সংকটে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০২:১২ এএম

হুতিদের হামলায় লন্ডভন্ড হয়ে যাচ্ছে মধ্যপ্রচ্যের শ্রমবাজার। এতে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের পাশাপাশি বিপদে পড়েছেন বাংলাদেশের শ্রমিকরা। উপসাগরীয় অঞ্চলের ছয় দেশ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইনে ৭০ থেকে ৮০ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করছেন। এ ছাড়া লেবানন, জর্ডান ও ইরাকেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত আছেন। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আগ্রাসনের জেরে সম্প্রতি সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সবকটি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা টার্গেট করে হামলা চালিয়েছে ইরান। এর মধ্যে গত শনিবার ইয়েমেনের হুতিরা সৌদি আরবে হামলা চালিয়েছে, যা বিদেশগামী শ্রমিকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। আর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই যুদ্ধে বেশি বিপাকে পড়েছে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের অভিঘাত শুধু সীমান্ত, সামরিকঘাঁটি কিংবা তেল স্থাপনায় সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর সরাসরি ও পরোক্ষ প্রভাব পড়ছে লাখ লাখ অভিবাসী শ্রমিকদের জীবনে। সংকুচিত হচ্ছে তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ, বাড়ছে বিমান ভাড়া ও পরিবহন ব্যয়। সামগ্রিকভাবে অনিশ্চয়তায় পড়েছে প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলো। সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুতিদের মধ্যে বড় ধরনের সামরিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে সেই ঝুঁকি আরও বিস্তৃত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের জায়গাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতায় শ্রমবাজার অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে। প্রবাসীদের মাঝে উৎকণ্ঠা বাড়ছেই। শ্রমবাজারে ভাটার টান অব্যাহত থাকলে আগামীতে রেমিট্যান্স খাতেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। বৈশ্বিক সংকটের মাঝেও প্রায় সোয়া কোটি প্রবাসী বাংলাদেশি রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন দেশে। তারা বাংলাদেশসহ সংশ্লিষ্ট দেশের সার্বিক উন্নয়নে অভাবনীয় অবদান রাখছেন। ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা কেন্দ্র করে গত কয়েক মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্যগামী বাংলাদেশি কর্মীদের সংখ্যা কমছে। চলমান যুদ্ধ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজারগুলোয় আরও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে : আটকেপড়া সৌদি প্রবাসীদের ভিসার মেয়াদ বাড়াতে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক। গতকাল মঙ্গলবার একটি অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘আমাদের দ্বিপক্ষীয় আলোচনা চলছে। মূলত সৌদিসহ মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশ এ ক্ষেত্রে সবসময় আন্তরিক। যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে, বিগত দিনের মতোই তাদের ভিসার মেয়াদ বাড়িয়ে কর্মসংস্থানে ফেরাতে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা চলছে।’

আহত-নিহতদের খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘রিয়াদে হামলার পর থেকেই আমাদের রাষ্ট্রদূত নিজে এবং সিনিয়র কর্মকর্তারা হাসপাতালে গিয়ে খোঁজখবর নিয়েছেন।’

কমছে বিদেশ যাওয়া শ্রমিক : জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে বিভিন্ন দেশে গেছেন ৮ লাখ ৩৮ হাজার ৮৯৪ কর্মী। চলতি বছরের একই সময়ে গেছে মাত্র ৫ লাখ ৬৩ হাজার ৬৯৩ জন। অর্থাৎ এ সময়ে প্রায় পৌনে তিন লাখ কর্মী কম গেছেন। ২০১৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, লিবিয়া, বাহরাইন, ওমানসহ গুরুত্বপূর্ণ ছয়টি বাজার বন্ধ হয়ে যায়। মালয়েশিয়ায় বিদেশি কর্মীর উৎস দেশ হিসেবে বর্তমানে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসে সৌদি আরবে ৫ লাখ ৬৮ হাজার ৮৩ কর্মী গেলেও চলতি বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৭ হাজার ৮৮৭ জনে।

রেমিট্যান্সে আঘাত আসার শঙ্কা : বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরে ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে চলতি বছরের ৩ জুন পর্যন্ত বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে এসেছে মোট ৩৩.২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২৮.১১ বিলিয়ন ডলার। নতুন কর্মী যাওয়ার হার কমতে থাকলে দীর্ঘমেয়াদে রেমিট্যান্সের এই ইতিবাচক ধারায় ব্যাঘাত ঘটবে এবং যুদ্ধ না থামলে সামনের দিনগুলোতে রেমিট্যান্সেও আঘাত আসবে। সৌদি আরবে হুতিদের হামলার জেরে শ্রমবাজারের ঝুঁকি নতুনমাত্রা পেয়েছে। সৌদি আরবে শ্রমিক নিয়োগ কমলে বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যা যেমন কমবে, তেমনি রেমিট্যান্সও হ্রাস পাবে।

যুদ্ধ বিস্তৃত হলেই বড় বিপদ : যুদ্ধ যত বিস্তৃত হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বাংলাদেশের শ্রমবাজার নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে। শ্রমবাজারের বড় একটি অংশ মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, মোট সোয়া কোটি অভিবাসীর অন্তত ৬০ লাখের গন্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। এর মধ্যে ৬৭ ভাগের গন্তব্য সৌদি আরবে, এর পরেই রয়েছে কাতার। কুয়েত ও আরব আমিরাতেও বহু বাংলাদেশি প্রতি বছর কাজের সন্ধানে ছুটছে। আবার বাংলাদেশে আসা বৈদেশিক মুদ্রার হিসাবেও মধ্যপ্রাচ্যের রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কর্মঘণ্টা কমে গেলে শ্রমিকের আয় ও দেশে পাঠানোর অর্থ কমে আসবে। কাজ হারিয়ে দেশে ফিরতে হলে পরিবারের নিয়মিত আয়ের উৎস বন্ধ হতে পারে। বিদেশে যাওয়ার জন্য ঋণ নেওয়া ব্যক্তিদের কিস্তি পরিশোধ কঠিন হয়ে যাবে। একজন কর্মী ধারদেনা করে বিদেশ যান। বিদেশে পৌঁছানোর পর কাজ শুরু করতে দেরি হলে কিংবা নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান কাজ স্থগিত করলে তার আর্থিক চাপ বাড়তে পারে।

ব্যবসায়ীদের মধ্যেও আতঙ্ক : বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ (বায়রা) জানিয়েছে, বর্তমানে যে সংখ্যক কর্মী যাচ্ছে, তা মূলত যুদ্ধ শুরুর আগে অনুমোদিত চাহিদা ও সম্পন্ন হওয়া ভিসায়। নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে জনশক্তির চাহিদা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় এর নেতিবাচক প্রভাব আগামী মাসগুলোতে আরও স্পষ্ট হবে। যুদ্ধের কারণে জনশক্তি রপ্তানিকারক ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। কয়েকজন ব্যবসায়ী দেশ রূপান্তরকে জানান, আমাদের মূল ব্যবসা মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিক পাঠানো। কিন্তু যুদ্ধের দামামার কারণে আমরা আতঙ্কে আছি। শুধু সৌদি আরব না-আশপাশের সব দেশেই আমাদের জন্য অশনিসংকেত। 

ফ্লাইট চালু হওয়া নিয়ে ধোঁয়াশা : রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধ রাখার ঘোষণায় বিপাকে পড়েছেন শ্রমিকরা। কখন ফ্লাইট চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, তা নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। গতকাল শাহজালালে সরেজমিন গিয়ে শ্রমিক ও স্বজনদের চোখে-মুখে  আতঙ্কের ছাপ দেখা গেছে। সব মিলিয়ে ফ্লাইট চলাচল স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সৌদি আরবসহ অন্য দেশের কর্মস্থলে ফেরা এবং সেখান থেকে দেশে ফেরার অপেক্ষায় থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীদের ভোগান্তি অব্যাহত থাকার আশঙ্কা থাকছেই। গতকাল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস বলেছে, যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে আগামী ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা থেকে দাম্মাম ও রিয়াদগামী সব ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে।

এদিকে নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে সৌদি আরবের যেকোনো বিমানবন্দরে ফ্লাইট পরিচালনা কিংবা ট্রানজিট ফ্লাইট পরিচালনার ক্ষেত্রে সব এয়ারলাইনসকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এসএম রাগীব সামাদ এক চিঠিতে বলা হয়, ফ্লাইটের বিলম্ব, বাতিল বা সময়সূচি পরিবর্তনের বিষয়ে ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের এসএমএস, ফোনকল, ই-মেইল, এয়ারলাইনসের ওয়েবসাইট, সামাজিক মাধ্যমসহ অন্যান্য মাধ্যমে জানাতে হবে। পাশাপাশি ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা, পরিবর্তিত যাত্রার সময়, পুনরায় বুকিং, টিকিটের অর্থ ফেরত এবং অন্যান্য প্রযোজ্য ব্যবস্থা সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য দিতে হবে। ভিসার মেয়াদ বাড়ানো বা অভিবাসন-সংক্রান্ত সহায়তার প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসকে যাত্রীদের সৌদি কর্তৃপক্ষ, ঢাকায় সৌদি দূতাবাস এবং অন্যান্য উপযুক্ত সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগে সহায়তা করতে বলা হয়েছে। বিমানবন্দরে অবস্থানরত কিংবা পরিস্থিতি সম্পর্কে না জানার কারণে সেখানে আসা ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের যথাযথ সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। তাদের খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে।

চরম বিপাকে প্রায় ১৫ হাজার যাত্রী : হুতিদের হামলার কারণে সৌদি আরবের রিয়াদ বিমানবন্দর বন্ধ ঘোষণা করায় ঢাকা থেকে এ পর্যন্ত সরাসরি ও ট্রানজিট মিলিয়ে মোট ৮২ ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। গতকাল বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সৌদি আরবগামী ৩২টি সরাসরি ও ৫০টি ট্রানজিটসহ সর্বমোট ৮২ ফ্লাইট বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে বিমান বাংলাদেশের ১০টি, ইউএস-বাংলার ১০, সৌদিয়া এয়ারলাইনসের ৫, রিয়াদ এয়ারওয়েজের ৭ এবং ইন্ডিগোর ২২, এমিরেটসের ১১, কাতার এয়ারওয়েজের ৬, ফ্লাই দুবাইয়ের ৬, সালাম এয়ারের ৪টি এবং ইজিপ্ট এয়ারের একটি ট্রানজিট ফ্লাইট রয়েছে। ফ্লাইটগুলোর যাত্রী ছিল প্রায় ১৫ হাজার।  তারা ফ্লাইট বাতিলের কারণে যেতে পারেননি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত