রেলকোচ সংস্কারে অনিয়ম, মন্ত্রীর ক্ষোভ

আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৩৩ পিএম

নীলফামারীর সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা পরিদর্শনকালে মেরামতাধীন রেলকোচের জানালার ফ্রেমে নিম্নমানের অ্যালুমিনিয়াম পাতের ব্যবহার ও কাজের মান নিয়ে ক্ষোভ এবং অসন্তোষ প্রকাশ করেছে রেলপথ, সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে দেশের সর্ববৃহত্তম ঐতিহাবাহী সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা পরিদর্শনে এসে রেলকোচের জানালার সংস্কার কাজ প্রত্যক্ষ করার পর চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। এসময় মন্ত্রী বিভিন্ন বিভাগের মেরামত ও উৎপাদন কার্যক্রম ঘুরে দেখেন।

এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ এমপি, রেলপথ সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম, মন্ত্রীর একান্ত সচিব (উপসচিব) হাবিবুল হাসান রুমি এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) আহম্মদ হোসেন মাসুম।

পরিদর্শনের শুরুতে মন্ত্রী কারখানার ক্যারেজ শপে যান। সেখানে মেরামতাধীন বিজি ৭৩১৭ নম্বর কোচের ওপর উঠে জানালার ফ্রেমের কাজ পর্যবেক্ষণ করেন। এসময় ফ্রেম তৈরিতে হালকা অ্যালুমিনিয়ামের পাতের ব্যবহার এবং কাজের মান তাঁর নজরে আসে। জানালার ফ্রেমের কাজ সন্তোষজনক না হওয়ায় তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

একইসঙ্গে মন্ত্রী কারখানার বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যাত্রীসেবার মান বৃদ্ধিতে সংস্কারকাজে ব্যবহৃত সামগ্রী ও কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করার কঠোর সর্তক এবং রেলের মেরামত ও উৎপাদনকাজে গুণগত মান নিশ্চিতের নির্দেশনা দেন।

মন্ত্রী রেলের কোচ মেরামত, পুনর্নির্মাণ এবং খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরির প্রতিটি পর্যায়ে গুণগত মান বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এসব কাজে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার কিংবা অবহেলা গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও নির্দেশনা দেন তিনি।

এসময় রেলপথ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, এমন নিম্নমানের কাজ করার চাইতে রেলকোচ সংস্কার কাজ একেবারেই বন্ধ করে দেওয়া হোক। এত বড় একটি কারখানায় রেলওয়ে কোচ সংস্কার কাজের মান এত নিম্নমানের, এখানে নিজে না এলে তা কোনোভাবেই বুঝতে পারতাম না। এ ধরনের কাজ দেখার পর এখানকার কর্মকর্তা ও শ্রমিকদের যোগ্যতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন থেকে যায়।

মন্ত্রী সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক (ডিএস) শাহ সুফি নূর মোহাম্মদকে উদ্দেশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এখানে জানালার যেভাবে সংস্কার করা হচ্ছে, এর চেয়ে অনেক ভালো কাজ তো ছোটখাটো যেকোনো ওয়ার্কশপেও করা সম্ভব। আপনার নিজের বাড়ির জানালার সংস্কারকাজ হলে কি এভাবে অবহেলাভরে কাজ করতেন?

পরিদর্শনকালে মন্ত্রী আরও বলেন, রেলের আধুনিকায়ন এবং যাত্রীসেবার মান উন্নয়নে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারখানায় কোচ মেরামত ও পুনর্নির্মাণের কাজে কোনো ধরনের অবহেলা কিংবা নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার বরদাশত করা হবে না।

ক্যারেজ শপ পরিদর্শন শেষে রেলমন্ত্রী সেলুন কার, বগি শপ ও পেইন্ট শপ ঘুরে দেখেন। এসব বিভাগের কার্যক্রম সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়ার পাশাপাশি মেরামত ও উৎপাদনের বিভিন্ন দিক পর্যবেক্ষণ করেন।

পরে তিনি কারখানার চিফ মেকানিক্যাল ওয়ার্কশপ (সিএমডব্লিউ) বিভাগে যান। সেখানে কোচের চাকায় টায়ার পরানোর প্রক্রিয়া সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করেন। এরপর ফাউন্ড্রি শপ পরিদর্শন করেন। এ বিভাগের গলিত লোহা ব্যবহার করে ট্রেনের বিভিন্ন ছোটখাটো খুচরা যন্ত্রাংশ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম তৈরির প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চান।

এসময় আরও উপস্থিত ছিলেন, সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার বিভাগীয় কর্মকর্তা শাহ সুফি নূর মোহাম্মদ, কর্মব্যবস্থাপক এম মমতাজুল ইসলাম, নীলফামারীর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হুমায়ূন কবীর, সৈয়দপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারাহ ফাতেহা তাকলিমা, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার পদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ।

পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে রেলপথ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, আমি এখানে দেখেছি এখানে প্রায় ২৪০০ এর মতো আবাসন রয়েছে তবে সেখানে শুধুমাত্র ৯০০ মতো লোক আছে সেহেতু আবাসনের কোন সংকট নেই। এখানে পুরোনো ভবন আবাসন নিয়ে হাউজ ঋণ যে কাটে সেটার থেকে বাহিরে কম টাকায় ভালো বাসা ভাড়া পাওয়া যায় এজন্য অনেকে রেলের আবাসনে থাকতে আগ্রহী না। রেলওয়ের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ একর জায়গা পৌরসভা দখল করে আছে। রেল কর্তৃপক্ষ ও পৌরসভার মধ্যে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একটি বিরোধ রয়েছে সেটি অনেকটা আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে।

আজকের মিটিংয়ে ইউএনও সাহেবসহ বিভিন্ন কর্মকর্তা ছিলেন এসব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে যেখানে রেলওয়ের জায়গা দখল রয়েছে তাছাড়াও রেলওয়ে থেকে ব্যক্তি, গোষ্ঠীসহ সকল পর্যায়ের জমি লাইসেন্সের ভিত্তিতে এক বছর পে করতে হয় এবং লিজ দেওয়া বন্ধ রয়েছে। আমরা প্রথমে রেলের জায়গা রেলের প্রয়োজনে, পরে রাষ্ট্রের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে চাই। আমরা জায়গাগুলো শনাক্ত করছি এবং তাদের বর্ণনা নির্ধারণ করা হচ্ছে। সেখানে রেলওয়ের জায়গা দখল আছে সেগুলো চিহ্নিত করে দখল মুক্ত করা হবে।

রেলপথ মন্ত্রী বলেন, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি বাংলাদেশের রেলওয়ে যতটা আমূল পরিবর্তন এবং যাত্রীবান্ধব করা সম্ভব সেটি করব। কারণ আমাদের রেল যাত্রার ঐতিহ্য যেমন আছে প্রয়োজনও তা আছে এবং সেটি আরও প্রসারিত করার প্রয়োজন আছে। এটি আমাদের নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল। আমাদের দুটি যে কারখানা আছে সেটিকে কীভাবে সম্পৃক্ত করা যায় সেই লক্ষ্যে এখানে আসা। এখানে কোথাও সমস্যা আছে আমরা জেনেছি, সম্ভাবনাময় কি আছে সেটিও জেনেছি। কিছু কিছু যন্ত্রাংশ তৈরি সরকারি দেখেছি এবং সেটির মান দেখেছি আমরা আশ্বস্ত হয়েছি। কিন্তু একটি জায়গায় আমার মনে হয়েছে আমি, প্রতিমন্ত্রী ও সচিব একমত হয়েছি এখানে সে কোচ মেরামত হচ্ছে সেটি আরও মান সম্মত হতে হবে। এখানে কিছু পূর্বের মেশিন আছে সেগুলো কোয়ালিটি সম্পূর্ণ মেশিন। কিন্তু আমরা যেগুলো এখনের আদলে করতে চেয়েছি, কোচের কিছু অংশ মেরামত করা, জানালা মেরামত করা সেই জায়গা গুলোতে কোয়ালিটি মান সম্মত করতে কি করা যায়। পূর্বঅঞ্চল এবং পশ্চিমঅঞ্চল রেলওয়ে মিলে প্রায় ৪০০ মতো কোচ মেরামতের অপেক্ষায় আছে। সেগুলো মেরামত করে আবার সচল করতে আমরা দক্ষ কারিগর নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রেখেছি।

তিনি রেলওয়ে হাসপাতাল সম্পর্কে বলেন, রেলের পক্ষ থেকে হাসপাতাল পরিচালনায় ডাক্তার, নার্স এবং সেবা নিশ্চিত করতে কঠিন হয় বিধায় আমরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলেছি। দেশের প্রায় ৯ টি রেলওয়ে হাসপাতাল রয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রনালের সঙ্গে যৌথ ব্যবস্থাপনায় কীভাবে ফাংশন করা যায় সেগুলো আমরা প্রতিষ্ঠিত করব।

তিনি আরও বলেন, সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা একটি প্রতিষ্ঠিত ও সুনামধন্য কারখানা ছিল। এটি এক সময়ে দেশকে রিপ্রেজেন্ট করেছে সেই ১৮৬২ থেকে ১৮৭০ এখানে কারখানা হয়েছে। তখন যে প্রয়োজনে হয়েছে সেটি আছে এবং আরও বেড়েছে৷ তবে সেভাবে এই কারখানা ডেভেলপমেন্ট হয়নি। আমি কারখানা পরিদর্শন করে যেটি দেখলাম আমাদের কোচ মেরামত করা অনেক প্রয়োজনীয় যন্ত্রণাংশ এগুলো এক সময়ে ১২ হাজারের মতো পার্স তৈরি হতো এখন সেটি ৬৫৪ থেকে ৬৫৫ এসেছে। এই পার্স এখন আমাদের আমদানি করতে হচ্ছে তবে এখানে অনেক পার্স তৈরি করা সম্ভব। 

 

 

 

 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত