আলোকসংবেদনশীল প্রোটিন ও স্নায়ুবিজ্ঞান

আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০২:০১ এএম

১৯৫৩ সালে জন্ম নেওয়া নাগেল জার্মানির একজন জীবপদার্থবিজ্ঞানী। তিনি ১৯৮৮ সালে ফ্রাঙ্কফুর্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জন করেন। তার গবেষণার ক্ষেত্রের মধ্যে রয়েছে কোষের ঝিল্লি, আয়ন চ্যানেল এবং আলো ও বৈদ্যুতিক সংকেতের পারস্পরিক সম্পর্ক। বর্তমানে তিনি জার্মানির উরৎসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ আণবিক শারীরবিদ্যা ও জীবপদার্থবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে কাজ করছেন। নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত আবিষ্কারগুলোর সংশ্লিষ্ট গবেষণা করা হয়েছিল ফ্রাঙ্কফুর্টের ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর বায়োফিজিকসেও।

নাগেলের নোবেলজয়ী গবেষণার সূত্রপাত ঘটে পিটার হেগেম্যানের সঙ্গে তার সহযোগিতার মধ্য দিয়ে। হেগেম্যান এককোষী শৈবাল ঈযষধসুফড়সড়হধং কীভাবে আলোর প্রতি সাড়া দেয়, তা নিয়ে কাজ করছিলেন। তার ধারণা ছিল, শৈবালের মধ্যে এমন একটি প্রোটিন রয়েছে, যা আলো শনাক্ত করার পাশাপাশি কোষের ভেতরে আয়ন চলাচলের পথও তৈরি করে। এ ধারণা পরীক্ষা করার জন্য তিনি নাগেলের সহযোগিতা চান। নাগেল শৈবালের জিন ব্যাঙের ডিম্বকোষে প্রবেশ করিয়ে পরীক্ষা করেন এবং চ্যানেলরোডপসিন-২ নামের আলোকসংবেদনশীল আয়ন চ্যানেল শনাক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

এই প্রোটিনের বিশেষত্ব হলো, নীল আলো পড়লে এটি খুলে যায় এবং কোষের ঝিল্লি দিয়ে বৈদ্যুতিক আধান বহনকারী আয়ন প্রবেশ করতে পারে। ফলে কোষের বৈদ্যুতিক বৈশিষ্ট্য বদলে যায়। সাধারণভাবে আলোকে আমরা দেখি, আর কোষের ভেতরে বৈদ্যুতিক সংকেতকে আলাদা একটি জৈবিক প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করি। চ্যানেলরোডপসিনের আবিষ্কার দেখাল, নির্দিষ্ট প্রোটিনের মাধ্যমে এই দুটি প্রক্রিয়াকে সরাসরি যুক্ত করা সম্ভব। এ আবিষ্কারই পরবর্তী সময়ে জীবন্ত কোষের কার্যক্রম আলো দিয়ে নিয়ন্ত্রণের প্রযুক্তিগত ভিত্তি তৈরি করে।

২০০৩ সালে হেগেম্যান ও নাগেল তাদের গবেষণায় দেখান, চ্যানেলরোডপসিনের জিন অন্য কোষে প্রবেশ করালে সেই কোষকে আলোকসংবেদনশীল করে তোলা যায় এবং আলো প্রয়োগ করে বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি করা সম্ভব। এর ফলে প্রশ্ন ওঠে, একই কৌশল কি মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা যাবে? স্নায়ুকোষের কার্যক্রম মূলত বৈদ্যুতিক ও রাসায়নিক সংকেতের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। নির্দিষ্ট কোষকে আলোর সাহায্যে সক্রিয় করতে পারলে মস্তিষ্কের কোনো নির্দিষ্ট কার্যক্রমের সঙ্গে সেই কোষের সম্পর্ক পরীক্ষামূলকভাবে বোঝা সম্ভব হতে পারে।

এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে কার্ল ডাইসেরথের কাজ ছিল নির্ণায়ক। তিনি চ্যানেলরোডপসিনের জিন ইঁদুরের স্নায়ুকোষে প্রবেশ করিয়ে নীল আলো দিয়ে স্নায়ুসংকেত তৈরি করেন। ২০০৫ সালে এ বিষয়ে গবেষণা প্রকাশিত হয় এবং ২০০৭ সালে জীবিত ইঁদুরের মস্তিষ্কে আলোর সাহায্যে নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি প্রদর্শিত হয়। এ প্রযুক্তির নাম হয় অপ্টোজেনেটিকস। অপ্টোজেনেটিকসের মাধ্যমে গবেষকরা এখন নির্দিষ্ট স্নায়ুপথ সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় করে স্মৃতি, অনুভূতি, ঘুম ও আচরণের সঙ্গে সেগুলোর সম্পর্ক পরীক্ষা করতে পারেন। আলঝেইমার, পারকিনসন, মৃগীরোগ ও আসক্তির মতো সমস্যার গবেষণায়ও এ পদ্ধতি ব্যবহৃত হচ্ছে। পাশাপাশি দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনার সম্ভাব্য চিকিৎসা এবং শ্রবণ-সহায়ক প্রযুক্তির উন্নয়নেও আলোকসংবেদনশীল প্রোটিন নিয়ে গবেষণা চলছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত