বাংলাদেশের হ্যাটট্রিকম্যান হাসান মাহমুদ

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৫৮ এএম

পাঁচ বছর আগে স্বপ্নের মতো অভিষেক বাংলাদেশ জাতীয় দলে। এরপর চেয়েছিলেন, সামনে চোখ রেখে শুধুই ছুটে চলতে। তবে নিয়তি যেন বড্ড নিষ্ঠুর। ভিন্ন গল্প লিখে রেখেছিল হাসান মাহমুদের জন্য। ধাক্কা খান অভিষেকের বছরেই। টানা দেড় বছর চোটের সঙ্গে লড়াই করেন। এত দীর্ঘ সময়ে ফেরার লড়াইয়ের সঙ্গে ক্রিকেটের বাইরে থাকায় মানসিকভাবেই বেশ ভেঙে পড়েন এ ডানহাতি পেসার। আবারও বল হাতে দৌড়াতে পারবেন কি না, আগের মতো সুইং করাতে পারবেন কি না সেই সংশয় ছিল। তবে স্বপ্ন দেখা ছাড়েননি তিনি। সেই হাসানই এবার বল হাতে ইতিহাস গড়লেন। আফগানিস্তানের বিপক্ষে একমাত্র টেস্টে হ্যাটট্রিক করে বাংলাদেশের প্রথম পেসার হিসেবে নাম লেখালেন অনন্য এক কীর্তিতে। সঙ্গে পেয়েছেন ৫ উইকেটের স্বাদ। প্রতিদিন যেন নতুন করে চেনাচ্ছেন নিজেকে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে গতকাল আফগানিস্তানের প্রথম ইনিংসে ধস নামানো হাসানের হ্যাটট্রিকে ছিল তিন রকমের আউট। প্রথমে ইসমত আলমকে বোল্ড করেন। পরের বলে কাইস আহমেদ ক্যাচ দেন লিটন দাসের হাতে।

তৃতীয় বলে জিয়াউর রহমানের বিপক্ষে এলবিডব্লিউর আবেদন প্রথমে নাকচ হয়। রিভিউ নিয়ে সফল হয় বাংলাদেশ। এতেই  টানা তিন বলে ৩ উইকেটের কীর্তি পূর্ণ হয় ডানহাতি এ পেসারের। পরে ইয়ামিন আহমদজাইকেও ফিরিয়ে ইনিংসে ৫ উইকেট পূর্ণ করেন হাসান। বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে এর আগে হ্যাটট্রিক করেছেন দুজন। ২০০৩ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে অলক কাপালি এবং ২০১৩ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সোহাগ গাজী। দুজনই ছিলেন স্পিনার। এবার প্রথমবারের মতো কোনো পেসারের নাম যুক্ত হলো এই তালিকায়।

দিনের খেলা শেষ হ্যাটট্রিকের আগের মুহূর্তের পরিকল্পনা নিয়ে হাসান বলেন, ‘আসলে, আমি শুধু ভেবেছি যে, আমাকে সোজা লেংথে বল করতে হবে, ব্যস! এরপর বল যেখানে যাওয়ার নিজের গতিতে যাবে। তাই আমি শুধু স্টাম্পের লাইন এবং লেংথ ঠিক রেখে বল করার চেষ্টা করেছি।’ সঙ্গে যোগ করেন, ‘আমি শুধু জানি যে, আমাকে স্টাম্পের বাইরে বল করতে হবে, যাতে ব্যাটাররা বল ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। আর নতুন বলের ক্ষেত্রে আমি একটু সোজা স্টাম্প বরাবর ও ফুল লেংথে বল করার চেষ্টা করেছি। যাতে ব্যাটাররা সরাসরি ড্রাইভ করতে না পারে।’

দেড় শ বছরের টেস্ট ইতিহাসে হাসানের হ্যাটট্রিকটি ৫০তম। ২০২৬ সালে এটিই প্রথম। ৪৯তম হ্যাটট্রিকটি ছিল ২০২৫ সালের ১৪ জুলাই কিংস্টনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে স্কট বোল্যান্ডের। একই সঙ্গে আফগানিস্তানের বিপক্ষে এই ৫ উইকেট নিয়ে দারুণ এক রেকর্ডে নাম লিখিয়েছেন হাসান। ভারত, পাকিস্তান ও অস্ট্রেলিয়ার পর সংযুক্ত আরব আমিরাত। বিশ্বক্রিকেটে এই চার দেশে ৫ উইকেট নেওয়ার একমাত্র কীর্তি ছিল অস্ট্রেলিয়ার প্রয়াত কিংবদন্তি শেন ওয়ার্নের। এবার তার পাশে নাম তুললেন হাসান। সঙ্গে বাংলাদেশের পেসারদের মধ্যে সবচেয়ে কম টেস্টে (১৭) ৫০ উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন তিনি।

হাসানের প্রশংসা করে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নির্বাচক হাবিবুল বাশার বলেন, ‘এখানে (আমিরাতে) পেসারদের জন্য কন্ডিশন বেশ কঠিন। প্রচণ্ড গরম, আর উইকেট থেকেও খুব বেশি সহায়তা পাওয়া যায় না। অস্ট্রেলিয়ার উইকেটে অবশ্যই বোলিং করাটা অনেক বেশি স্বস্তিদায়ক। সেখানকার আবহাওয়া ভালো থাকে, উইকেট থেকেও সহায়তা পাওয়া যায়। আবুধাবির এ উইকেটে ৫ উইকেট পাওয়াটা অনেক বড় অর্জন।’

অথচ তার ক্রিকেট ক্যারিয়ারটা এতটাও সরল নয় যে, এলেন-দেখলেন আর জয় করলেন। হাসানকে বাংলাদেশের হাসান হয়ে ওঠার পেছনে আছে দীর্ঘ এক লড়াইয়ের গল্প। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) ২০২০ সালের আসরে ঢাকা প্লাটুনের হয়ে ১৩ ম্যাচে ১০ উইকেট নিয়ে সর্বপ্রথম আলোচনায় আসেন তিনি। গতি, সুইং আর নিয়ন্ত্রিত লাইন-লেংথে নজর কাড়েন নির্বাচকদের। তখন বাংলাদেশের পেস বোলিং কোচের দায়িত্বে থাকা ওটিস গিবসন তাকে ভবিষ্যতের সেরা পেসারদের একজন হিসেবে দাবি করেন। ২০২১ সালে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টিতে অভিষেকের মাধ্যমে শুরু হয় তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার।

কিন্তু সেই যাত্রায় বড় বাধা হয়ে আসে চোট। নিউজিল্যান্ড সফরে কোমরের নিচের দিকে ব্যথা শুরু হলে বোলিং করাই কঠিন হয়ে পড়ে হাসানের জন্য। দেশে চিকিৎসা ও নানা পরীক্ষায় সমস্যার কারণ ধরা পড়েনি। পরে ইংল্যান্ডে গিয়ে জানা যায়, মেরুদণ্ডের এল-৪ অংশে চিড় ধরেছে। এরপর কেটেছে দীর্ঘ পুনর্বাসন আর অনুশীলনের দিন। টানা দেড় বছরে জাতীয় দলের একাধিক সিরিজ ও ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে দূরে থাকতে হয়েছে তাকে। সেই সময়ের কথা স্মরণ করে এ প্রতিবেদককে হাসান বলেছিলেন, ‘ফিরে আসার এই পুরো প্রক্রিয়ায় প্রত্যেকটা দিনই আমার জন্য একটা চ্যালেঞ্জ ছিল। প্রতিদিন মনে হতো, আজ হয়তো আবার শরীরচর্চা করতে যাব, পুনর্বাসন প্রক্রিয়া চালিয়ে যাব, নিজেকে কীভাবে আরও একটু ফিট করে তুলতে পারব, সেই চেষ্টা করব। হতাশা ছিল, দুশ্চিন্তা ছিল, আবার কীভাবে ফিরে আসব, বোলিং করতে পারব কি না, আগের সেই ছন্দ থাকবে কি না এসব ভাবতাম।’

এরপর ২০২২ সালের মাঝামাঝি জাতীয় দলে ফেরেন হাসান। তবে ততদিনে পেস বোলিং বিভাগে তৈরি হয় তুমুল প্রতিযোগিতা। ফলে কখনোই টানা খেলার সুযোগ হয়নি হাসানের। আসা-যাওয়ার মধ্যেই থাকতে হয়েছে তাকে। এসবের মধ্যে পাকিস্তান, ভারত, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্টে ৫ উইকেটের স্বাদ পান। নিজেকে নতুন করে প্রমাণের মঞ্চ হিসেবে পান ইংল্যান্ডের কাউন্টি ক্রিকেটকে। কেন্টের হয়ে কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপে চার ম্যাচে ২৬ উইকেট নেন তিনি। এই আত্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে ছুটছেন এই ডানহাতি পেসার। এভাবেই বাংলাদেশ পেস বোলিং বিভাগের নতুন ‘রাজা’ হয়ে উঠেছেন হাসান। গতকাল টেস্টের তৃতীয় দিনের খেলা শেষ বলেন, ‘আমি শুধু এভাবেই একটানা ভালো বোলিং করে যেতে চাই এবং সামনের ম্যাচগুলোতেও দলের জন্য এমন পারফরম্যান্স উপহার দিতে চাই।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত