অবশেষে বিদেশিদের হাতেই গেল এনসিটি

আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০২:১১ এএম

চট্টগ্রাম বন্দরের ‘সোনার ডিম পাড়া হাঁস’খ্যাত এনসিটি টার্মিনালটি পাচ্ছে দুবাইয়ের ডিপি ওয়ার্ল্ড। বিশে^ প্রায় ৬০টির বেশি বন্দর ও টার্মিনাল পরিচালনা করা এই প্রতিষ্ঠানটি আগামী ১৫ বছর পরিচালনা করবে চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে লাভজনক টার্মিনাল এনসিটি (নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল)। এ সময়ের মধ্যে তারা প্রায় ১৫ কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে টার্মিনাল অপারেটরের কাজে। আজ বৃহস্পতিবার ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ মিলনায়তনে চট্টগ্রাম বন্দর ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের মধ্যে এই কনশেসন চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে। এ সময় নৌমন্ত্রী, ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।

পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) অথরিটির মাধ্যমে এনসিটিকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ করা হচ্ছে। এই চুক্তির বিষয়ে জানতে কথা হয় পিপিপি কর্তৃপক্ষের মহাপরিচালক মোহাম্মদ মাহমুদ কবিরের সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চুক্তির শর্ত সম্পর্কে আমরা কিছু জানি না। যেহেতু আমাদের মাধ্যমে এই চুক্তিটি হতে যাচ্ছে তাই আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) বিকেল ৩টায় এর আয়োজন করেছি। বিনিয়োগ ভবনে চুক্তির কার্যক্রম সম্পন্ন হবে।’ চুক্তির শর্তাবলি কে জানে? এই প্রশ্নের জবাবে মাহমুদ কবির বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ চুক্তি নিয়ে নেগোশিয়েশন করেছে এবং ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) এ প্রকল্পের ট্রানজেকশন অ্যাডভাইজর হিসেবে কাজ করেছে। ফলে বন্দর কর্তৃপক্ষই ভালো বলতে পারবে।

চুক্তির বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। পরে কথা হয় নৌ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ জাকারিয়ার সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, বৃহস্পতিবার ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে ১৫ বছরের জন্য চুক্তি হতে যাচ্ছে। এই সময়ের মধ্যে তারা ১৫ কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে এবং পরিচালনাকালে বন্দর কর্তৃপক্ষ কিংবা সরকার কোনো অর্থ খরচ করবে না। সব আর্থিক দায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের। চুক্তির ফলে বন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কারও চাকরিরি যাবে কি না, এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চাকরি যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। আমরা চুক্তির মধ্যে এই ধারাটি যুক্ত করে দিয়েছি। বন্দরের সব কর্মচারীকে রেখেই বন্দর পরিচালনা করতে হবে, বাইরে থেকে শুধু ব্যবস্থাপনার কাজে কাউকে আনতে পারবে প্রতিষ্ঠানটি।

নিয়ন্ত্রণ থাকবে বন্দর কর্তৃপক্ষের হাতে : চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালনার জন্য দুবাইয়ের ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়া হলেও এর নিয়ন্ত্রণ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের হাতে থাকবে বলে মন্তব্য করেন সচিব মোহাম্মদ জাকারিয়া। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল পরিচালনার জন্য এখন যেমন ১২টি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেওয়া হয়েছে, সেভাবে ডিপি ওয়ার্ল্ডকেও দেওয়া হচ্ছে। এতে সমস্যার তো কিছু নেই। পুরো টার্মিনাল পরিচালনা এবং ট্যারিফ থাকবে বন্দরের নিয়ন্ত্রণে।

সৌদি আরবের আরএসজিটিকে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল এবং লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার জন্য ডেনমার্কের এপি মুলারকে দেওয়া হয়েছে। এখন তাদের সঙ্গে কি ডিপি ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতা করবে? এই প্রশ্নের জবাবে মোহাম্মদ জাকারিয়া বলেন, ‘হ্যাঁ, ট্যারিফ যেহেতু একই তাই কোম্পানিগুলোর মধ্যে সার্ভিস নিয়ে প্রতিযোগিতা হবে। যে যত ভালো ও দ্রুত সার্ভিস দেবে আমদানিকারক সেই টার্মিনালে পণ্য নিয়ে যাবে।’

এই চুক্তিতে কি জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষিত রয়েছে? এই প্রশ্নের জবাবে মোহাম্মদ জাকারিয়া বলেন, অবশ্যই জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণ করেই চুক্তিটি করা হচ্ছে। এতে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চর্চা অনুসরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া এই চুক্তির ফলে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজের ওয়েটিং টাইম এবং টার্ন অ্যারাউন্ড টাইম বিদ্যমান সময় থেকে অর্ধেক নামিয়ে আনা হবে। ফলে দ্রুত পণ্য লোডিং ও আনলোডিং হবে এবং এতে লাভবান হবে পুরো দেশের অর্থনীতি। এ ছাড়া বন্দরে প্রতি কনটেইনার হ্যান্ডলিং বাবদ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সর্বনিম্ন ৪০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ৬৭ শতাংশ রাজস্ব পাবে।

চুক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলন চলবে : এদিকে চুক্তির বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা আন্দোলন করছেন। গতকাল বুধবার সন্ধ্যায়ও তারা চট্টগ্রাম বন্দর ভবন এলাকায় মশাল মিছিল করেন। এ সময় আন্দোলনকারীদের নেতা ইব্রাহিম খোকন বলেন, ‘আমরা এই চুক্তির প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় বিক্ষোভ মিছিল করব। আমরা এই কালো চুক্তির প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’

চট্টগ্রাম বন্দরের এই এনসিটি চুক্তি নিয়ে প্রতিবাদ করে আসছে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা পরিষদ। এ বিষয়ে পরিষদের আহ্বায়ক প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, ‘জনমতের বাইরে গিয়ে সরকার এই চুক্তি করতে যাচ্ছে। যারা জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করে তারা বেশি দিন টিকে থাকতে পারে না। আমরা এতদিন চুক্তি স্বাক্ষরের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছি। এখন চুক্তি হয়ে গেলে তা বাতিলের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাব।’

এনসিটি নিয়ে কেন এত আলোচনা? : চট্টগ্রাম বন্দরের চলমান টার্মিনালগুলোর মধ্যে সবচেয়ে লাভজনক টার্মিনাল হলো এনসিটি। ২০০৭ সালে ৭০০ কোটি টাকা খরচ করে নির্মিত এই টার্মিনালে বন্দরের ১৮টি গ্যান্ট্রিক্রেনের মধ্যে ১৪টিই এখানে রয়েছে। ফলে বন্দরের জিসিবি (জেনারেল কার্গো বার্থ) ও সিসিটির (চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল) তুলনায় বেশি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করে এনসিটি। আর সব টার্মিনালই দেশীয় অপারেটর দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। অন্যদিকে সৌদি আরবের রেডসি গেটওয়ে পরিচালনা করছে পিসিটি (পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল)। গত বছর চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনারের ৪৪ শতাংশ এনসিটিতে, ৩৬ শতাংশ জিসিবিতে, ১৬ শতাংশ সিসিটিতে এবং প্রায় ৪ শতাংশ পিটিসিতে হ্যান্ডলিং হয়েছে। আর এজন্যই এনসিটিকে ‘সোনার ডিম পাড়া হাঁস’ বলা হয়ে থাকে এবং তা চট্টগ্রাম বন্দরের আওতায় রাখার দাবি জানিয়ে আসছেন শ্রমিক-কর্মচারীরা।

এর আগে যেসব টার্মিনাল বিদেশিদের দেওয়া হয়েছে : চট্টগ্রাম বন্দরে বর্তমানে চারটি টার্মিনাল চালু রয়েছে। এর মধ্যে জিসিবি সবচেয়ে পুরনো টার্মিনাল। সিসিটি ও এনসিটি সবচেয়ে আধুনিক টার্মিনাল। এই তিনটি টার্মিনাল বর্তমানে দেশীয় অপারেটর পরিচালনা করছে। অন্যদিকে পিসিটি ২০২৩ সাল থেকে পরিচালনা করছে সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে। ২২ বছরের চুক্তিতে তা পরিচালনার জন্য রেড সি গেটওয়েকে দেওয়া হয়। এ ছাড়া ৪৫ বছরের জন্য লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল বরাদ্দ দেওয়া হয় ডেনমার্কের এপি মুলারকে। প্রতিষ্ঠানটি টার্মিনাল নির্মাণের পর পরিচালনা শুরু করবে।

এনসিটি দিয়ে দেওয়া হলে বন্দরের আওতায় থাকবে সিসিটি ও জিসিবি। ইতিমধ্যে সিসিটিও বরাদ্দ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরুর জন্য ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশকে নির্দেশনা দিয়েছে নৌ মন্ত্রণালয়। আর সেটি পেতে যাচ্ছে সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে। বাকি থাকবে জিসিবি।

চেম্বার সভাপতির বক্তব্য : বন্দর কে পরিচালনা করল মুখ্য বিষয় নয় বলে মন্তব্য করেন চিটাগং চেম্বারের প্রেসিডেন্ট আমিরুল হক। তিনি বলেন, দেশের স্বার্থ রক্ষা করে বন্দর কাকে দিয়ে চালাবে সেটা সরকারের ভাবার বিষয় আমাদের নয়। আমরা চাই ব্যবসার সহজীকরণ এবং ব্যবসায়ীরা যাতে কোনো বিড়ম্বনায় না পড়েন। এ ছাড়া পণ্য যাতে দ্রুত আনা-নেওয়া করা যায়। অর্থাৎ আমরা ভালো সার্ভিস চাই। এ বিষয়ে নৌ সচিব মোহাম্মদ জাকারিয়া বলেন, পণ্য লোডিং ও আনলোডিং এবং ব্যবসার সহজীকরণের জন্যই আমরা কাজ করছি। এখন বিশ্বখ্যাত কোম্পানিগুলো সার্ভিস দিলে দ্রুত কাজ হবে এবং এর সুফল দেশবাসী পাবে।

এনসিটি নিয়ে পূর্বের প্রেক্ষাপট : বিদেশি অপারেটরকে এনসিটি দেওয়ার বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চলে আসছে। সর্বশেষ এনসিটি টার্মিনাল নিয়ে বিদেশি অপারেটরের সঙ্গে চুক্তির প্রক্রিয়ার বৈধতা প্রশ্নে করা রিট গত ২৯ জানুয়ারি খারিজ করে দেয় হাইকোর্ট। এরপর থেকেই আন্দোলনের ঘোষণা দেয় বন্দরের জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল এবং যা পরে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদে রূপ নেয়। তাদের আন্দোলনের মুখে অন্তর্বর্তী সরকার বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দুই দিন আগে ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়েছিল এনসিটি চুক্তির বিষয়ে তারা (অন্তর্বর্তী সরকার) এগোবে না। পরবর্তীতে নির্বাচিত সরকার এসে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। গত ৪ জুন নির্বাচিত সরকার এনসিটি ইস্যুতে আলোচনা চালিয়ে যেতে সিদ্ধান্ত নেয় এবং নতুন করে নেগোসিয়েশন কমিটি গঠন করে। আর সেই কমিটি চুক্তির শর্তাবলি চূড়ান্ত করেছে। এরই আলোকে গত ১ অক্টোবর অর্থনীতিবিষয়ক মন্ত্রিসভার মিটিংয়ে খসড়া কনসেশন চুক্তির অনুমোদন পায়। এতে ১৫ বছরের জন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়টি অনুমোদন দেওয়া হয়।

উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়েই দেশের ৯৩ শতাংশ পণ্য পরিবাহিত হয়ে থাকে। এই বন্দরের সবচেয়ে লাভজনক টার্মিনাল হলো এনসিটি টার্মিনাল। এর বাইরে বঙ্গোপসাগরের তীরে হালিশহর সাগর পাড়ে নির্মাণ হতে যাওয়া বে টার্মিনাল ২০৩০ সালের মধ্যে অপারেশনে আসতে পারে। বে টার্মিনালে তিনটি টার্মিনাল নির্মিত হবে। এর মধ্যে একটি ডিপি ওয়ার্ল্ড ও একটি পিএসএস সিঙ্গাপুর নির্মাণ ও পরিচালনা করবে। এ ছাড়া তৃতীয় মাল্টিপারপাস টার্মিনালটি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ পরিচালনার কথা থাকলেও এটিও অন্য কোনো দেশকে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। একইভাবে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরের নির্মাণের পর তা পরিচালনায়ও প্রাইভেট বিনিয়োগকারী আসতে পারে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত