ঢাকা উত্তর বিএনপির কমিটি গঠন নিয়ে তোড়জোড়

আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৪৯ এএম

ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির নতুন কমিটি গঠন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ এই সাংগঠনিক ইউনিটের শীর্ষ দুই পদে কারা দায়িত্ব পাচ্ছেন, তা নিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক দক্ষতা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ এবং স্বচ্ছ ভাবমূর্তি সামনে রেখে নেতৃত্ব নির্বাচনের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। দলটির একাধিক দায়িত্বশীল নেতা দেশ রূপান্তরকে এ কথা জানিয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দেশ রূপান্তরকে বলেন, দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে নতুন কমিটি উপহার দেবেন। এ জন্য একটু সময় লাগতে পারে। দলের যারা ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতা রয়েছেন তাদের মধ্য থেকে এই কমিটি দেওয়া হবে।

মহানগর উত্তরের একাধিক দায়িত্বশীল নেতা বলেন, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির নতুন কমিটিতে সদ্য বিলুপ্ত কমিটির আহ্বায়ক আমিনুল হক, সদস্য সচিব মোস্তফা জামানের নাম গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসছে। পাশাপাশি আলোচনায় রয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক জ্যেষ্ঠ সদস্য আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ার, এসএম জাহাঙ্গীর হোসেন, মোস্তাফিজুর রহমান সেগুনসহ আরও কয়েকজন। তবে শীর্ষ দুই পদে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিষয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।

সভাপতি পদে আলোচনায় থাকা আমিনুল হক যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর যুব প্রশিক্ষণ, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে স্টেডিয়াম ও মিনি মাঠ নির্মাণ, খেলোয়াড়দের জন্য ক্রীড়া কার্ড এবং মাদকমুক্ত যুবসমাজ গঠনে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছেন তিনি। ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ আয়োজনের মাধ্যমেও দেশব্যাপী সাড়া জাগিয়েছে তার উদ্যোগ।

মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা-ভাঙচুর, চাঁদাবাজি এবং দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে কড়া পদক্ষেপ ও মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় মো. আমিনুল হককে আহ্বায়ক এবং মো. মোস্তফা জামানকে সদস্যসচিব করে গঠিত ৫১ সদস্যের আগের কমিটি গত ৩০ সেপ্টেম্বর বিলুপ্ত করা হয়।

দলীয় সূত্রের দাবি, নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে কেবল রাজনৈতিক পরিচিতি কিংবা অতীতের পদ-পদবি নয়, বরং একজন নেতার ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি, সাংগঠনিক কর্মকা-, সামাজিক সম্পৃক্ততা, আর্থিক ও নৈতিক স্বচ্ছতা এবং দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় ভূমিকা বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে। সরকার পরিচালনার পাশাপাশি দলীয় নেতাকর্মীদের আচরণ ও কর্মকা-ের মাধ্যমে জনসমর্থন ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ থাকায় নেতৃত্ব নির্বাচনে এবার বাড়তি সতর্কতার প্রয়োজনীয়তাও আলোচনায় রয়েছে। এ ছাড়া, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদ্য সাবেক সদস্য সচিব মোস্তফা জামানকে ঘিরে নতুন কমিটির নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সাধারণ নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মতে, মহানগর উত্তর বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনায় তার পূর্ব অভিজ্ঞতা এবং বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগকে মূল্যায়নের সুযোগ রয়েছে। তার নেতৃত্বে সংগঠনিক যোগাযোগ বজায় রাখা, কর্মীদের সমস্যা শোনা, বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সমন্বয় করা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দায়িত্বশীল থাকা এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন মাঠ পর্যায়ের নেতারা। মোস্তফা জামানের ব্যাপারে নেতাকর্মীদের বক্তব্য নতুন কমিটি গঠনের সময় তার দায়িত্ব পালন, সামাজিক কর্মকা-ে সম্পৃক্ততা এবং স্থানীয় পর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

তার রাজনৈতিক কর্মকান্ড ও সামাজিক সম্পৃক্ততার মূল্যায়ন করতে হলে নির্দিষ্ট কর্মসূচি, সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনের রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যও বিবেচনায় আনা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের আলোচনায় মোস্তফা জামানের নাম উঠে আসা থেকে বোঝা যায়, সদ্য বিলুপ্ত কমিটির নেতৃত্বের অভিজ্ঞতাকে পুরোপুরি উপেক্ষা না করে পুনর্মূল্যায়নের প্রশ্নটি দলীয় অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

মোস্তফা জামানের ব্যাপারে সাধারণ মানুষের আরেকটি বক্তব্য হলো নেতৃত্ব নির্বাচনে ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি ও নৈতিক স্বচ্ছতার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া দরকার। তাদের মতে, যাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অনৈতিক কর্মকান্ডের অভিযোগ নেই, তাদের ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনের সুযোগ ও সক্ষমতা বিবেচনা করা যেতে পারে।

ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির মতো বৃহৎ সাংগঠনিক ইউনিটে নেতৃত্বের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো রাজনৈতিক কর্মসূচির বাইরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নাগরিক সমস্যা, সামাজিক সহায়তা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনের প্রতি দায়িত্বশীলতা একজন নেতার জনসম্পৃক্ততার গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

মোস্তফা জামানের রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকান্ড মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও এই বিষয়গুলো সামনে আসতে পারে। সাধারণ নেতাকর্মী ও ব্যক্তিদের মতে, তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ, স্থানীয় পর্যায়ে সাংগঠনিক সম্পর্ক এবং সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব গড়ে তোলার সক্ষমতা নতুন কমিটিতে দায়িত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে বিবেচ্য হওয়া উচিত।

দলীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, নতুন কমিটির শীর্ষ পদে দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে যোগ্যতা, সাংগঠনিক সক্ষমতা ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তি যাচাইয়ের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। তার দাবি, সম্ভাব্য নেতাদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মকা- সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ এবং বিভিন্ন দিক যাচাইয়ের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আলোচনা রয়েছে।

ওই সূত্রের ভাষ্য, পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের আগে সম্ভাব্য নেতৃত্বের বিষয়ে তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের জন্য তিনটি পৃথক গ্রুপ কাজ করছে। এসব গ্রুপের কাজের উদ্দেশ্য হিসেবে তিনি যোগ্য, গ্রহণযোগ্য ও বিতর্কমুক্ত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার কথা উল্লেখ করেছেন। তবে এই তথ্যের বিষয়ে বিএনপির কেউ আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে বিষয়টি নিশ্চিত করে একটি সূত্র জানায়, দলীয় রাজনীতিতে এ ধরনের যাচাই-বাছাই একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং এটি করা হয় সংগঠনের ভাবমূর্তি রক্ষা ও দায়িত্বশীল নেতৃত্ব নির্বাচনের জন্য।

সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় থাকা আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ারও মহানগর উত্তর বিএনপির নতুন নেতৃত্বের সমীকরণে রয়েছেন। সদ্য বিলুপ্ত কমিটিতে জ্যেষ্ঠ সদস্য হিসেবে তার অবস্থান এবং সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিজ্ঞতা নতুন দায়িত্বের আলোচনায় তার নাম আসার প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে।

সাধারণ নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মতে, মহানগর উত্তর বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো সম্পর্কে অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন নেতাদের মধ্য থেকে দায়িত্ব বণ্টন করলে সংগঠনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সহজ হতে পারে। তবে সাধারণ সম্পাদক পদে চূড়ান্ত বিবেচনায় আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ারের সাংগঠনিক সক্ষমতা, তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ, নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা এবং দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় ভূমিকা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

সূত্রটি আরও জানায়, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির নতুন কমিটি গঠনের প্রশ্নটি কেবল দুটি পদে কারা আসবেন, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মহানগরের থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে সংগঠনকে সক্রিয় রাখা, নেতাকর্মীদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো, জনসম্পৃক্ততা জোরদার করা এবং দলীয় পরিচয়ের অপব্যবহার রোধ করাও নতুন নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হবে।

এ ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ নেতাদের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে সক্রিয় ও গ্রহণযোগ্য কর্মীদের মূল্যায়ন করা হবে। একই সঙ্গে শীর্ষ নেতৃত্ব এমন একটি কাঠামো গড়ে তুলতে চায় দল ও নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে যেখানে দায়িত্ব বণ্টন হবে যোগ্যতা অনুযায়ী এবং সাংগঠনিক জবাবদিহি থাকবে কার্যকর।

ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির নতুন কমিটি নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকলেও সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে কারা দায়িত্ব পাবেন, তা এখনো অনিশ্চিত। সভাপতি পদে সদ্য সাবেক সদস্য সচিব মোস্তফা জামানকে ঘিরে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে এবং সাধারণ সম্পাদক পদে আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ারের নাম আলোচনায় থাকলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। কারণ নেতা নির্ধারণের ভিত্তি হিসেবে সাধারণ নেতাকর্মী ও সমর্থকরা সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা, সামাজিক সম্পৃক্ততা ও ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির বিষয়গুলো সামনে আনলেও এ ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত