এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন। তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এমন একটি কর্মপদ্ধতি তৈরি করা হবে, যাতে কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়া শিক্ষার্থীদের মেধা ও সৃজনশীলতার মূল্যায়ন করা যায়। এসব শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ হওয়ার প্রয়োজন নেই। তাদের জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থান ও ক্যারিয়ারের সুযোগ তৈরি করবে সরকার।
শনিবার (১০ অক্টোবর) দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘চ্যালেঞ্জড স্টুডেন্টস কনভেনশন ২০২৬’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। গণস্বাক্ষরতা অভিযান ও প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ যৌথভাবে এ সম্মেলনের আয়োজন করে।
মাহ্দী আমিন বলেন, শিক্ষার্থীদের দক্ষতা ও যোগ্যতা বাড়াতে যাদের যে ধরনের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন, সরকার সেই ব্যবস্থা করবে। এ লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় শিক্ষামন্ত্রী এবং বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও সচিবদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি স্থায়ী কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, যেসব শিক্ষার্থীর কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণে আগ্রহ রয়েছে, তাদের নিজ নিজ এলাকার টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার ও বিভিন্ন কারিগরি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। কারও ভালো ব্যবসায়িক ধারণা থাকলে তাকে ক্ষুদ্র পরিসরে প্রাথমিক তহবিলের ব্যবস্থাও করে দেওয়া যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে দক্ষ জনশক্তির চাহিদার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, সরকার তৃতীয় ভাষা শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। জাপানি, কোরীয়, চীনা কিংবা ইউরোপের কোনো দেশের ভাষা তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে শিখতে পারলে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়তে পারে। এসএসসির পর এইচএসসি ও উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেও যেখানে কর্মসংস্থানের শতভাগ নিশ্চয়তা নেই, সেখানে ভাষা শিক্ষা ও স্বল্পমেয়াদি কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দ্রুত আত্মনির্ভরশীল হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, এসএসসির পর এইচএসসি এবং স্নাতক সম্পন্ন করেও অনেকের কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয় না। কিন্তু ভাষা শিক্ষা ও তিন থেকে ছয় মাস মেয়াদি কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অনেক শিক্ষার্থী সরাসরি কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে।
এসএসসিতে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের পুনরায় পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ নিয়েও সরকার ইতিবাচকভাবে ভাবছে বলে জানান মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, অনেক শিক্ষক ও অভিভাবক প্রস্তাব দিয়েছেন, এক বছর অপেক্ষা না করিয়ে তিন মাসের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ করা যায় কি না, বিশেষ করে যে বিষয়ে শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে, শুধু সেই বিষয়ে। বিষয়টি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করার আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসবে বলে তিনি আশাবাদী।
একটি সরকার দেশ ও জনগণের জন্য কাজ করে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন বলেন, জনগণের নির্বাচিত ও শিক্ষাবান্ধব সরকার হিসেবে শিক্ষার্থীদের স্বার্থে যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সরকার সচেষ্ট। প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন, যারা জিপিএ-৫ বা গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে, তাদের প্রতি রাষ্ট্রের যেমন দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি যারা প্রত্যাশিত ফল পায়নি কিংবা কোনো বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে, তাদের প্রতিও রাষ্ট্রের সমান দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের ফল খারাপ হওয়ার পেছনে শুধু মেধার ঘাটতি দায়ী নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর পেছনে পারিবারিক ও আর্থিক অসংগতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষের অভাব, পরীক্ষার আগে অসুস্থতা কিংবা পারিবারিক সংকটের মতো বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। সরকার বিষয়টি শুধু ফলাফলের ভিত্তিতে বিবেচনা করে না। শিক্ষকসংকট থাকলে শিক্ষক নিয়োগ, শ্রেণিকক্ষের সংকট থাকলে অবকাঠামো নির্মাণ এবং আর্থিক অসংগতি থাকলে সহায়তা নিশ্চিত করাই সরকারের দায়িত্ব।
পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া শিক্ষার্থীদের হতাশ না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জীবনে চলার পথে সাময়িকভাবে পিছিয়ে পড়া অস্বাভাবিক নয়। এসএসসি কিংবা এইচএসসিতে ভালো ফলাফল করলে জীবনে সফল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়তে পারে। তবে ভালো ফলাফলই ভবিষ্যৎ সাফল্যের নিশ্চয়তা নয়। একইভাবে পরীক্ষায় আশানুরূপ ফল না করেও অনেকে জীবনে সফল হন। এসএসসিতে সাফল্য মানেই জীবনের চূড়ান্ত সাফল্য নয়, আর কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়া মানেই জীবনের ব্যর্থতা নয়।
তিনি আরও বলেন, অনেক শিক্ষার্থী একটি বিষয়ে অকৃতকার্য হলেও বাকি বিষয়গুলোতে ভালো ফল করেছে। একটি বিষয়ের ফল কখনোই পুরো জীবন নির্ধারণ করতে পারে না। শিক্ষার্থীদের মধ্যে কেউ খেলাধুলায়, কেউ সংস্কৃতিতে, কেউ বিজ্ঞানের কোনো বিষয়ে উদ্ভাবনে, আবার কেউ ব্যবসায়িক পরিকল্পনায় দক্ষ হতে পারে। একটি বিষয়ে খারাপ ফলের কারণে তাদের অন্য মেধা, সৃজনশীলতা ও মননশীলতা নষ্ট হয়ে যায় না।
শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস ধরে রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে মাহ্দী আমিন বলেন, পৃথিবীতে অনেক বড় আবিষ্কারক, উদ্যোক্তা, শিল্পী, সংস্কৃতিসেবী ও খেলোয়াড় রয়েছেন, যাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় সাফল্য খুব বেশি ছিল না। তাই শুধু সনদের ভিত্তিতে একজন মানুষের জীবন বিচার করা ঠিক নয়।
প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, বর্তমান সরকারের বয়স প্রায় আট মাস। তবে শিক্ষার্থী ও জনগণের প্রতি সরকারের দায়বদ্ধতা রয়েছে। এবার এসএসসি পরীক্ষায় প্রায় ৬ লাখ ৯০ হাজার শিক্ষার্থী প্রত্যাশিত ফল পায়নি। এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ভাগ্যের পরিবর্তন নিশ্চিত করতে না পারলে কোনো উন্নয়নই অর্থবহ হতে পারে না।
অভিভাবক, শিক্ষক ও সমাজের সব অংশীজনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের বাইরে ব্যক্তিজীবনে আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে অভিভাবক। শিক্ষার্থীরা আমাদের সন্তানতুল্য। সেই দায়িত্ববোধ ও আন্তরিকতা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে শিক্ষাবান্ধব সরকার প্রত্যাশিত ফল পাওয়া বা না পাওয়া—সব শিক্ষার্থীর পাশে থাকবে।
গণস্বাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরীর সভাপতিত্বে সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন গণস্বাক্ষরতা অভিযান কাউন্সিলের (বোর্ড) চেয়ারপারসন ড. ইরাম মরিয়ম, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর কবিতা বোস এবং ডা. আরিফুর রহমানসহ অনেকে।