মহা আয়োজনে মহানায়কের বিদায়

আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৫৯ এএম

১৭ আগস্ট ২০০৫। ক্যালেন্ডারের পাতায় সেদিনের দিনটি ছিল বুধবার। হাঙ্গেরির বিপক্ষে মাত্র ১৮ বছর বয়সে বদলি হিসেবে নেমেই মাত্র ৪৫ সেকেন্ডের মধ্যে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়ার সেই অনাড়ম্বর ও নাটকীয় অভিষেকের মধ্য দিয়ে যে অধ্যায় শুরু হয়েছিল, কে জানত সেই তরুণই একদিন চিরতরে বদলে দেবে বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্র? দেখতে দেখতে কেটে গেছে হাজারেরও বেশি বুধবার। সময়ের সেই দীর্ঘ পরিক্রমায় তরুণ লিওনেল মেসি থেকে তিনি হয়ে উঠেছেন ফুটবলের বরপুত্র, মহানায়ক ও সর্বকালের সেরা জাদুকর। আর আজ, দীর্ঘ ২১ বছরের সেই উজ্জ্বল অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে ঠিক তেমনি এক না-চাওয়ার বুধবার এসে হাজির হয়ে গেল বুয়েনস আইরেসের এস্তাদিও মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে।

সেখানে ক্যারিয়ারের শেষ বিকেলে এসেও আলবিসেলেস্তেরা ম্যাচটা জিতল সেই মেসিতে ভর করেই। এ যেন পুরনো অভ্যাস! মেসি থাকলে কি আর কাউকে লাগে? বেনিনের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ৩-০ গোলের এই ম্যাচে দুর্দান্ত এক গোল ও জোড়া অ্যাসিস্টের জাদুকরী পারফরম্যান্সে মেসি রাঙিয়ে নিলেন আন্তর্জাতিক ফুটবলের এই রাজকীয় ও মহা আড়ম্বরপূর্ণ বিদায়বেলা।

ম্যাচ শুরুর বেশ খানিকটা সময় আগে থেকেই বুয়েনস আইরেসের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল এক বুক চাপা আবেগ আর উৎসবের এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধনে। এএফএ ট্রেনিং কমপ্লেক্স থেকে মনুমেন্তালের উদ্দেশে রওনা হওয়া টিম বাসটি যখন মেসির রাজপথ ধরে এগোচ্ছিল, তখন দুই পাশের ফুটপাতে উপচে পড়া হাজারো মানুষের ভালোবাসার প্লাবন দেখে দৃশ্যতই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি; ক্যামেরার লেন্স বন্দি করে তার সিক্ত চোখের কোণ, যে চোখ দুটিতে যুগে যুগে জাদুকরী সব জয়ের স্বপ্ন কেঁপে উঠেছে।

স্টেডিয়ামে পৌঁছানোর পর ঐতিহ্যবাহী ক্লাব রিভার প্লেটের সভাপতি স্তেফানো দি কার্লো তার হাতে তুলে দেন ক্লাবটির সম্মানসূচক সদস্যপদের কার্ড ও বিশেষ স্মারক। এরপর মাঠের লড়াইয়ে কিক-অফের ঠিক আগে ১০ নম্বর লেখা প্রায় ৩০ মিটার দীর্ঘ এক সুবিশাল ‘গ্রেসিয়াস’ (যার অর্থ ধন্যবাদ) জার্সি বিছিয়ে দিতেই মেসির নাম ধরে গ্যালারি থেকে গর্জে ওঠে লক্ষাধিক কণ্ঠের সামষ্টিক গর্জন। সেখানে তিন পুত্রকে হাত ধরে মাঠে প্রবেশ করা মেসি ফাবিও সান্তানার কণ্ঠে ফকল্যান্ডস ব্যানারঘেরা জাতীয় সংগীতের সুরের সঙ্গে আবেগাপ্লুত হৃদয়ে কণ্ঠ মেলান। মেসির আবেগী মন সংগীতের ভাষায় কণ্ঠ মেলাতে পারেননি, তবে আবহটা ছিল তাকে ঘিরেই।

এদিকে স্টেডিয়ামের ক্যামেরার লেন্স যখন ভিআইপি বক্সের দিকে থামাল, সেখানে স্ত্রী আন্তোনেল্লা ও তিন ছেলে থিয়াগো, মাতেও ও সিরোসহ পুরো পরিবার উপস্থিত থেকে এই ইতিহাসের সাক্ষী হলেও এদিনের গ্যালারিতে ছিল এক গভীর ও নিদারুণ শূন্যতা। কেননা সেখানে নেই মেসির সেই প্রিয় মানুষটা। দুই মাস আগে না ফেরার দেশে চলে যাওয়া তার বাবা হোর্হে মেসি ।

এই গভীর আবেগের মধ্যেই অবশ্য শুরু হয়ে গিয়েছিল মাঠের মূল লড়াই, আবেগের গভীরতা এতটাই ছিল যে গল্পের সুরও থেমে যাচ্ছিল সেই মেসিতেই। ম্যাচের প্রথমার্ধে বেনিনের সুসংগঠিত রক্ষণভাগ আলবিসেলেস্তাদের বেশ ভালোই পরীক্ষায় ফেলে দিয়েছিল। দুই দলের আক্রমণগুলো বারবার প্রতিহত হওয়ায় এবং মাঝমাঝি সময়ে তীব্র লড়াইয়ের সুবাদে কোনো গোলের দেখা না পেয়ে গোলশূন্য সমতায় শেষ হয় প্রথমার্ধের খেলা।

তবে ম্যাচের দৃশ্যপট নাটকীয়ভাবে বদলে যায় দ্বিতীয়ার্ধের বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই। ম্যাচের ৪৮ মিনিটে মেসির নিখুঁত এক কর্নার কিক থেকে নিকোলাস ওতামেন্দি দুর্দান্ত এক শটে বল জালে জড়িয়ে ডেডলক ভাঙেন। এই ওতামেন্দিও এই ম্যাচে দিয়েই নিজের আন্তর্জাতিক অধ্যায়ের ইতি টানছেন, যা এই গোলটিকে এক অন্যরকম ঐতিহাসিক মাত্রা দেয়।

এর মিনিট ১২ পরে আবারও মেসির জাদু। বাম দিক থেকে মেসি বল বাড়িয়ে দেন তরুণ নিকো পাজের কাছে। তাকে পাস দিয়ে মেসি পাশ কাটিয়ে যাচ্ছিলেন ডি-বক্সের কাছাকাছি, সেখান থেকে বল বাঁকিয়ে শট নিয়ে মেসি যে কত গোল করেছেন তার হিসাব নেই! গোলটাও হলোও সেভাবেই, কিছুক্ষণের জন্য মনে হচ্ছিল গোলটা কি মেসি করলেন? না নিকো সেই পাস থেকেই বাঁকানো শটে বলটা জড়িয়ে দিলেন জালে, যেন মেসিকে বলে দিলেই, আপনার দেখানো পথেই আমরা এগোনো শিখছি। এদিকে ২০৮তম ম্যাচে মেসির অ্যাসিস্ট সংখ্যা থামল ৭০-এ।

এরপর ম্যাচের ৭১ মিনিটে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। অগাস্টিন গিয়াই বেনিনের বক্সে ফাউলের শিকার হলে আলবিসেলেস্তেরা আদায় করে নেয় পেনাল্টি। সেখানে স্পট কিক নিতে মেসি বল যখন সাদা দাগের ওপর বসল, তখন গোটা স্টেডিয়ামের বুক চিরে বয়ে গেল এক পিনপতন নীরবতা, যেন সমগ্র ফুটবল বিশ্বই নিঃশ্বাস আটকে আছে। বেনিনের গোলরক্ষক ভুল দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগেই বুলেট গতির জোরালো শটে বল গিয়ে আশ্রয় নেয় জালের ওপরের কোনায়, যা ছিল মেসির বর্ণিল আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ১২৬তম গোল! গোল করার সঙ্গে সঙ্গেই আবেগাপ্লুত সতীর্থরা ছুটে এসে তাদের মহানায়ককে মাঝমাঠে ঘিরে ধরে মেতে ওঠেন বাঁধভাঙা উল্লাসে। ম্যাচের একদম অন্তিম মুহূর্তে ৯৫ মিনিটে একটি ফ্রি-কিক পেলেও তা ক্রসবারের ওপর দিয়ে চলে যায়, আর তার ঠিক পরপরই বেজে ওঠে ম্যাচ শেষের সেই অবধারিত বাঁশি।

রেফারির শেষ বাঁশি কেবল একটি ম্যাচের সমাপ্তি টানেনি, বরং তা স্তব্ধ করে দিয়েছিল মনুমেন্তালের উপস্থিত প্রায় লক্ষাধিক প্রাণকে। তবে সেই জমাট বাঁধা বিষণœতা দীর্ঘস্থায়ী হতে দেয়নি আধুনিক প্রযুক্তির আলো ও সুরের মূর্ছনা। খেলার সমাপ্তির ঠিক পরপরই মনুমেন্তালের আকাশ এক নিমেষে রূপ নেয় জাদুকরী আলোর প্রদর্শনীতে, যেখানে ড্রোনের নিখুঁত কারুকাজে ভেসে ওঠে ‘গ্রেসিয়াস লিও’।

এরপর উদযাপনের আবহকে আরও মোহনীয় করে তুলতে গায়িকা সোলেদাদ পাস্তোরুত্তি তার জনপ্রিয় গান ‘ব্রিনদিস’ পরিবেশন করেন; আর সেই সুরের মাঝে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে চারপাশের পরিবেশ উপভোগ করতে দেখা যায় মেসিকে। এই মহা আয়োজনে ফুটবলের জাদুকরের অধ্যায়টা হয়তো ফুরোল, তবে মাঠের ঘাস থেকে আকাশের বুক, সবকিছু মিলিয়ে এক অপরূপ আলোয় লেখা হয়ে রইল এক কথা: সবুজ মাঠের রূপকথা হয়তো ফুরোল, কিন্তু জাদুকরের অমরত্ব রয়ে গেল চিরকালীন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত