সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে সংঘাত ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। টানা তৃতীয় দিনের মতো সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। সৌদি জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে এসব তথ্য জানান। এছাড়াও সৌদি আরবের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর খামিস মুশাইতের দিকে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। হুতিদের অব্যাহত হামলায় সৌদি রাজধানীর আকাশ ফাঁকা হয়ে পড়ায় রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আগামী শনিবার পর্যন্ত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্র্তৃপক্ষ। এদিকে, ইরান সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ইয়েমেনের রাজধানী সানায় ব্যাপক বিমান হামলা চালানোর ঘোষণা দিয়েছে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। জবাবে সৌদি আরবের তিনটি তেল স্থাপনা থেকে সবাইকে তাৎক্ষণিকভাবে সরে যাওয়ার পাল্টা নির্দেশনা দিয়েছে হুতি বিদ্রোহীরা।
সৌদি জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি জানান, গতকাল মঙ্গলবার রিয়াদের আকাশে নতুন করে তিনটি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। তবে ড্রোনগুলো রিয়াদের কোন অবকাঠামো টার্গেট করে ছোড়া হয়েছে এবং কোন জায়গা থেকে ছোড়া হয়েছে সেটি স্পষ্ট করেননি তিনি। পাশাপাশি হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ইয়েমেনের রাজধানী সানায় ব্যাপক বিমান হামলার ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। সাধারণ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার নির্দেশনা দিয়ে মালিকি বলেন, সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট সানার ‘ইয়েমেনি তেল কোম্পানি/আল-সাবাহ কেন্দ্রীয় স্টেশন থেকে সাধারণ মানুষকে তাদের নিরাপত্তার জন্য সরে যাওয়ার অনুরোধ করছে। এক্সে হামলার লক্ষ্যবস্তুগুলোর একটি ম্যাপও প্রকাশ করেছেন তিনি। মালিকি বলেন, সানায় তারা বিশেষ অভিযান চালাবেন। এ কারণে আগে থেকেই বেসামরিকদের সরে যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের এই ঘোষণার পর পাল্টা হুমকি দিয়েছে হুতি বিদ্রোহীরা। গোষ্ঠীটির সামরিক শাখার মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারে বলেছেন, ইয়েমেনের রাজধানীতে যে কোনো হামলার জবাবে রিয়াদে পাল্টা হামলা চালানো হবে। আর এই জবাব হবে কঠোর ও বেদনাদায়ক। হুতিরা বলেছে, যদি সৌদি আরব পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী সানায় বিমান হামলা চালায় তাহলে সৌদির দাম্মামের আরামকোর সদর দপ্তর, রিয়াদের কিং খালিদ বিমানবন্দর এবং রিয়াদের আরামকোর তেল পরিশোধনাগারে হামলা চালানো হবে। ফলে এ মুহূর্তে সাধারণ মানুষকে এসব স্থাপনা থেকে সরে যাওয়া এবং দূরে থাকার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
এর আগে গত সোমবার হুতিদের এই সামরিক মুখপাত্র জানান, ইয়েমেনের সীমান্তসংলগ্ন সৌদি আরবের খামিস মুশাইত শহরের একটি সামরিক বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে ড্রোন ছোড়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসগুলো ও যাত্রীদের সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে ফ্লাইট পরিচালনা ও যাতায়াত না করতে আবারও সতর্ক করে দিয়েছেন ইয়াহিয়া সারি। তিনি বলেন, ‘পবিত্র নগরী মক্কা ও মদিনা’ সতর্কতার বাইরে থাকবে। তবে অন্য শহরের বিমানবন্দরগুলো নিরাপদ নয়। পাশাপাশি বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশে এক সংঘর্ষে সৌদি আরব নেতৃত্বাধীন জোটের ৮৫ জন সেনাকে আটকের দাবি করেছেন তিনি। আটক সেনাদের মধ্যে ৪৭ জন পাকিস্তানি সেনা রয়েছেন।
গত এক সপ্তাহে ইয়েমেনের হুতি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল থেকে রিয়াদে একাধিকবার ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোন হামলা হয়েছে। এরমধ্যে গত রবিবার সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী হামলাটি হয়। এদিন রিয়াদ বিমানবন্দরের টার্মিনালে ব্যালিস্টিক মিসাইলের আঘাতে ১৮ জন নিহত ও তিন শতাধিক মানুষ আহত হন। নিহতদের মধ্যে দুই বাংলাদেশি ছিলেন। আর গুরুতর আহত হয়ে আইসিইউতে আছেন আরও চার বাংলাদেশি। কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতিদের সর্বশেষ হামলায় ১ পাকিস্তানি নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
হামলার সতর্কবার্তা দেয়নি সৌদি কর্র্তৃপক্ষ
সৌদি আরবের রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার আগে সৌদি কর্র্তৃপক্ষ কোনো সতর্কবার্তা দেয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। বার্তাসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার কয়েক দিন আগে থেকেই সম্ভাব্য সামরিক হামলার বিষয়ে আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া বন্ধ রেখেছিল সৌদি আরব। এতে দেশটির নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষ ও দর্শনার্থীদের সুরক্ষা দেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ইয়েমেনের ইরানপন্থি হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে যুদ্ধের মধ্যেও সৌদি আরব দেশে স্বাভাবিক পরিস্থিতি বজায় রাখার চেষ্টা করছে। রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা বিশ্লেষকদের মতে, সেই চেষ্টা থেকেই হামলার বিষয়ে সতর্কবার্তা বন্ধ রাখা হতে পারে। তবে এতে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা বেড়েছে। সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্র্তৃপক্ষ আগাম সতর্কবার্তা দিয়ে থাকে। তবে কেন বিমানবন্দরে হামলার আগে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি, সে বিষয়ে রয়টার্সের প্রশ্নের জবাব দেয়নি কর্র্তৃপক্ষ বা সৌদি সরকারের গণমাধ্যম দপ্তর।