এবার দিল্লিতে নেহা-মমতা-কেজরিওয়ালসহ আটক ৫ হাজার

যন্তর মন্তরগামী রাস্তায় সাত স্তরের ব্যারিকেড বসানো হয়। কাছের ব্যারিকেডগুলো ঝালাই করে দুর্ভেদ্য প্রাচীর তৈরি করা হয়। রাস্তায় বসানো হয় স্টিলের কাঁটা। প্রতিটি মুহূর্ত ভিডিও করার জন্য ভিডিওগ্রাফার রাখা হয়, অনেক পুলিশের শরীরে ছিল বডিক্যাম। আকাশে উড়ছে ড্রোন।

আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:১৭ পিএম

প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ডাকা বিক্ষোভ ঘিরে শনিবার দিল্লিজুড়ে ব্যাপক ধরপাকড় চালিয়েছে পুলিশ। ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত প্রায় পাঁচ হাজার নেতা-কর্মীকে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে চারজন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী, সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা ও ছাত্রনেতারাও রয়েছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে ৪৫টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ এবং দিল্লিগামী সব মেল ও এক্সপ্রেস ট্রেন বাতিল করা হয়েছে। খবর এনডিটি ডটকম-এর। 

আটকদের মধ্যে রয়েছেন সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে, ছাত্রনেত্রী নেহা বোরা, ইউটিউবার ধ্রুব রাঠী, পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল, ত্রিপুরার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার ও কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন।

পুলিশ জানিয়েছে, যন্তর মন্তরে সিজেপির কর্মসূচির অনুমতি ছিল না। তারপরও জমায়েতের চেষ্টা করায় ভোর থেকেই অভিযান শুরু হয়। মুম্বাই থেকে আসা বিমানের ভেতর থেকে দীপকেসহ তিন শীর্ষ নেতাকে আটক করা হয়। পরে সাউথ অ্যাভিনিউতে বাড়ির সামনে ধর্নায় বসা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তার পাঁচ সাংসদকে আটক করা হয়। কেজরিওয়ালের বাড়ি ঘিরে রেখে তাকে বের হওয়ার সময় আটক করা হয়। বিজয়ন, ব্রিট্টাসসহ অন্যদের ছত্রসাল স্টেডিয়ামের অস্থায়ী আটককেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে।

বিমানের ভেতরে ঢুকে আটক সিজেপির তিন নেতা

শনিবার সকালে প্রথম আটক করা হয় সিজেপির তিন শীর্ষ নেতাকে। মুম্বাই থেকে দিল্লিগামী বিমানে ছিলেন দলের প্রতিষ্ঠাতা ও আহ্বায়ক অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা। বিমানটি সকাল ১০টা ১৯ মিনিটে দিল্লি বিমানবন্দরে নামতেই বিমানের ভেতরে ঢুকে তাদের আটক করে দিল্লি পুলিশের দক্ষিণ-পশ্চিম জেলার দল। সঙ্গে ছিলেন নারী পুলিশ সদস্যরাও। অন্য যাত্রীদের তখন দাঁড় করিয়ে রাখা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিমানের ভেতর থেকেই ইনস্টাগ্রাম লাইভে আসেন সিজেপি নেতারা। লাইভে পুলিশের সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডা দেখা যায়। দীপকে বলেন, গ্রেপ্তার হবেন জেনেই দিল্লিতে এসেছেন, ভয় পান না। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আটকের পর তিনজনকে তিনটি আলাদা জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। দীপকেকে গুরুগ্রামে, সৌরভকে দিল্লিতে এবং রাঙ্কাকে দ্বারকায় রাখা হয়েছে।

আটকের পর সিজেপি বিবৃতি দিয়ে বলে, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কর্মসূচির নেতৃত্বকে বিক্ষোভস্থলে পৌঁছানোর আগেই আটকে দেওয়া পূর্বপরিকল্পিত। এটি চলাফেরার স্বাধীনতার লঙ্ঘন। দলটি তিন নেতার নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেছে। আটক হওয়ার সময় দীপকে বলেন, দেশে জরুরি অবস্থার সময় ইন্দিরা গান্ধীও এমন করেননি। আগে থেকে রেকর্ড করা এক ভিডিও বার্তায় তিনি জানান, তারা আটক হলে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেবেন অজিঙ্ক শিন্দে।

দিল্লিগামী বিমান থেকে আটক করা হয় যুবনেতা অভিজিৎ দীপকে। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

বাড়ির সামনে ধর্নায় বসে আটক মমতা

দুপুরে নাটকীয়তা বাড়ে সাবেক তৃণমূল কংগ্রেস প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে। মধ্য দিল্লির সাউথ অ্যাভিনিউতে বাড়ি থেকে বের হতে না দেওয়ায় তিনি সাংসদদের নিয়ে বাসস্ট্যান্ডে বসে ধর্না শুরু করেন। মুখে ব্যান্ডেজ লাগিয়ে প্রতিবাদ করেন তিনি। কিছুক্ষণ পরই পুলিশ তাকে ও তার সঙ্গে থাকা সাংসদ দোলা সেন, প্রতিমা মণ্ডল, ডেরেক ও’ব্রায়েন, শামিরুল ইসলাম ও সাকেত গোখলেকে ভ্যানে তুলে নিয়ে যায়।

তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষ এক্সে লেখেন, দিল্লিতে মমতাকে বাড়ি থেকে বের হতে দেওয়া হচ্ছে না, কোনো রকম প্রতিবাদও করতে দেওয়া হচ্ছে না। পুলিশের বাসের ভেতর থেকে দেওয়া ভিডিও বার্তায় মমতা বলেন, সরকার আমাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করছে। ইন্ডিয়া জোট জনগণের কণ্ঠ শক্তিশালী করতে লড়াই চালিয়ে যাবে।

আটক চার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী

মমতার পাশাপাশি আটক হন বিরোধী শিবিরের আরও তিন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী। দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের বাড়ি সকাল থেকেই ঘিরে রেখেছিল পুলিশ। বাড়ি থেকে বের হয়ে বিক্ষোভে যোগ দিতে যাওয়ার সময় তাকে আটক করা হয়। আটকের পর ভিডিও বার্তায় কেজরিওয়াল বলেন, ভারতের তরুণেরা ভয় পাবে না, আমরা ভোট চুরির বিরুদ্ধে লড়ব।

কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন, সিপিএমের সাংসদ জন ব্রিট্টাস ও ত্রিপুরার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারকেও আটক করে ছত্রসাল স্টেডিয়ামের অস্থায়ী আটককেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে আগেই বিজয়ন, বৃন্দা কারাতদের রাখা হয়েছিল।

দিল্লির ধর্ণা কর্মসূচিতে বাসার সামনে থেকে আটক করা হয় মমতা ব্যানার্জিকে। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

নেহা থেকে তুষার গান্ধী, আটক আইনজীবীরাও

সকালে দিল্লির পথে যাওয়ার সময় আটক করা হয় আইসার সর্বভারতীয় সভাপতি নেহা বোরাকে। সিজেপির কর্মসূচিতে যোগ দিতে যাওয়ার পথে বহু আইনজীবীকেও আটক করা হয়। এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ চেয়েছে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন। সিজেপির আইনি সহায়তা দেওয়া আইনজীবী রত্না সিংহকেও আটক করা হয়েছে।

এদিকে, মুম্বাইয়ের বাড়ি থেকে আটক করা হয়েছে মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র তুষার গান্ধীকে। সিজেপির সমর্থনে অগস্ট ক্রান্তি ময়দানে কর্মসূচিতে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন তিনি। তাকে ডিএন নগর থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ইউটিউবার ধ্রুব রাঠীকে গুরুগ্রামের বাড়ি থেকে আটক করা হয়েছে বলেও খবর এসেছে।

পুলিশের দাবি, শুক্রবার রাত থেকে শনিবার দুপুর পর্যন্ত পাঁচ শতাধিক মানুষকে আটক করা হয়েছে।

যন্তর মন্তরে সাত স্তরের ব্যারিকেড, নজিরবিহীন নিরাপত্তা

সিজেপির কর্মসূচি ঘিরে দিল্লিজুড়ে নিরাপত্তা ছিল নজিরবিহীন। যন্তর মন্তরে কর্মসূচির অনুমতি দেয়নি পুলিশ। সকালে ফাঁকা যন্তর মন্তরের ভিডিও পোস্ট করে দিল্লি পুলিশ লেখে, তাদের জন্য, যারা শহরে শান্তি চান। সকাল থেকে ওই এলাকায় মাইকিং করে বলা হয়, জড়ো হলে আটক করা হবে।

যন্তর মন্তরগামী রাস্তায় সাত স্তরের ব্যারিকেড বসানো হয়। কাছের ব্যারিকেডগুলো ঝালাই করে দুর্ভেদ্য প্রাচীর তৈরি করা হয়। রাস্তায় বসানো হয় স্টিলের কাঁটা। প্রতিটি মুহূর্ত ভিডিও করার জন্য ভিডিওগ্রাফার রাখা হয়, অনেক পুলিশের শরীরে ছিল বডিক্যাম। আকাশে উড়ছে ড্রোন। হোটেল ও এয়ার বিএনবিতে তল্লাশি চালানো হচ্ছে, যাতে আন্দোলনকারীরা আশ্রয় না পান। কনট প্লেস থেকে পাঁচটি বাসে করে আন্দোলনকারীদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

যাতায়াতে কড়াকড়ির অংশ হিসেবে ৪৫টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা হয়েছে। তালিকায় আছে রাজীব চক, পটেল চক ও কাশ্মীরি গেট। প্রথমে ৫৭টি স্টেশন বন্ধের কথা বলা হলেও সুপ্রিম কোর্ট সাধারণ মানুষের চলাচল বন্ধ না করার কথা বলার পর সংখ্যা কমানো হয়। ভোর ৪টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত নয়াদিল্লি ও হজরত নিজামুদ্দিন স্টেশনে আসা সব মেল ও এক্সপ্রেস ট্রেন বাতিল করা হয়েছে।

আগেই দিল্লির বিক্ষোভে যোগ দিতে এসে আটক হন রাহুল গান্ধী

রাষ্ট্রপতি থেকে সুপ্রিম কোর্ট

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুক্রবার দিল্লি এসেছিলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে বিরোধীদের বিক্ষোভে যোগ দিতে। শুক্রবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে দেখা করা ইন্ডিয়া জোটের প্রতিনিধি দলে ছিলেন তিনি। সেখানে জ্ঞানেশ কুমারকে বরখাস্ত এবং গত দুই বছরের সব বিধানসভা নির্বাচন বাতিলের দাবি জানানো হয়। বৈঠকের পর রাহুল গান্ধী বলেন, রাষ্ট্রপতি ভোট চুরির অভিযোগ অস্বীকার করেননি দেখে তিনি হতবাক। তবে সূত্র জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি অভিযোগ মেনে নিয়েছেন বলে রাহুলের দাবি সঠিক নয়।

রাহুল জানিয়েছেন, বিরোধী নেতারা সোমবার সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের কাছে স্মারকলিপি দেবেন। ওইদিন নির্বাচন কমিশনের অনিয়মের অভিযোগে বড় বিক্ষোভের ডাকও দিয়েছে ইন্ডিয়া জোট।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত