চুয়েটে অবরুদ্ধ ভিসিকে ৩০ ঘণ্টা পর উদ্ধার

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০২:১৩ এএম

দীর্ঘ ৩০ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম ও তার সঙ্গীদের উদ্ধার করেছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটে উপাচার্য ভবন থেকে তাদের উদ্ধার করে একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা ও পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম উদ্ধার কাজে নেতৃত্ব দেন।

বিকেল ৫টা ২০ মিনিটে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও সিভিল সার্জন বিশাল বহর নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন। পরে শিক্ষার্থীদের আলোচনা শেষ করে ৫টা ৫০ মিনিটের দিকে উপাচার্য ভবনে প্রবেশ করেন। ২৫ মিনিট পর ৬টা ১৫ মিনিটে তারা উপাচার্য ও তার সঙ্গীদের বের করে আনেন। এ সময় দুই পাশে মানব ঢাল তৈরি করে পুলিশ।

অন্যদিকে দেড় শতাধিক আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ‘যে ভিসি ছাত্র মারে, সে ভিসি আমার না; আমার ভিসি তোমার ভিসি, সায়েম স্যার সায়েম স্যার; ভুয়া ভুয়া’ প্রভৃতি সেøাগান দিতে থাকেন।

ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে জেলা প্রশাশক জাহিদুল ইসলাম মিঞা শিক্ষার্থীদের বলেন, উপাচার্য মহোদয় অসুস্থ। আমরা তার সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে পুলিশ সুপারসহ এসেছি। শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়টি আমরা সরকারকে জানাব। উপাচার্য নিয়োগের বিষয়টি সরকারি সিদ্ধান্ত। এই মুহূর্তে উপাচার্যের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব।

শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে যন্ত্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী আহনাফ শাহরিয়ার অর্ণব বলেন, ‘এই উপাচার্যের বিষয়ে শুরুতে আমাদের কোনো ক্ষোভ বা আক্ষেপ ছিল না। আমরা সায়েম স্যারকে পুনর্বহালের এক দফা দাবিতেই আন্দোলন করে আসছি। কিন্তু তিনি তালা ভেঙে উপাচার্য ভবনে প্রবেশ করেছেন, আমাদের ভাইদের ওপর দুই দফা হামলা করিয়েছেন। আমরা ওনার পদত্যাগ চাই।’

উপাচার্য বের হয়ে যাওয়ার সময় ওই শিক্ষার্থী জানান, আমাদের নবনিযুক্ত উপাচার্য এই ক্যাম্পাসে লুকিয়ে প্রবেশ করেছিলেন। আজ বের হয়ে যাচ্ছেন এক শর্তে, তিনি এই ক্যাম্পাসে আর পা রাখবেন না।

তিন দফায় স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে হাসপাতালে যাওয়ার আকুতি ভিসির : টানা অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকায় গতকাল দুপুরে উপাচার্য শারীরিকভাবে অসুস্থ হওয়ার দাবি করেন। তিনি মাথা ব্যথা ও বুকের ব্যথা অনুভব করছেন বলে জানান। দুপুর দেড়টার দিকে উপাচার্যের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে আসেন চুয়েট মেডিকেল সেন্টারের চিকিৎসক ডা. মো. সাহাব উদ্দিন। স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, উপাচার্য মহোদয় শারীরিকভাবে সুস্থ আছেন। তার রক্ত চাপ স্বাভাবিক আছে। তবে অবরুদ্ধ থাকায় তিনি অস্বস্তি বোধ করছেন বলে জানিয়েছেন। এই মুহূর্তে হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে বুকের ব্যথার বিষয় জানতে চাইলে তিনি জানান, উপাচার্য এ ধরনের কোনো কথা তাকে বলেননি।

দুপুর সোয়া ২টায় উপাচার্যের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে আসেন রাউজান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসক ডা. টিপলু কান্তি দে। পরীক্ষার পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, উপাচার্যের বুকে ব্যথা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন। তার প্রেসারও বেশি। তাকে অবশ্যই হাসপাতালে ভর্তি করা উচিত।

দুই চিকিৎসকের দুই রকম মতামতের কারণে শিক্ষার্থীরা পুনরায় তাদের একসঙ্গে উপাচার্যের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে নিয়ে যান। পরে বেরিয়ে এসে দুজনই জানান উপাচার্যের প্রেসার কিছুটা বেড়েছে। তিনি প্রচুর পরিমাণ ঘামছেন। হাইপার টেনশন অনুভব করছেন। চুয়েটের চিকিৎসক এই মুহূর্তেই হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন নেই বলে জানালেও রাউজান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দেন।

এ দিকে দফায় দফায় স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে এক ভিডিও বার্তায় উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম বলেন, সোমবার দুপুর থেকে আমরা বিদ্যুৎ ও পানি বিচ্ছিন্ন অবস্থায় অবরুদ্ধ আছি। আমাদের খাবার সরবরাহও ঠিকভাবে হচ্ছে না। সারা রাত নির্ঘুম কেটেছে। সকাল থেকে মাথায় যন্ত্রণা ও হাল্কা বুকের ব্যথা ছিল। দুপুর থেকে তা বেড়ে যায়। এখন কারও সঙ্গে কথা বলার পরিস্থিতি নেই। আমি আমার স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে যেতে সহায়তা চাই। উদ্ধারের পর তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

যেভাবে অবরুদ্ধ উপাচার্য : পূর্ববর্তী উপাচার্যকে বহালের টানা আন্দোলনের মুখে গত সোমবার সকাল পৌনে ৯টার দিকে উপাচার্য পদে যোগদানের ১৮ দিন পর তালা ভেঙে নিজ দপ্তরে প্রবেশ করেন উপাচার্য ড. শেখ শরীফুল আলম। এ সময় তার সঙ্গে কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন ছাত্র ও শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন। উপাচার্যের কার্যালয়ে প্রবেশের খবর ছড়িয়ে পড়লে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা তৈরি হয়। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা তাকে দপ্তর ত্যাগের জন্য দুপুর ১২টা পর্যন্ত সময় বেঁধে দেন। তবে তিনি কার্যালয ত্যাগ না করায় শিক্ষার্থীরা সাড়ে ১২টার দিকে ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেন। এ সময় উপাচার্য ও তার ১২ জন সঙ্গী আটকা পড়েন।

প্রসঙ্গত, গত ২১ সেপ্টেম্বর রাতে অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) ইলেকট্রনিক অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে নতুন উপাচার্য নিয়োগের খবর আসার পর রাতেই শিক্ষার্থীরা সাবেক উপাচার্যকে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে যোগ দিয়ে টানা কর্মবিরতি পালন করছেন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত