নদীভাঙনের হুমকিতে পড়েছে নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার হরণী ইউনিয়নের বয়ারচর চেয়ারম্যানঘাটের ঐতিহ্যবাহী মাছের আড়ৎ। বর্ষা মৌসুমে মেঘনা নদীর প্রবল ঢেউয়ের আঘাতে ঘাটের একাংশ ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের মুখে ঘাটের ১৫টি দোকান অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ভাঙন এগিয়ে এসেছে মূল বাজারের দিকে। এতে ঘাটকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সহস্রাধিক দোকানের মালিক, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
হাতিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকে মেঘনা নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন বয়ারচর চেয়ারম্যানঘাট সুবর্ণচর উপজেলার সঙ্গে সংযুক্ত। নোয়াখালীর দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ এই মাছের আড়তে দেশের বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকার হাজার হাজার ছোট-বড় ট্রলার মেঘনা নদী ও বঙ্গোপসাগর থেকে মাছ ধরে এনে বিক্রি করে। গত দুই দশকে মাছ বেচাকেনাকে কেন্দ্র করে ঘাটটি একটি বিশাল বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার পাইকাররা এখান থেকে মাছ কিনে নিয়ে যান। নৌ ও সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা ভালো হওয়ায় ঘাটটিতে মাছের আমদানি-রপ্তানিও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হয়ে থাকে।
উপজেলার হরণী ইউনিয়নের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে অবস্থিত এই ঘাট প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে ভোলা, মনপুরা, বরিশাল ও চাঁদপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা জেলেদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে। তবে সাম্প্রতিক তীব্র নদীভাঙন ঘাটটির অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে। চলতি বর্ষা মৌসুমে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া ও প্রবল ঢেউয়ের কারণে ঘাটের একাংশ নদীতে বিলীন হয়েছে। এখন ভাঙন মূল বাজারের দিকে এগিয়ে আসায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বসতবাড়ি ও অন্যান্য স্থাপনা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন স্থানীয়রা। একদিকে বসতভিটা, অন্যদিকে জীবিকা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হারানোর আশঙ্কায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তাঁরা।
চেয়ারম্যানঘাটের মাছ ব্যবসায়ী শাহেদ হোসেন জানান, বর্ষা মৌসুমে এই ঘাটে প্রতিদিন প্রায় ৫০ কোটি টাকার মাছ বিক্রি হয়। জেলা সদরের সঙ্গে উন্নত সড়ক যোগাযোগ থাকায় ট্রাকে করে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এসব মাছ রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো সম্ভব হয়।
তিনি বলেন, চাঁদপুর ও বরিশালসহ বিভিন্ন এলাকার জেলেরা আগের মতো দূরবর্তী বাজারে মাছ নিয়ে যান না। সেখানে মাছ নিয়ে যেতে জ্বালানি খরচ বেশি পড়ে। তাই তাঁরা সাগর থেকে মাছ ধরে সহজেই চেয়ারম্যানঘাটে এসে বিক্রি করেন। এরপর বরফ সংগ্রহ করে আবার সাগরে ফিরে যান। প্রতিদিন শতাধিক ট্রলার এই ঘাটে আসা-যাওয়া করে। এভাবেই গত ২০ বছরে ঘাটটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
শাহেদ হোসেন আরও জানান, ঘাট এলাকায় প্রায় সহস্রাধিক পাকা ও আধাপাকা দোকানঘর রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে কয়েক হাজার মানুষ জীবিকা নির্বাহ করেন। এ ছাড়া এখানে পুলিশ ফাঁড়ি, বরফকলসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে। হঠাৎ নদীভাঙন শুরু হওয়ায় সবার মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া কিংবা পুনরায় স্থাপন করা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তাঁরা।
ঘাটের চায়ের দোকানি নবির উদ্দিন জানান, তাঁর তিন ছেলে মাছঘাটের শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। বয়সের কারণে তিনি নিজেই একটি চায়ের দোকান চালিয়ে পরিবারের খরচ মেটান। ঘাটের পূর্ব পাশে বেড়িবাঁধের ওপর তাঁর বসবাস। পরিবারের আট সদস্যকে নিয়ে সেখানেই থাকেন তিনি।
নবির উদ্দিন বলেন, নদীভাঙনের কারণে ঘাটটি এখন হুমকির মুখে। ঘাট ভেঙে গেলে পরিবারের সদস্যদের কর্মস্থল হারানোর পাশাপাশি তাঁদের বসতভিটাও হারাতে হবে। এই দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাঁর। ষাটোর্ধ্ব এই বৃদ্ধের আশঙ্কা, নদীভাঙনে সব হারালে পরিবার নিয়ে কোথায় আশ্রয় নেবেন, তা তাঁর জানা নেই।
চেয়ারম্যানঘাটের ‘সাদিয়া ফিশ এজেন্সি’র পরিচালক বাবুল উদ্দিন জানান, নদীভাঙন ক্রমেই বাজারের দক্ষিণ প্রান্তের দিকে এগিয়ে এসেছে। মাছ বিক্রির জন্য বাজারের পাশে নৌকা নোঙর করলে নদীর প্রবল ঢেউয়ের কারণে সেগুলো টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। গত বছর বাজারের মূল শেডের একাংশ ভেঙে যাওয়ায় ১০ থেকে ১৫টি মাছের গদি অন্যত্র সরিয়ে নিতে হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে প্রবল বাতাসের কারণে মাছ কেনাবেচাও ব্যাহত হয়।
বয়ারচর চেয়ারম্যানঘাট মাছ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি সাহেদ উদ্দিন বলেন, ঘাটটি নদীভাঙন থেকে রক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একাধিকবার আবেদন করেও কার্যকর কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি। চলতি বর্ষা মৌসুম শেষে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে আগামী বছর থেকে এখানে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
তিনি আরও বলেন, এই ঘাট থেকে সরকার প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব পায়। মাছের আড়তের পাশাপাশি এখানে রয়েছে ফেরিঘাট ও সি-ট্রাকঘাট। হাতিয়ার মূল ভূখণ্ডে পণ্য পরিবহনের একটি বড় অংশ এই ঘাটের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। সম্প্রতি ফেরিঘাটকে কেন্দ্র করে সরকার যাত্রীছাউনিসহ বেশ কয়েকটি স্থাপনা নির্মাণ করেছে। কিন্তু নদীভাঙনের কারণে এসব স্থাপনাও এখন ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
এ বিষয়ে নোয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী জামিল উদ্দিন পাটোয়ারী বলেন, সম্প্রতি জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলার মাধ্যমে ঘাটের কিছু অংশে নদীভাঙন ঠেকানো সম্ভব হয়েছে। তবে স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধে ব্লক বাঁধ নির্মাণের জন্য একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা গেলে ঐতিহ্যবাহী এই ঘাট রক্ষা করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।