তাজমিনকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে ধর্ষণের পর হত্যা

গ্রেপ্তার সুমনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি

আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০২:১৮ এএম

রাত তখন সাড়ে ১২টা। কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড থেকে ৩০০ টাকা ভাড়ায় সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনকে (১৪) নগরের রেসকোর্স এলাকার বাসায় পৌঁছে দেওয়ার কথা বলেছিল সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমন (৩৫)। কিন্তু বাসায় পৌঁছে দেওয়ার বদলে তাকে অন্য স্থানে নিয়ে যায় চালক। সেখানে তাজমিনকে ধর্ষণের পর হত্যা করে সুমন। আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে সুমন এসব তথ্য জানায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। গ্রেপ্তারের পর সে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদেও একই তথ্য দিয়েছে বলে জানায় পুলিশ।

তাজমিন হত্যাকা-ের ঘটনায় গ্রেপ্তার সুমনকে গতকাল শনিবার বিকেলে আদালতে সোপর্দ করে পুলিশ। সেখানে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি রেকর্ড করে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। পুলিশের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সুমন একাই এ ঘটনা ঘটিয়েছে বলে স্বীকার করেছে। গতকাল সন্ধ্যায় এ তথ্য নিশ্চিত করেন কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) পংকজ বড়ুয়া।

এর আগে গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে এ ঘটনায় গ্রেপ্তার সুমনকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনার বিস্তারিত তথ্য জানান পঙ্কজ বড়ুয়া।

নিহত তাজমিন কুমিল্লা নগরের ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তার স্থায়ী বাড়ি যশোর জেলায় হলেও বাবার চাকরির সুবাদে পরিবারের সঙ্গে কুমিল্লার রেসকোর্স এলাকায় বসবাস করত। সে বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান ছিল। গত বৃহস্পতিবার সকালে একটি ধানের ক্ষেত থেকে উদ্ধার করা হয় তার মরদেহ।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সংবাদ সম্মেলনে পংকজ বড়ুয়া জানান, গত ৮ অক্টোবর রাত আনুমানিক সাড়ে ১২টার দিকে পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডে তিশা বাস কাউন্টারের সামনে থেকে তাজমিনকে তার বাবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তোলে চালক সুমন। এ সময় ৩০০ টাকায় ভাড়া ঠিক হয়। অটোরিকশায় ওঠার পর কিছু দূর গিয়ে তাজমিন সুমনকে ১০০ টাকা দিয়ে কলা ও রুটি কিনে আনেন।

পরে তাজমিনকে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে নূরজাহান হোটেলের সামনে থেকে চাঁদপুরগামী সড়ক হয়ে বিজরা বাজার ঘুরে ঘটনাস্থলের দিকে নিয়ে যায় সুমন। সেখানে পৌঁছে অটোরিকশা বন্ধ করে দিলে জায়গাটি অন্ধকার ও নির্জন হওয়ায় ভয় পেয়ে তাজমিন সুমনকে স্থানটি সম্পর্কে জানতে চায়। সুমন জায়গাটি রেসকোর্স নয় বলে জানালে তাজমিন অটোরিকশা থেকে নেমে পালানোর চেষ্টা করে। এ সময় সুমন তাকে বাধা দিয়ে যৌন নিপীড়নের চেষ্টা চালায়। একপর্যায়ে তাজমিন চিৎকার শুরু করলে সুমন তার গলা চেপে ধরে। এতে দুজনই মাটিতে পড়ে যায় এবং তাজমিন নিস্তেজ হয়ে পড়ে।

পুলিশ জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে সুমন তাজমিনকে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেছে। পরে ধানক্ষেতে নিয়ে তার মাথা মাটিতে চেপে ধরে মৃত্যু নিশ্চিত করে। এরপর তাজমিনের ব্যাগ থেকে আইফোনটি নিয়ে ব্যাগটি ধানক্ষেতে ফেলে দেয়। ঘটনার পর অটোরিকশাটি ঘটনাস্থলে রেখেই পাশের কাছিকাটা মসজিদের সামনের পুকুরে গোসল করে সুমন। পরে ভাড়ায়চালিত অটোরিকশাটি নিয়ে বাখরাবাদ এলাকায় চলে যায় এবং ওই বাখরাবাদ পুকুর পাড়ের জঙ্গলে তাজমিনের আইফোনটি লুকিয়ে রেখে চট্টগ্রামে পালিয়ে যায়।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার পেরুল উত্তর ইউনিয়নের জগৎপুর গ্রামের একটি ফসলি জমি থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে লালমাই থানা পুলিশ। এ ঘটনায় থানায় হত্যা মামলা করা হয়। জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও থানা পুলিশ যৌথভাবে তদন্ত শুরু করে।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিবন্ধনের সূত্র ধরে অটোরিকশার মালিক লালমাই উপজেলার আবুল হাসেমকে শনাক্ত করে গত বৃহস্পতিবার রাতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চালক সুমনের পরিচয় জানতে পারে পুলিশ। পরে প্রযুক্তির সহায়তা ও তথ্য বিশ্লেষণ করে শুক্রবার চট্টগ্রাম থেকে সুমনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সুমন চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার বাসিন্দা। কয়েক বছর আগে বিয়ে করে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জয়নগর গ্রামে ঘরজামাই হিসেবে বসবাস করে আসছিল। সুমনের দেওয়া তথ্য অনুসারে নগরের উপকণ্ঠের বাখরাবাদ এলাকার একটি পুকুরপাড়ের জলাশয় থেকে তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোনটি উদ্ধার করে পুলিশ।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল তাজমিন। তবে মুঠোফোনের কললিস্ট ও চলাচল বিশ্লেষণ করে পুলিশ জানতে পারে, ওই দিন সে ব্রাহ্মণবাড়িয়া যায়। পরের দিন ৫ অক্টোবর কুমিল্লায় ফিরে ভোররাতে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হয়।

গত ৭ অক্টোবর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে রওনা হয়ে রাত সাড়ে ১০টার দিকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে নূরজাহান হোটেলের সামনে নামে তাজমিন। সিসিটিভি ফুটেজে তাকে একটি গাড়ি থেকে একা নামতে এবং আশপাশের ক্যামেরার ফুটেজে মুঠোফোন হাতে ও কাঁধে ব্যাগ নিয়ে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। এরপর সে সড়কের দিকে চলে গেলে তার চলাচল আর ক্যামেরায় ধরা পড়েনি।

মরদেহ উদ্ধারের পর নিহতের বাবা সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, গত বুধবার গভীর রাতে তার মেয়ে মুঠোফোনে বার্তা ও লাইভ লোকেশন পাঠিয়ে তাকে আটকে রাখার কথা জানিয়ে উদ্ধারের অনুরোধ করেছিল। তবে তিনি তখন ঘুমিয়ে ছিলেন। ভোরে বার্তা দেখে লাইভ লোকেশন অনুসরণ করে সেখানে গিয়ে মেয়ের মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি জানতে পারেন।

পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকান্ডে অন্য কেউ জড়িত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত