় ‘অকালবোধন’। এই দুই পুরাণ অনুসারে, রামকে সাহায্য করার জন্য ব্রহ্মা দুর্গার বোধন ও পূজা করেছিলেন। কৃত্তিবাস ওঝা তার রামায়ণে লিখেছেন রাম স্বয়ং দুর্গার বোধন ও পূজা করেছিলেন। সনাতন ধর্মালম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব হওয়ায় বাংলাদেশে দুর্গাপূজা বিশেষ জাঁকজমকের সঙ্গে পালিত হয়।আগেই পরিকল্পনা করে রেখেছিলাম কীভাবে যাব। আগের দিন রাতে ট্রেনে চেপে আমি, মা, আনন্দ, সানন্দা পৌঁছালাম সিলেট শহরে। সোজা চলে গেলাম বাড়িতে। কিছু সময় বিশ্রাম নিয়ে তৈরি হয়ে নিলাম সিলেটের টিলাগড়ে অবস্থিত দুর্গাবাড়ির উদ্দেশ্যে। জিন্দাবাজার, বন্দরবাজার, মিরাবাজার পেরিয়ে গাড়ি এগিয়ে চলছে। আমরা যেদিন গিয়েছিলাম সেদিন ছিল অষ্টমী পূজা পথে দেখা পেলাম সবাই নতুন জামাকাপড় পরে পূজা মন্ডপের দিকে এগিয়ে চলছে। দুর্গাবাড়ির জন্য ঐ এলাকার নাম দুর্গাবাড়ি রোড। দূর থেকে শুনতে পেলাম ঢাকের ধ্বনি। এ এক অন্যরকম অনুভূতি। আমি যেন ফিরে গেলাম আমার সেই ছেলেবেলায়। মায়ের সঙ্গে পূজার বাজার করতে বের হওয়া, আবদার করা। রামকৃষ্ণ মিশনে গিয়ে সবার সঙ্গে অঞ্জলি নেওয়া। লাইন ধরে প্রসাদ খাওয়া। আমরা এসে পৌঁছালাম দুর্গাবাড়িতে। বেশ ভিড় লেগে আছে পুরো এলাকাজুড়ে তাই বেশ কিছু দূরেই নেমে হেঁটে এগিয়ে গেলাম। এলাকাজুড়ে মেলা বসেছে। প্রতিটি দোকানে ছোট-বড় সবাই ভিড় করছেন। আমি একবার মেলায় ঢুঁ মেরে দেখতে চেয়েছিলাম কিন্তু সানন্দা বলল, চলো মন্দিরে গিয়ে অঞ্জলি নিয়ে নিই; কারণ সকাল ১১টার মধ্যে আজ অঞ্জলি নিতে হবে। দূর থেকে অসাধারণ লাগছিল দুর্গা মন্দির। টিলার ওপর মূল মন্দির অবস্থিত। মানুষ চলছে এগিয়ে মন্দিরের দিকে। অর্ধশত সিঁড়ি ডিঙিয়ে আমরা উপস্থিত হলাম মূল মন্দির প্রাঙ্গণে। প্রচন্ড ভিড় মন্দির প্রাঙ্গণে। কাঁসর আর ঢাকের শব্দে এক মোহনীয় পরিবেশ তৈরি হয়েছে। অনেক কষ্ট করে সামনে এগিয়ে গেলাম মাতৃমূর্তি দর্শন করার জন্য। মাইকে ঘোষণা দেওয়া হলো যারা অঞ্জলি দিতে চান তারা সামনে চলে আসুন। অঞ্জলি শেষে এগিয়ে গেলাম প্রসাদ নেওয়ার জন্য। বেশ লম্বা লাইন পারি দিয়ে আমরা প্রসাদ নিলাম। কলাপাতার মধ্যে গরম গরম খিচুড়ি আর লাবড়া দেওয়া হলো। অসাধারণ স্বাদ, কত দিন পরে কলাপাতায় খিচুড়ি খেলাম। ভাবছিলাম এই দুর্গাবাড়ির ইতিহাসটা যদি জানতে পারতাম। দেখা হয়ে গেল পূজা দিতে আসা প্রবীণ ভক্ত বিজয় বিশ্বাসের সঙ্গে। তিনি জানালেন, এই দুর্গাবাড়ির ইতিহাস কয়েক শত বছরের পুরনো। শোনা যায় কোলকাতার পাথরঘাটা নামক স্থানের এক সম্ভ্রান্ত জমিদার এই দুর্গাবাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন। এ ব্যাপারে ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী সম্পাদিত স্মৃতি ও প্রতীতি নামক বইয়ে উল্লেখ আছে। ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী ছিলেন সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের প্রতিষ্ঠাতা। এই বইটি আগে তার কাছে সংগ্রহে ছিল, বর্তমানে নেই। তিনি আরও বলেন, স্বদেশি আন্দোলনে অনেক বীর এখানে এসে মায়ের পায়ে নিজের রক্ত দিয়ে প্রতিজ্ঞা করতেন নিজের আদর্শ থেকে এক চুলও বিচ্যুত হবেন না। স্বদেশকে পরাধীনতা থেকে মুক্ত করেই তবে ঘরে ফিরবেন। বিজয় বিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলতে বলতে আমরা এগিয়ে গেলাম শিব মন্দিরের দিকে। অসাধারণ কারুকাজ আমরা গিয়ে শিব মন্দিরে প্রণাম করলাম। এরপর মন্দিরের নিচে বসা মেলায় গেলাম। আমি দেখা পেলাম গরম গরম জিলাপি ভাজা হচ্ছে। তাই দেখে আর লোভ সামলাতে পারলাম না। তাই নিয়ে নিলাম জিলাপি। গরম গরম জিলাপির স্বাদটাও অসাধারণ। এদিকে মা তাড়া দিতে লাগলেন চল বাসায় ফিরে চলি; সারা দিন উপোস ছিলেন বিশ্রাম নিতে হবে। দেরি না করে আমরা ফিরে চললাম বাড়ির উদ্দেশ্যে।
যাবেন কীভাবে
দুর্গাবাড়ি মন্দির যেতে হলে আপনাকে বাস বা ট্রেনে করে আসতে হবে সিলেট শহরে। বাস বা ট্রেনে ভাড়া পড়বে ৩২০ টাকা থেকে ১২০০ টাকা। সিলেট শহরের যে কোনো প্রান্ত থেকে অটোরিকশায় দুর্গাবাড়ি যাব বললেই আপনাকে নিয়ে যাবে শত বছরের পুরনো দুর্গাবাড়িতে।