এ বছর নোবেল শান্তি পুরস্কার পেলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত দক্ষিণ আফ্রিকার আইনজীবী নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই। বাংলাদেশ সময় গতকাল বিকেলে নরওয়ের অসলোতে নোবেল ইনস্টিটিউটে এক সংবাদ সম্মেলনে শান্তিতে পুরস্কারজয়ী হিসেবে ৮৫ বছর বয়সী এই মানবাধিকার কর্মীর নাম ঘোষণা করেন নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান ইয়োরগেন ওয়াটনে ফ্রিডনেস।
পিল্লাই আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ-সংক্রান্ত মামলায় বিচারকের দায়িত্বে আছেন। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ মূলত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়নকেন্দ্রিক। ২০১৭ সালে সেনা অভিযান শুরুর পর কয়েক লাখ রোহিঙ্গা জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশসহ মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে পাড়ি জমায়। এ নৃশংসতাকে গণহত্যা আখ্যা দিয়ে ২০১৯ সালের নভেম্বর আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মামলা করে গাম্বিয়া।
নোবেল কমিটির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, নাভি পিল্লাই এমন একজন ব্যক্তি, যিনি অসাধারণ সাহস ও সততার সঙ্গে সমন্বিত বৈশ্বিক আইনি ব্যবস্থা গড়ে তোলার পথ দেখিয়েছেন। যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। পিল্লাই বিভিন্ন রাষ্ট্র ও নেতাদের জবাবদিহির আওতায় এনেছেন। সহিংসতা ও সংঘাতের শিকার মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছেন। দায়িত্ব পালনকালে তিনি বারবার আইনের শাসন মেনে চলার ক্ষেত্রে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের দায়িত্বের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
নোবেল পুরস্কারের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, আইনের সর্বজনীন নীতির প্রতি অটল আস্থা এবং দৃঢ় নৈতিক অবস্থান নাভি পিল্লাইয়ের দীর্ঘ কর্মজীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তার কর্মজীবনের শুরুতে তিনি বর্ণবাদী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করা নেলসন ম্যান্ডেলা ও অন্যদের পক্ষে আইনি লড়াইয়ে অংশ নেন। পরে তিনি সমসাময়িক সময়ের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক আদালতের মামলায় বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন। তার কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়জুড়েই আইনের শাসনের প্রতি অঙ্গীকারের প্রতিফলন ঘটেছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্ট, রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতেও বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন পিল্লাই। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারও ছিলেন। সম্প্রতি অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখ-বিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
রীতি অনুযায়ী, আগামী ১০ ডিসেম্বর অসলোতে জমকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ২০২৬ সালের এই নতুন নোবেলজয়ীর হাতে শান্তি পুরস্কারের মেডেল ও অর্থ তুলে দেওয়া হবে।
নাভি পিল্লাই নোবেল পুরস্কার পাওয়ার খবর পান ক্রিস্টফ নামের একজনের কাছ থেকে। নাভি পিল্লাই বলেন, ক্রিস্টফ নামের একজন তাকে তার পড়ার টেবিল থেকে ডেকে নিয়ে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার কথা জানান। কিছু লোকজনও জড়ো হয়ে তাকে অভিনন্দন জানাতে থাকেন। তখন তাদের উদ্দেশে ধন্যবাদ জানাতে নাভি পিল্লাই বলেনÑ ‘এটি নিশ্চয়ই একটি কৌতুক!... আপনাদের এই করতালি আমার কাছে অনেক মূল্যবান। তবে একজন আইনজীবী ও বিচারক হিসেবে আমি বিষয়টি যাচাই করে নিতে চাই।’ নাভি পিল্লাই কৌতুক করে বলেন, ‘আপনারা যদি আরেকটু বেশি তালি দেন, তবে আমি হয়তো এই পুরস্কারটি ট্রাম্পের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারি।’
উল্লেখ্য, গত বছর শান্তিতে নোবেল পুরস্কার ভেনিজুয়েলার বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে শান্তি পুরস্কারের পদক উপহার দেন।
নোবেল পুরস্কারের ওয়েবসাইটে বলা হয়, ১৯৪১ সালের সেপ্টেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত একটি পরিবারে জন্ম নেন নাভি পিল্লাই। আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষে তিনি বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা ব্যক্তিদের পক্ষে আইনি লড়াই শুরু করেন। ১৯৬৭ সালে ডারবানে নিজের আইনি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন তিনি। নাভি পিল্লাই প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী হিসেবে আইন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৮৮ সালে সেখান থেকে আইন বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৯৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টের বিচারক নিযুক্ত হন পিল্লাই। তিনিই প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী, যিনি হাইকোর্টের বিচারক হিসেবে নিযুক্ত হন।
চার বছর পর নাভি পিল্লাই রুয়ান্ডার জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটিআর) বিচারক ও সভাপতি হন। সেখানে যৌন সহিংসতা, ধর্ষণ ও ঘৃণার ছড়ানোর মতো কর্মকা- কীভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার অভিযোগে বিচারের আওতায় আসতে পারে, তা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন তিনি। পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) বিচারক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন পিল্লাই। ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার (ওএইচসিএইচআর) ছিলেন।
ইসরায়েলে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখ- নিয়ে জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের সভাপতি হিসেবে ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন পিল্লাই। ২০১৯ সালে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ-সংক্রান্ত মামলায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) অস্থায়ী বিচারক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।