স্বপ্নের চূড়ায় পৌঁছানোর পথ কখনো মসৃণ হয় না; বরং চরম ব্যর্থতা ও বাধার মুখে দাঁড়িয়ে যিনি ফিরে আসেন, তিনিই সত্যিকারের রাজা। ভারতীয় সেলুলয়েডের ইতিহাসে এমনই এক জীবন্ত কিংবদন্তি অমিতাভ বচ্চন। জীবনের বসন্ত একের পর এক পার করলেও বয়সের ক্যালেন্ডার তার ছন্দ থমকে দিতে পারেনি। একসময়ের প্রত্যাখ্যান, একের পর এক ব্যর্থতা আর তীব্র আর্থিক সংকটের ছাইভস্ম থেকে উঠে এসে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন বলিউডের একছত্র ‘শাহেনশাহ্’ হিসেবে।
১৯৪২ সালের ১১ অক্টোবর উত্তরপ্রদেশের এলাহাবাদে এক সাংস্কৃতিক পরিবারে জন্ম নেন তিনি। পিতা প্রখ্যাত কবি হরিবংশ রাই বচ্চন ও মাতা তেজি বচ্চন। তরুণ বয়সে কলকাতার একটি জাহাজ কোম্পানিতে প্রায় ৩০০ টাকা বেতনের চাকরি ছেড়ে তিনি পাড়ি জমিয়েছিলেন বোম্বাইয়ে। স্বপ্ন ছিল রুপালি পর্দার নায়ক হবেন। কিন্তু শুরুটা ছিল চরম হতাশাজনক। ১৯৬৯ সালে ‘সাত হিন্দুস্তানি’ ছবির মাধ্যমে চলচ্চিত্রে পা রাখেন তিনি, যার পারিশ্রমিক ছিল মাত্র ১ হাজার টাকা। প্রথম ছবিতেই বাজিমাত দূরে থাক, ক্যারিয়ারের শুরুতেই টানা ১২টি সিনেমা বক্স অফিসে চরম ফ্লপ হয়। এমনকি গম্ভীর ও ভারী কণ্ঠস্বরের কারণে অল ইন্ডিয়া রেডিওর অডিশন থেকে ছাঁটাই হয়েছিলেন তিনি। আশ্রয়হীন অবস্থায় প্রখ্যাত অভিনেতা মেহমুদের বাড়িতেও কাটাতে হয়েছে বেশ কিছু দিন।
তবে অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাছে হার মানতে বাধ্য হয়েছিল ভাগ্য। ‘জঞ্জির’ ছবির মধ্য দিয়ে ঘুরে দাঁড়ান তিনি; ভারতীয় চলচ্চিত্রে আগমন ঘটে এক ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’র। এরপর ‘দিওয়ার’, ‘শোলে’, ‘ত্রিশূল’র মতো কালজয়ী সিনেমা উপহার দিয়ে তিনি নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান।
শুধু উত্থান নয়, অমিতাভ বচ্চনের জীবন শেখায় কীভাবে পতনের পর আবারও ঘুরে দাঁড়াতে হয়। ৯০-এর দশকে নিজ প্রযোজনা সংস্থা এবিসিএলের কারণে চরম ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন তিনি। ১৯৯৪ সালের ‘খুদা গাওয়া’র পর রুপালি পর্দা থেকে সাময়িক বিরতি নিতেও বাধ্য হন। তবে হাল ছাড়েননি। শূন্য থেকে শুরু করে ‘বড়ে মিঞা ছোটে মিঞা’ এবং পরবর্তীতে ছোট পর্দার জনপ্রিয় কুইজ শো ‘কোন বনেগা ক্রোড়পতি’ ও ‘মহব্বতেঁ’ দিয়ে রূপালি পর্দায় ইতিহাস সৃষ্টিকারী প্রত্যাবর্তন ঘটান তিনি।
চরিত্রের প্রয়োজনে বয়সকে স্রেফ একটি সংখ্যায় পরিণত করেছেন এই মেগাস্টার। ৬৭ বছর বয়সে ‘পা’ সিনেমায় প্রোজেরিয়া আক্রান্ত ১২ বছরের শিশুর চরিত্রে অভিনয় করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেন। অন্যদিকে ‘১০২ নট আউট’ কিংবা ‘ব্ল্যাক’র মতো চলচ্চিত্রে তার অভিনয় ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে আছে। ‘ব্রহ্মাস্ত্র’ কিংবা ‘কল্কি ২৮৯৮ এডি’-র মতো মেগা বাজেটের বাণিজ্যিক ছবিতেও অ্যাকশন ও অভিনয়ের নতুন মাত্রা যোগ করেছেন তিনি।
চলচ্চিত্রের বাইরে রাজনীতিতেও যুক্ত ছিলেন তিনি; ১৯৮০-র দশকে সংসদ সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারত সরকার তাকে ‘পদ্মশ্রী’, ‘পদ্মভূষণ’, ‘পদ্মবিভূষণ’ এবং চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ সম্মান ‘দাদাসাহেব ফালকে’ পুরস্কারে ভূষিত করেছে। ফ্রান্স সরকার তাকে দিয়েছে তাদের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘লেজিওঁ দ্য নরের নাইট’।
ব্যক্তিগত জীবনে ১৯৭৩ সালে নন্দিত অভিনেত্রী জয়া ভাদুড়ীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। অভিষেক ও শ্বেতা, দুই সন্তানকে নিয়ে এই তারকা দম্পতির পারিবারিক বন্ধনও সিনেপাড়ায় উদাহরণ। আজ কোটি কোটি ভক্তের ভালোবাসা আর সম্মানে সিক্ত অমিতাভ বচ্চন শুধু একজন অভিনেতাই নন, তিনি এক অপরাজেয় অনুপ্রেরণার নাম।