অপেক্ষার প্রহর শেষ হয় না

আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৫২ এএম

খুলনা বিভাগসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ক্যানসার আক্রান্ত রোগীদের অপেক্ষার প্রহর যেন শেষ হওয়ার নয়! খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চত্বরে নির্মাণাধীন অত্যাধুনিক ১৫তলা সমন্বিত ক্যানসার, কিডনি ও হৃদরোগ বিশেষায়িত হাসপাতালটির মূল ভবন ও বেজমেন্টের কাঠামোগত (ইনফ্রাস্ট্রাকচার) কাজ প্রায় শেষ হলেও বাস্তব সুবিধা পেতে রোগীদের দীর্ঘদিন অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে।

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, দুটি বেজমেন্ট ফ্লোর ও ১৫ তলাবিশিষ্ট ভবনের মূল অবকাঠামোগত কাজের প্রায় ৯৮ শতাংশ এবং সার্বিকভাবে ৬৩ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। এখন ভবনের ফিনিশিং ও মেশিনারিজ ইন্সটলেশনের জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এরই মধ্যে ৯টি লিফট ও ১০টি এস্কেলেটরের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। সম্প্রতি প্রায় ৪ হাজার ডাক্তার ও প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীসহ ১২ হাজার বিশেষজ্ঞ জনবল নিয়োগের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছেন, মূল ভবন নির্মাণের কাজ শেষ করে লিনিয়ার এক্সিলারেটরের মতো অত্যাধুনিক রেডিওথেরাপি মেশিন ও অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জাম স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে। একটি পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার হাসপাতাল সচল করতে যে ধরনের বিশেষায়িত মেডিকেল ইকুইপমেন্ট প্রয়োজন তা আমদানিনির্ভর এবং স্থাপন সময়সাপেক্ষ। এ ছাড়া ক্যানসার চিকিৎসায় দক্ষ রেডিওথেরাপিস্ট, অনকোলজিস্ট ও টেকনিশিয়ান সংকটের কারণে হাসপাতালটি পুরোপুরি চালু করতে সময় লাগবে। এখন চিকিৎসা সরঞ্জাম স্থাপন ও বিশেষজ্ঞ জনবল নিয়োগের কাজ চলছে।

প্রকল্পের পরিচালক খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ডা. মো. তৌফিক হাসান ফিরোজ বলেন, এই বিশেষায়িত হাসপাতালটি চালু হলে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরাসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কয়েক কোটি মানুষের উন্নত চিকিৎসার দুয়ার খুলবে। ভবন প্রস্তুত হলেও চিকিৎসা সেবা পাওয়ার মূল অনুষঙ্গÑ আধুনিক যন্ত্রপাতি, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগের প্রক্রিয়া এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। লিনিয়ার এক্সিলারেটরের মতো জটিল ও ব্যয়বহুল রেডিওথেরাপি মেশিন স্থাপন এবং দক্ষ জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া শেষ করে হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করতে আরও অন্তত দুই বছর সময় লাগবে।

গণপূর্ত ও স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এই ভবনে মোট ৪৫০টি শয্যা থাকবে। ক্যানসার ইউনিটে (বেজমেন্ট-২ থেকে ৭ম তলা) ১৮২টি ডেডিকেটেড শয্যা, লিনিয়ার এক্সিলারেটর, সিটি সিমুলেটর, কেমোথেরাপি এবং ব্র্যাকিথেরাপির আধুনিক সুবিধা থাকবে। কিডনি ইউনিটে (৮ম থেকে ১১তম তলা) ১৬৫ শয্যা, আধুনিক ডায়ালাইসিস সুবিধা এবং কিডনি প্রতিস্থাপন অপারেশন থিয়েটার থাকবে। হৃদরোগ ইউনিটে (১২তম থেকে ১৫তম) ১১৫ শয্যা, সিসিইউ, আইসিইউ এবং ক্যাথ ল্যাবসহ সব ধরনের কার্ডিয়াক সার্জারির ব্যবস্থা থাকবে।

গণপূর্ত ও স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে আরও জানা গেছে, ক্যানসার রোগীদের ঢাকামুখী প্রবণতা কমাতে ২০১৯ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চত্বরে ১৫ তলাবিশিষ্ট একটি পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার, কিডনি ও হৃদরোগ চিকিৎসাকেন্দ্রের অনুমোদন দেওয়া হয়। সেই লক্ষ্যে হাসপাতালের বহির্বিভাগের পেছনে ২৩ হাজার ২৫০ দশমিক ৪৬ বর্গমিটার জমি নির্ধারণ করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ভবন নির্মাণের জন্য এমবিপিএল ও এসএনবিপিএল (জেভি) ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গণপূর্ত বিভাগের চুক্তি হয় ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর। ২৮০ কোটি ৬৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ২২টি প্যাকেজে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে। ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়। এরপর ২০২৪ সালের ডিসেম্বর ও ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত দুই দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়। এই সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হতে এখনও অন্তত ২ বছর অপেক্ষা করতে হবে। 

গণপূর্ত বিভাগ খুলনা-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল হাসান বলেন, ‘প্রকল্পের মূল ভবন নির্মাণকাজের ৯৫ শতাংশেরও বেশি সম্পন্ন হয়েছে। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে অবকাঠামোগত কাজ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।’

খুমেক সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যানসার ইউনিটে কোনো রোগী ভর্তি করা যায় না। শুধু ডে-কেয়ার ভিত্তিতে বাইরে থেকে কিনে আনা কেমোথেরাপির ওষুধ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। রেডিওথেরাপি বা আধুনিক পিইটি-সিটি স্ক্যানের মতো অত্যাবশ্যকীয় কোনো প্রযুক্তি এখানে সচল নেই। ফলে ক্যানসারের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে রোগীদের বাধ্য হয়ে ঢাকা কিংবা বিদেশে ছুটতে হচ্ছে।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, খুলনা মেডিকেলের গুরুত্বপূর্ণ এই বিভাগটিতে কোনো রোগীকে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা না থাকায় দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। শুধুমাত্র আউটডোরে চিকিৎসা নিয়েই ফিরে যেতে হয়, যা অত্যন্ত কষ্টকর ও ব্যয়বহুল।

খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, খুলনা ক্যানসার হাসপাতালের কাজের অগ্রগতি অত্যন্ত হতাশাজনক। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অবহেলা এবং সরঞ্জাম আমদানিতে বিলম্বের কারণে কয়েক দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়। কাজের গতি ধীর থাকায় দক্ষিণাঞ্চলের রোগীদের ঢাকা বা ভারতে গিয়ে চড়ামূল্যে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। এই বিশেষায়িত হাসপাতালটি দ্রুত চালু করতে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ব্যয়ের পাশাপাশি চিকিৎসার অভাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রোগীদের প্রাণহানির ঝুঁকি আরও বাড়বে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত