স্মৃতিতে সতত তিনি

আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৫০ এএম

‘মাজহার, জেগে আছো? কথা বলা যাবে? অনেক দিন কথা হয় না!’

রাত বারোটা থেকে দুটার মধ্যে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্যারের পাঠানো এমন অসংখ্য বার্তা এখনো আমার ফোনের ইনবক্সে জমা আছে। আমারও যখন কথা বলতে ইচ্ছে হতো, লিখতাম ‘স্যার,  জেগে আছেন? কথা বলতে চাই।’

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ফিরতি মেসেজ ‘আছি’, ‘ফোন করো।’

কখনো আবার মজা করে ‘আভি!’

অতিমারির কাল থেকে এভাবেই স্যারের সঙ্গে বেশির ভাগ সময়ে কথা হতো, রাত বারোটার পর। প্রায় প্রতিদিন। আজ কতজন চলে গেলেন? দেশের কভিড পরিস্থিতি কেমন? পরিচিত কে কে আক্রান্ত হলেন এবং তাদের সর্বশেষ আপডেট। এসব নানা বিষয়ের পাশাপাশি ভাবির জন্য অসম্ভব টেনশন করতেন স্যার। ভাবি ক্যানসার সারভাইবাল বলে তিনি আক্রান্ত হলে কী অবস্থা হবে এরকম রাজ্যের চিন্তায় স্যার উদ্বিগ্ন থাকতেন। কভিড-পরবর্তী সময়ে প্রতিদিন না হলেও প্রায়ই কথা হতো।

কভিডের পরে গভীর রাতের আলাপচারিতা কিছুটা কমলেও সম্পর্কের উষ্ণতা একটুও কমেনি। প্রয়োজন হলে, আর প্রয়োজন না হলেও, মাঝেমধ্যেই স্যারের বার্তা আসত, অথবা আমিই লিখতাম।

রাতের নীরবতা ভেঙে স্যারের সেই পরিচিত গলা, আজও মনে হয়, যেন ঠিক শুনতে পাই।

স্যার রাত জেগে লিখতেন, ক্লাসের খাতা দেখতেন। বলতেন, ‘দিনে এসব কাজ করার সময় পাই না।’ আমারও লেখালেখি যৎসামান্য যা করি সেটা রাতেই। দিনে কোনো কাজে স্যারকে ফোন করলেও বলতেন, ‘মাজহার, রাতে কথা বলি!’

যদি বলতাম, ‘স্যার, বিষয়টি জরুরি। এখনই বলতে হবে।’ স্যার বলতেন, ‘বলো, দ্রুত বলো।’

দিন ছিল স্যারের মূল কাজের সময়। একটা মুহূর্ত তিনি বসে থাকতেন না। সব সময়ই

থাকতেন একটা গতির মধ্যে। সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের শিক্ষক ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী প্রিয় ছাত্রকে স্মরণ করতে গিয়ে বলেন, ‘মনজুরের হাঁটা দেখলে মনে হয় সে একটা কাজ শেষ করে যেন আরেকটা কাজের জন্য ছুটে চলেছে।’ মেসেজ না দিয়ে সরাসরি কখনো স্যার বা আমি কেউই ফোন করতাম না একে অন্যকে, দু-একটা ব্যতিক্রম ছাড়া। গত অক্টোবরের পর স্যারের ফোন থেকে আর খুদে বার্তা আসে না। আর আমাদের ফোনে কথা হয় না।

৩ অক্টোবর রাত ১.১৬ মিনিটে খুদে বার্তা ছাড়াই সরাসরি ফোন করলেন স্যার। খুবই এক্সাইটেড তিনি। প্রয়োজনীয় কিছু কাগজ খুঁজে পাচ্ছিলেন না। হঠাৎ সেটা পেয়ে ফোন করে বলেন, ‘মাজহার, গুড নিউজ। আমি ওই কাগজগুলো পেয়েছি। কাল তোমাকে ফটোকপি করে দেব।’

আমি বললাম, ‘স্যার, আমি এসে ফটোকপি কপি করে আপনাকে অরিজিনালগুলো ফেরত দিয়ে যাব।’

স্যার বললেন, ‘না, আমি সকালে ইউল্যাবে যাব। আমাদের ওখানে ভালো ফটোকপির ব্যবস্থা আছে। আমি কপি করে এনে তোমাকে খবর দিলে এসে নিয়ে যেয়ো।’

আমি আর কথা বাড়ালাম না। এরপর আরও কিছু বিষয় মিলিয়ে ছয় মিনিট কথা হয় সেদিন এবং এটাই যে আমাদের রাতের শেষ কথোপকথন হবে কে জানত!

লেখক: সম্পাদক, প্রকাশক ও নির্মাতা।

অন্যপ্রকাশ-এর প্রতিষ্ঠাতা।

পুরো লেখা দেশ রূপান্তরের অনলাইনে পড়ুন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত