এককোষী শৈবাল থেকে মস্তিষ্কের রহস্য

আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০২:০২ এএম

১৯৫৪ সালে জন্ম নেওয়া হেগেম্যান জার্মানির একজন স্নায়ুবিজ্ঞানী। তিনি ১৯৮৪ সালে জার্মানির মার্টিন্সরিডে অবস্থিত ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর বায়োকেমিস্ট্রি থেকে পিএইচডি অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে আলোকসংবেদনশীল প্রোটিন, কোষের কার্যপ্রণালি এবং আলো ও জীবদেহের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে তার গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বর্তমানে তিনি বার্লিনের হামবোল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নায়ুবিজ্ঞানের হের্টি সিনিয়র অধ্যাপক হিসেবে কাজ করছেন।

হেগেম্যানের গবেষণার একটি কেন্দ্রীয় প্রশ্ন ছিল, এককোষী শৈবাল ঈযষধসুফড়সড়হধং কীভাবে আলোর প্রতি সাড়া দেয়। এই ক্ষুদ্র জীবটি আলোর উৎসের দিকে চলতে পারে। কিন্তু কীভাবে আলো শনাক্ত করার সঙ্গে কোষের বৈদ্যুতিক ও চলনগত প্রতিক্রিয়ার সংযোগ তৈরি হয়, সেটি বোঝা জরুরি ছিল। ১৯৯০-এর দশকের শুরু থেকে হেগেম্যান এ প্রক্রিয়া নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেন। তার আগ্রহের বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে উদ্ভিদকোষের আলোকসংবেদনশীলতা নিয়ে হলেও, পরবর্তী সময়ে তার তাৎপর্য ছড়িয়ে পড়ে স্নায়ুবিজ্ঞানের বিস্তৃত পরিসরে।

এই অনুসন্ধানে তার সঙ্গে যুক্ত হন আরেক জার্মান বিজ্ঞানী গেওর্গ নাগেল। হেগেম্যান ধারণা করেছিলেন, শৈবালের একটি প্রোটিন একই সঙ্গে আলো শনাক্ত করতে এবং কোষের ঝিল্লি দিয়ে আয়ন চলাচলের পথ তৈরি করতে পারে। তিনি নাগেলকে প্রোটিনটির কার্যকারিতা পরীক্ষা করার অনুরোধ জানান। গবেষণায় তারা চ্যানেলরোডপসিন নামের একটি আলোকসংবেদনশীল প্রোটিনের বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করেন। নীল আলো পড়লে প্রোটিনটির ভেতরের আয়ন চ্যানেল খুলে যায় এবং বৈদ্যুতিক আধান বহনকারী আয়ন কোষের মধ্যে প্রবেশ করতে পারে। এর ফলে কোষের বৈদ্যুতিক অবস্থা পরিবর্তিত হয়।

আবিষ্কারটির তাৎপর্য ছিল, এই প্রোটিনের জন্য দায়ী জিন অন্য কোষে প্রবেশ করানো হলেও সেই কোষকে আলোর প্রতি সংবেদনশীল করে তোলা সম্ভব। হেগেম্যান ও নাগেলের গবেষণা দেখায়, আলোর সাহায্যে কোষের বৈদ্যুতিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের একটি নতুন পথ তৈরি করা যেতে পারে। ২০০৩ সালে তাদের প্রকাশিত গবেষণায় মানবকোষে এই প্রোটিন ব্যবহারের মাধ্যমে আলো দিয়ে বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরির বিষয়টি দেখানো হয়। তবে তখনো জীবিত মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য প্রযুক্তিটির আরও বিকাশ প্রয়োজন ছিল।

সেই পরবর্তী ধাপটি এগিয়ে নেন কার্ল ডাইসেরথ। তিনি চ্যানেলরোডপসিনের জিন স্নায়ুকোষে প্রবেশ করিয়ে নীল আলো প্রয়োগের মাধ্যমে স্নায়ুসংকেত তৈরি করেন। ২০০৫ সালে ইঁদুরের স্নায়ুকোষে এ পদ্ধতির কার্যকারিতা প্রদর্শিত হয় এবং ২০০৭ সালে জীবিত ইঁদুরের মস্তিষ্কে আলো দিয়ে স্নায়ুকোষের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়। এভাবেই হেগেম্যান ও নাগেলের মৌলিক আবিষ্কার এবং ডাইসেরথের স্নায়ুবিজ্ঞানে তার প্রয়োগ একত্র হয়ে অপ্টোজেনেটিকসের বিকাশ ঘটায়।

বর্তমানে অপ্টোজেনেটিকসের সাহায্যে গবেষকরা স্মৃতি, আবেগ, ঘুম, চলন এবং বিভিন্ন স্নায়বিক ও মানসিক সমস্যার সঙ্গে যুক্ত স্নায়ুপথ নিয়ে পরীক্ষা করতে পারেন। এ প্রযুক্তি রোগের কার্যপ্রণালি বোঝার পাশাপাশি ভবিষ্যতের চিকিৎসা উদ্ভাবনের সম্ভাবনাও তৈরি করছে। দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনা কিংবা শ্রবণ-সহায়ক প্রযুক্তিকে আরও নির্ভুল করার গবেষণাতেও আলোকসংবেদনশীল প্রোটিনের ব্যবহার নিয়ে কাজ চলছে। অবশ্য এসব সম্ভাবনার সব এখনো প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসায় পরিণত হয়নি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত