ফেসবুকে ১৭ দিনের সম্পর্কে কক্সবাজার ভ্রমণ, ফিরতি পথে নিভল তাজমিনের প্রাণ

আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫৫ পিএম

ফেসবুকে পরিচয়, এরপর মাত্র ১৭ দিনের সম্পর্ক। সেই সম্পর্কের সূত্র ধরে কক্সবাজারে যাওয়া। সেখান থেকে বাড়ি ফেরার পথে কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে বাস থেকে নামার পর ঘটে যায় মর্মান্তিক ঘটনা। সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনের (১৫) মরদেহ পরদিন উদ্ধার করা হয় একটি ধানখেত থেকে। পুলিশের ভাষ্য, সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক মো. সুমন মিয়া (৩৫) তাকে ধর্ষণের পর গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করেন।

এবার নতুন করে তাজমিনের মৃত্যুর পর তার কক্সবাজার যাত্রা, সেখানে অবস্থান এবং বাড়ি ফেরার পথের নানা তথ্য সামনে আসছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারে আবাসিক হোটেলে চাকরি করা রাজু চৌধুরী (২০) নামের এক যুবকের সঙ্গে ফেসবুকে পরিচয় হয়েছিল তার। সেই পরিচয় থেকে গড়ে ওঠে সম্পর্ক। তবে তাজমিন ঠিক কবে কক্সবাজারে গিয়েছিল, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, প্রথমে সে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যায়। পরে কুমিল্লায় ফিরে সেখান থেকে কক্সবাজারে যায়। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় মাকে বলেছিল, এক বান্ধবীর বাসায় যাচ্ছে।

গত বুধবার (৭ অক্টোবর) রাতে কক্সবাজার থেকে আইকনিক এক্সপ্রেসের বাসে কুমিল্লায় ফেরে তাজমিন। রাত পৌনে ১২টার দিকে পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকার হোটেল নূরজাহানের কাছে বাস থেকে তার নামার দৃশ্য সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়। সেখান থেকে রেসকোর্স এলাকার বাসায় যাওয়ার জন্য একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে সে। এরপর কী ঘটেছিল, তা তদন্তে উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পরদিন বৃহস্পতিবার সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগৎপুর গ্রামের একটি ধানখেত থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় অটোরিকশাচালক সুমন মিয়াকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি একাই এ ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।

কক্সবাজারের কক্সেস প্যানারেমিক ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুর এজেন্সির কর্মী আবদুল্লাহ জানান, গত মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাত আটটার পর তাজমিন ও রাজু তাঁদের কাউন্টারে বাসের টিকিট কাটতে যান। দুজনকে সাধারণ যাত্রী হিসেবেই দেখেছিলেন তিনি। তাঁদের মধ্যে কী সম্পর্ক, তা তখন জানতেন না।

আবদুল্লাহর ভাষ্য অনুযায়ী, রাজু পরদিন বুধবারের জন্য একটি টিকিট কাটেন। বুধবার দুপুর ১২টার দিকে আইকনিক এক্সপ্রেসের বাসটি কুমিল্লার উদ্দেশে কক্সবাজার ছাড়ে। রাতে বাসটি পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকার হোটেল নূরজাহানের কাছে পৌঁছায়।

তাজমিন হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বাসে আসা মেয়েটির পরিচয় নিয়ে খোঁজখবর শুরু করেন আবদুল্লাহ। পরে তিনি মেয়েটিকে তাজমিন হিসেবে শনাক্ত করেন। পুলিশ তাঁর কাছে তথ্য চাইতে পারে, এমন ধারণা থেকে ঘটনার বিষয়ে প্রস্তুতিও নেন।

পুলিশ জানিয়েছে, তাজমিনের সঙ্গে কক্সবাজার থেকে আসা রাজু এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত নন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। হত্যাকাণ্ডে অটোরিকশাচালক সুমন মিয়াই জড়িত বলে দাবি পুলিশের।

তাজমিনের মা কেয়া খাতুন সাংবাদিকদের জানান, গত বৃহস্পতিবার বিকেলে মেয়ের সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়। তখন তাজমিন জানিয়েছিল, সে এক বান্ধবীর সঙ্গে আছে। মেয়েকে নিয়ে আসার জন্য ওই বান্ধবীর বাড়িতে যাওয়ার কথাও ভেবেছিলেন তিনি। এ জন্য মেয়ের কাছে বান্ধবীর নাম ও তার মা-বাবার পরিচয় জানতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাজমিন কিছু জানায়নি।

মেয়ের বন্ধুবান্ধব নিয়ে আগে থেকেই উদ্বেগ ছিল কেয়া খাতুনের। কোনো অঘটন ঘটতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে প্রায় ছয় মাস মেয়েকে স্কুলে যেতে দেননি তিনি। মেয়ের চলাফেরা ও বন্ধুত্বের বিষয়ে খোঁজ রাখতেন, চোখে চোখে রাখার চেষ্টা করতেন। তবু শেষ পর্যন্ত মেয়েকে হারাতে হলো তাঁকে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাজমিনের মায়ের সন্দেহের তালিকায় থাকা এক বান্ধবী তার চেয়ে বয়সে বড়। তবে হত্যাকাণ্ডে ওই বান্ধবীর সংশ্লিষ্টতার কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। তদন্তে তাজমিনের অবাধ্য হয়ে পড়া এবং মুঠোফোনে গেম খেলার প্রতি আসক্তির বিষয়ও উঠে এসেছে।

তাজমিনের শিক্ষক সাদ বিন এরশাদ বলেন, ‘আমি তাকে দীর্ঘদিন পড়িয়েছি। সে খুবই চঞ্চল স্বভাবের ছিল। তার মা অসুস্থ হলে দুই যমজ ছোট ভাইয়ের দেখভাল করত তাজমিন।’

শিক্ষক জানান, তাজমিনের বাবা একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করতেন। সকালে বাসা থেকে বের হয়ে রাতে ফিরতেন। তবে মেয়েকে খুব আদর করতেন তিনি। ঘরে রাগ হলে তাজমিন হুটহাট করে বাসা থেকে বের হয়ে যেত।

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) কুমিল্লার সাবেক সভাপতি শাহ মো. আলমগীর খানের মতে, রাজুর সঙ্গে তাজমিনের সম্পর্ক না হলে হয়তো তার কক্সবাজারে যাওয়া হতো না। সে ক্ষেত্রে এমন বিপদের মুখেও পড়তে হতো না তাকে।

তবে তাজমিনের ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে তার ওপর সংঘটিত অপরাধের দায় এক করে দেখার সুযোগ নেই। পুলিশ বলছে, কক্সবাজার থেকে ফেরার পথে অটোরিকশাচালক সুমনের হাতে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয় তাজমিন। কেন এবং কী পরিস্থিতিতে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়াই এখন গুরুত্বপূর্ণ।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত