ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে রাজধানী নয়াদিল্লিতে আন্দোলন করছে দেশটির বিরোধী দল, ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এবং ছাত্র সংগঠনগুলো। এ ত্রিমুখী আন্দোলন দিল্লিতে কার্যত এক থমথমে পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগে সিইসির পদত্যাগের দাবিতে গতকাল সোমবার দিল্লির প্রাণকেন্দ্রে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী জমায়েত হয়েছেন।
বিরোধীদের জোট ‘ইন্ডিয়া’-র ব্যানারে আয়োজিত ‘চলো দিল্লি-মার্চ ফর ডেমোক্র্যাসি’ শীর্ষক এ কর্মসূচিতে বিরোধী নেতারা ভারতের সুপ্রিম কোর্ট অভিমুখে এক প্রতিবাদ পদযাত্রায় অংশ নেন। একই দাবিতে সিজেপিও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছে। সুপ্রিম কোর্ট অভিমুখে বিরোধীদের মিছিল ঘিরে নয়াদিল্লিতে নিরাপত্তা জোরদার করে ১৩৩ ধারা জারি করা হয়েছিল। বিক্ষোভের আগে বন্ধ ছিল ৬টি মেট্রো স্টেশন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি জানিয়েছে, বিরোধী ‘ইন্ডিয়া জোটের’ বিক্ষোভে কনট প্লেস ও মান্ডি হাউজের মধ্যবর্তী সড়কে সাধারণ মানুষ ও প্রতিবাদকারীদের ঢল নামে।
বিরোধীরা জানিয়েছেন, তারা ইতিমধ্যে ভারতের প্রধান বিচারপতির সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এবং সুপ্রিম কোর্টে একটি আনুষ্ঠানিক পিটিশন জমা দেবেন। তবে বিরোধী জোটের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত। ইন্ডিয়া জোটের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকের পরিবর্তে তিনি তাদের নিয়মতান্ত্রিক আইনি উপায়ে পিটিশন বা রিট করার পরামর্শ দিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি বলছে, গতকাল সোমবার বিকাল ৪টা থেকে ৫টার মধ্যে প্রধান বিচারপতির সাক্ষাৎ চেয়ে ই-মেইল করেছিলেন বিরোধী জোটের অন্যতম নেতা কংগ্রেসের রাহুল গান্ধী ও মল্লিকার্জুন খাড়গে। তবে তাদের অনুরোধের জবাবে প্রধান বিচারপতি পাল্টা ই-মেইলে স্পষ্ট জানিয়ে দেন জোট নেতারা যে বিষয়গুলো উত্থাপন করতে চাইছেন, সেগুলো ইতিমধ্যেই বিচারাধীন। সুপ্রিম কোর্টেই এগুলোর শুনানি চলছে।
পরে কংগ্রেস সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী স্পষ্ট জানান নির্বাচন কমিশনের শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তন, সংবিধান সুরক্ষা এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার না হওয়া পর্যন্ত তাদের লড়াই অব্যাহত থাকবে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, পদত্যাগ করুন, অপরাধ স্বীকার করে রাজসাক্ষী হন; আপনি ভুল করেছেন, তবে এই ভুলের পেছনের মূল মগজ আপনি নন। তিনি আরও দাবি করেন যে, এসব অভিযোগের কারণে জ্ঞানেশ কুমার চরম চাপের মধ্যে রয়েছেন। রাহুল গান্ধী বলেন, আমরা জানি জ্ঞানেশ কুমার রাতে ঘুমাতে পারছেন না; আমি তাকে সরাসরি বলেছি আপনি সিইসি হিসেবে টিকে থাকতে পারবেন না। সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় রাহুল বলেন, এটি কোনো রাজনৈতিক দলের স্বার্থের লড়াই নয়, বরং গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ রক্ষার লড়াই। তিনি উল্লেখ করেন, আমরা প্রধান বিচারপতিকে চিঠি লিখেছিলাম। তিনি আমাদের পিটিশন করার নির্দেশ দিয়েছেন। এখন ‘ভোটচুরি’র বিরুদ্ধে ইন্ডিয়া জোটের নেতারা সুপ্রিম কোর্টে পদযাত্রা করবেন এবং পিটিশন জমা দেবেন।
এদিকে নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ ও সমাবেশের আয়োজন নিষিদ্ধ করেছে দিল্লি পুলিশ। গতকাল সোমবার দিল্লি পুলিশের কমিশনার অনুরাগ কুমারের স্বাক্ষরিত এক নির্দেশে উল্লেখ করা হয়েছে এ তথ্য। লিখিত নির্দেশে বিক্ষোভ-সমাবেশ আয়োজনের বিকল্প স্থান হিসেবে রাজধানীর তিনটি জায়গার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ জায়গাগুলো হলোরামলীলা ময়দান, বুরারি ময়দান এবং পূর্ব দিল্লির সিবিডি ময়দান। ২০২২ সালের ২৮ এপ্রিল এক লিখিত নির্দেশে দিল্লি পুলিশ যন্তর মন্তরকে বিক্ষোভ, মিছিল-সমাবেশের স্থান হিসেবে নথিভু ক্ত করেছিল। নতুন এই নির্দেশের মাধ্যমে কার্যত আগেকার আদেশ বাতিল করা হলো। পুলিশ জানিয়েছে, নতুন এই তিনটি স্থানে বিক্ষোভ আয়োজনের জন্য সংশোধিত কার্যপদ্ধতি বা এসওপি আলাদাভাবে জারি করা হবে।
১২ সাংবাদিক আটক
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে নয়াদিল্লিতে বিক্ষোভের দ্বিতীয় দিনের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে হিন্দুস্তান টাইমসের সহযোগী প্রকাশনা হিন্দুস্তানের এক প্রতিবেদকসহ কমপক্ষে ১২ সাংবাদিককে আটক করেছে দিল্লি পুলিশ। আটকের বর্ণনা দিয়েছেন হিন্দুস্তানের ২৭ বছর বয়সী প্রতিবেদক আশিস সিং। তিনি জানান, অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) ডাকা বিক্ষোভের খবর সংগ্রহের সময় বিকেল আড়াইটার দিকে আরকে আশ্রম মার্গ থেকে তাকে আটক করা হয়। সংবাদকর্মী হিসেবে স্পষ্ট শনাক্তকারী পরিচয়পত্র পরা থাকা সত্ত্বেও পুলিশি নির্যাতনে তিনি আহত হন।
আটক অন্য সাংবাদিকদের মধ্যে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস হিন্দির তিন প্রতিবেদক, দ্য হিন্দুর একজন এবং ডিজিটাল সংবাদ প্ল্যাটফর্মের ক্যামেরাম্যানরা ছিলেন। দিল্লি পুলিশের জনসংযোগ কর্মকর্তা আটকের বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। এক্সে এক পোস্টে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের অফিসিয়াল অ্যাকাউন্ট আটক সাংবাদিকদের শাশ্বত, সিয়া ও বিজয় হিসেবে শনাক্ত করেছে। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, তাদের কনট প্লেস থেকে আটক করে ছত্রসাল স্টেডিয়ামে নিয়ে যাওয়া হয়।