২০০৮ সালে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) একটি প্রকল্পের আওতায় সিলেট, ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে ১২টি রেসিডেন্সিয়াল মডেল গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠা করে। সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী মরহুম সাইফুর রহমানের বিশেষ প্রচেষ্টায় দেশের একমাত্র উপজেলা পর্যায়ে এটি মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের ইছবপুর এলাকায় স্থাপন করা হয়। পরের বছরই (২০০৯ সালে) প্রকল্পের অন্য ১১টি প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত ও পরবর্তীতে সরকারি হলেও, শ্রীমঙ্গলের এই প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘ দেড় যুগেও সরকারিকরণ হয়নি। প্রতিষ্ঠানটি রাজনৈতিক আক্রোশের শিকার বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। নারী শিক্ষার প্রসারে ৫ একর জমির ওপর নির্মিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি এখন চরম অবহেলার শিকার। বর্তমানে মাত্র একটি তিন তলা একাডেমিক ভবনে কোনো রকমে ক্লাস চললেও, আবাসিক সুবিধাযুক্ত বাকি ৭টি ভবন (১ থেকে ৪ তলা বিশিষ্ট) পুরোপুরি পরিত্যক্ত ও জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে।
জানা যায়, ২০০০ সালের দিকে আন্তর্জাতিক লেবার অরগানাইজেশনের (আইএলও) অর্থায়নে ইছবপুরে চা শ্রমিকদের জন্য তৈরি করা হয়েছিল একটি ৫০ শয্যার অত্যাধুনিক হাসপাতাল। কিন্তু উদ্বোধনের পরপরই বন্ধ হয়ে যায় এর কার্যক্রম। পরবর্তী সময় ২০০৪ সালে জমি ও অবকাঠামো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ন্যস্ত করা হয়। প্রায় ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে রূপান্তরের পর, ২০০৮ সালের ২৬ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠানটি নতুন ‘শ্রীমঙ্গল রেসিডেন্সিয়াল মডেল গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ’ নামে যাত্রা শুরু করে।
শুরুতে মাউশি কর্তৃক ১১ জন শিক্ষক ও ১৭ জন কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। শর্ত ছিল, তারা প্রচলিত এমপিও পদ্ধতিতে বেতন-ভাতা পাবেন। কিন্তু দেশব্যাপী প্রকল্পের বাকি ১২টি প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত ও পরবর্তীতে সরকারি হলেও, শ্রীমঙ্গলের এই প্রতিষ্ঠানটির ভাগ্য খোলেনি। দীর্ঘদিন বেতন না পাওয়ায় ক্ষোভে ও অভাবে অধিকাংশ শিক্ষক-কর্মচারী চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। ২০০৯ সাল থেকে উন্নয়নের সব কাজ থমকে আছে। বর্তমানে ৭টি আবাসিক ভবনই পরিত্যক্ত, ফলে বন্ধ রয়েছে ছাত্রীনিবাস। শুধু মূল একাডেমিক ভবনে জোড়াতালি দিয়ে ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির প্রায় দুই শতাধিক ছাত্রী পড়াশোনা করছে।
প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে অধ্যক্ষসহ ১১ জন শিক্ষক ও ৪ জন তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী খন্ডকালীন হিসেবে কর্মরত আছেন। অধ্যক্ষ ছাড়া বাকি ১০ জন শিক্ষক ৫-৬ হাজার টাকা সম্মানিতে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। ছাত্রীদের বেতন প্রাপ্তিতে দেরি হলে ওই সম্মানীও তারা সময়মতো পান না।
সরেজমিন শ্রীমঙ্গল রেসিডেনসিয়াল মডেল গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজে গিয়ে দেখা যায়, এই স্কুল ও কলেজ ক্যাম্পাসে পরিত্যক্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে ৬টি বহুতল আবাসিক ভবন, গাড়ির গ্যারেজ, পানির পাম্প ঘর, ক্যান্টিন ঘর। একাডেমিক ভবনের নিচতলায় জোড়াতালি দিয়ে শ্রেণি কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। উপরতলার বিভিন্ন কক্ষের আসবাবপত্র, কাঠের দরজা-জানালাগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
ওই স্কুল অ্যান্ড কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক অলকা ভৌমিক ও হিসাববিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক পুষ্পিতা দত্ত বলেন, ‘নামমাত্র যাতায়াত খরচ দেওয়া হয় আমাদের। অনেকটা স্বেচ্ছাশ্রমে দীর্ঘদিন ধরে আমরা এখানে ছাত্রীদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
প্রতিষ্ঠানটির নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী অর্পিতা দেব, সুষ্মিতা বৈদ্য, দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুন তাইয়্যিবা, প্রাপ্তি দেব বৈশাখী, একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার লিসা ও সাহিদা বেগম বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানটি সরকারি হলে বর্তমানের চেয়ে কমপক্ষে দ্বিগুণ শিক্ষার্থী শিক্ষা লাভের সুযোগ পেত।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষক বলেন, ‘কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করতে স্থানীয় সংসদ সদস্যের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। আমরা এই প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে এবং এমপিওভুক্ত করতে ২০০৯ সাল থেকে বারবার ঊর্ধ্বতন মহলে যোগাযোগ করি। কিন্তু বারবারই তৎকালীন সরকারি দলের লোকদের কাছ থেকে আমাদের শুনতে হয়েছে কলেজের একাডেমিক ভবনের সামনে ফলকে এম সাইফুর রহমানের নাম কেন? এ কারণে আমরা বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছি।’
শ্রীমঙ্গল রেসিডেনসিয়াল মডেল গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর অসিত কুমার পাল বলেন, ‘আমি ২০০৯ সালের ২৬ অক্টোবর এখানে যোগদান করি। এই প্রতিষ্ঠানে যে অবকাঠামো রয়েছে তা একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো। বর্তমানে ১০ জন খন্ডকালীন প্রভাষক ও সহকারী শিক্ষক দিয়ে কোনোরকম চালানো হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। দ্রুত এমপিওভুক্ত হলে বা সরকারি সহায়তা পেলে এ স্কুল অ্যান্ড কলেজটি তার ঐতিহ্য ফিরে পেতে সহায়ক হবে।’
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান বলেন, ‘জেলা প্রশাসক মহোদয়সহ আমি নিজে একাধিকবার প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করেছি। আমরা সাধ্যের মধ্যে বর্তমান বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এটাকে পাঠ উপযোগী করাসহ প্রতিষ্ঠানটিকে ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করছি। জাতীয়করণের একটা প্রস্তাব আমরা সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠাব। সহসা জাতীয়করণ না হলেও এই প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য ছোটখাটো উন্নয়ন আর পড়ার মানটা যেন ঠিক থাকে সে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখব।’