‘লড়াই সবে শুরু’হুঁশিয়ারি ককরোচ নেতাদের

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৫৯ এএম

দিল্লি পুলিশের হেফাজত থেকে ছাড়া পেয়েই নির্বাচনী জালিয়াতির অভিযোগে বিক্ষোভ আরও ছড়িয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতারা। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে শনিবার যন্তর মন্তরের কাছে জড়ো হতে গিয়ে কয়েকশ মানুষ আটক হন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি জানিয়েছে, গতকাল রবিবারও তরুণ বিক্ষোভকারীদের কয়েকটি দল যন্তর মন্তরে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছে। দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে সিজেপির সহ-আহ্বায়ক আশুতোষ রাঙ্কা বলেন, লড়াই সবে শুরু হয়েছে। তিনি আরও বলেন, জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত এই বিক্ষোভ থামবে না। বিক্ষোভকে যেভাবে যুদ্ধের মতো পরিস্থিতিতে পরিণত করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর লজ্জা পাওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এর আগে রবিবার সকালে দিল্লির একটি আদালত আগামী এক বছর কোনো ধরনের ‘শান্তি ভঙ্গ করবেন না’, এমন মুচলেকায় সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকেসহ তিন শীর্ষ নেতাকে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেয়। গত শনিবার রাতে মুক্তি পেয়েছেন ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিও।

রবিবার দিল্লির একটি আদালত তিনজনকে মুক্তি দেওয়ার পরপরই সিজেপি প্রধান অভিজিৎ দিপকে দাদির শেষকৃত্যে অংশ নিতে মহারাষ্ট্রে নিজের শহরে রওনা হন। পরে এক্সে মুক্তির শর্ত নিয়ে তিনি লেখেন, ‘এমন কোনো মুচলেকায় সই করিনি যে আমরা বিক্ষোভ করব না। আমরা আবার রাস্তায় নামব।’ এক্সে এক পোস্টে প্রধানমন্ত্রী মোদির কড়া সমালোচনা করে দিপকে লেখেন, ‘প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদি ভারতের জন্য একটি লজ্জা। এর আগে এই দেশ কখনো এত বড় ভীরু ও উৎপীড়ক শাসক দেখেনি’। সিজেপির যুগ্ম আহ্বায়ক সৌরভ দাস বলেন, ‘পুরো দেশে জরুরি অবস্থার মতো পরিস্থিতি চলছে। রাষ্ট্র তার নিজের নাগরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছে।’ তিনি বলেন, ‘দিল্লি পুলিশ জোর করে বিমানে ঢুকে আমাদের অপহরণ করেছে।’ সৌরভ দাস আরও বলেন, দেশে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। একজন ব্যক্তিকে রক্ষা করতেই এসব করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। সিজেপি নেতারা অভিযোগ করেছেন, বিক্ষোভ ঘিরে রাজধানীকে কার্যত অচল করে দেওয়া হয়েছিল এবং আটক অবস্থায় তাদের আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়নি।

সিজেপির আইন প্রধান রত্না সিংয়ের অভিযোগ, পুলিশ কর্মীদের পরিবারকে হুমকি দিয়ে সন্তানদের বিক্ষোভে যোগ দিতে নিষেধ করতে বলেছেন। তার আরও অভিযোগ, ইনটেলিজেন্স ব্যুরোর কর্মীরা তার গতিবিধির ওপর নজর রেখেছেন। কর্মীদের ওপর নিষেধাজ্ঞার ভিত্তি নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন। তার ভাষ্য, আমি একজন নাগরিক। আমার যেকোনো জায়গায় যাওয়ার অধিকার আছে। আপনারা কীভাবে আমাকে অন্যায়ভাবে আটক রাখতে পারেন? ক্ষমতাসীন বিজেপি সিজেপিকে বিরোধীদের শাখা সংগঠন হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। দলের প্রধান নিতিন নাবিন অভিযোগ করেন, বিদেশি শক্তির নির্দেশনায় তারা ভারতের ক্ষতি করতে চাচ্ছে। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্ত সিজেপিকে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও আপ প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়ালের ‘বি-টিম’ বলেছেন। গত শনিবার আটক হয়ে পরে ছাড়া পাওয়া চার সাবেক মুখ্যমন্ত্রীর একজন কেজরিওয়াল। একই ইস্যুতে রাহুল গান্ধী কয়েক মাস বিক্ষোভ করছেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেন, গণতন্ত্রে প্রত্যেক ব্যক্তির ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার আছে, তবে মানুষের ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে নৈরাজ্য ছড়ানো কারও অধিকার নয়।

বিক্ষোভ থেকে আটক কয়েকজন আইনজীবীকে একটি থানায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রেখে মারধর করার অভিযোগও উঠেছে। দেশটির সুপ্রিম কোর্টকে এ তথ্য জানানো হয়েছে। আবেদনকারীদের পক্ষে আদালতে উপস্থিত হয়ে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সঞ্জয় হেগড়ে বলেন, গত শনিবার ময়দান গড়ি এলাকার সঞ্জয় কলোনি থানায় যাওয়া আইনজীবীদের কয়েক ঘণ্টা আটকে রাখা এবং তাদের মারধর করা হয়েছে। আদালতে সঞ্জয় বলেন, ‘ভুক্তভোগীদের কয়েকজন আমার সঙ্গে কাজ করেছেন। এমনকি আইনজীবীদের বিরুদ্ধে এফআইআর (প্রাথমিক তথ্য বিবরণী) দাখিলের হুমকি দিয়েছেন পুলিশ সদস্যরা। পাশাপাশি সিজেপির ডাকা আন্দোলনের মধ্যে দিল্লি মেট্রো পরিষেবা স্বাভাবিক সময়সূচি অনুযায়ী চালু রাখতে এবং ইন্টারনেট পরিষেবা ব্যাহত না করতে কেন্দ্রীয় সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। গতকাল রবিবার আদালত বলেছে, যাবতীয় বিধিনিষেধ অবশ্যই সংবিধানের ১৯(২) অনুচ্ছেদের অধীনে থাকা জনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত শর্তাবলির ওপর ভিত্তি করে হতে হবে।

এদিকে, ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে শিক্ষার্থীদের চলমান বিক্ষোভ থেকে গণহারে আটকের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। তবে ভারত সরকার সংস্থাটির বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর (ওএইচসিএইচআর) থেকে বলা হয়, ভারতীয় কর্র্তৃপক্ষকে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নির্বিচারে আটক করা সবাইকে অবিলম্বে ও নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে। ওএইচসিএইচআরের এ বক্তব্যের কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ভারত সরকার। তারা জাতিসংঘের সংস্থাটির উদ্বেগকে ‘অমূলক’ এবং ওএইচসিএইচআরের বক্তব্যকে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনাকাক্সিক্ষত হস্তক্ষেপ বলে উল্লেখ করেছে। গত শনিবার জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক মুখপাত্র থামিন আল-খিতান এক বিবৃতিতে বলেন, ‘শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেন সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন করে, তা ভারতীয় কর্র্তৃপক্ষকে নিশ্চিত করতে হবে। এটি দেশটির গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য ও মানবাধিকার রক্ষার দায়বদ্ধতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।’ এর জবাবে জেনেভায় ভারতের স্থায়ী মিশন থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, ভারত বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ। ভারতে শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ করার অধিকার সুরক্ষিত রয়েছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত